Skip to main content

‘এই বুঝি কেউ কলার ধরে বলছে, রোগী মরলে মাটিতে পুতে ফেলবো’

অনলাইন ডেস্ক : ডিউটিতে আসার সময় ব্যাগে করে হ্যারিসন্স মেডিসিনের ‘ক্রিটিকাল কেয়ার’ অংশটা নিয়ে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম ফাঁকে একটু পড়ে রাখবো। কপালের কী লিখন — একটু পরেই দেখা মিললো এক ক্রিটিকালি ইল প্যাশেন্টের। কেবিনে গেলাম। পালস নাই। গ্লুকোজ ২০। রেসপিরেটোরি রেট ৩৪। প্যাশেন্ট বেশ ড্রাউজি। আমার সাথে কোনোমতে কথা বলছেন। কথা বলতে বলতেই বারবার ঘুমিয়ে যাচ্ছেন। পালস নাই দেখে নিজেই বিপি মাপলাম। নাই। ক্যারোটিড পালস আছে। তবে ভলিউম ভালো না। ইসিজি করতে দিলাম। I, aVL এ ডাউনস্লোপিং ST depression. সাথে সাইনাস টেকি। আগের কাগজপত্র দেখলাম। ২০১৬ তে তার ক্যানসার ছিলো। sqaumas cell ca (Jaw). আগে থেকেই ইশকেমিক হার্ড ডিজিজ আছে। নেফ্রোপেথি আছে। হাইপারটেনশন আছে। একটা কাগজে দেখলাম ২০১৭ সালে হাইপারপ্যারাথাইরয়েড হিসেবেও লেবেল করা। ঘটনা যা-ই হোক – আমার মনে হলো, এই মুহূর্তে সম্ভবত রোগীর ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস হয়ে বসে আছে! হার্টের অবস্থাও সম্ভবত ভালো না। রোগীর অবস্থা ক্রিটিকাল। বুঝিয়ে বললাম উনার ভাগনাকে। আবিষ্কার করলাম – ভাগনার অবস্থা আরো বেশি ক্রিটিকাল। রোগীকে আইসিইউতে ট্রান্সফার করা দরকার – এটা জানার পর উনার প্রথম প্রশ্ন – আপনি কে? বললাম – আমি ডাক্তার। দায়িত্বে আছি। – আপনি বললেই তো হবে না। – আপাতত আমার কথা-ই আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে। – আমার রোগীকে এতদিন বিদেশে চিকিতসা করলাম কেউ আইসিইউর কথা বললো না। এখন কেন লাগবে? – এতদিন লাগেনি। এখন লাগছে। আপনি চাইলে ওয়ার্ডেও থাকতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে রিস্ক বন্ডে স্বাক্ষর করতে হবে। আচ্ছা, আমাকে ১০ মিনিট সময় দিন। মেনে নিলাম। এবং ১০ মিনিটে যা করা সম্ভব করা শুরু করলাম। ইনসুলিন দিলাম, আর্টারিয়াল ব্লাড টানলাম। ফ্লুইড দেয়ার আগে কার্ডিয়াক ফাংশনের কথা মাথায় আসলো। রিস্ক বেনিফিট চিন্তা করে ফ্লুইড চ্যালেঞ্জ দিলাম। ব্লাড টেনে রিপোর্ট করতে পাঠালাম। ১০ মিনিট পরে তারা সিদ্ধান্ত জানালেন না। মূল অভিভাবক সাইডে চেপে গেলেন। ষন্ডামার্কা একজন লোক হাজির হলেন। এসে প্রথমেই আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘হ্যালো ইয়ং ম্যান…’ আমিও ইংরেজিতেই উত্তর দিলাম – এক্সকিউজ মি। আই এম ডক্টর। ইউ হ্যাভ নো রাইট টু কল মি লাইক দিস। – কেনো? রাগ করে ফেলছো নাকি? তোমার বড় ডাক্তাররে আনো। তোমার কথায় আমি আইসিইউতে নিবো না। – আপনি ভদ্র ভাষায় কথা বলেন। এখন পর্যন্ত আপনাদের কাউকে আমি অসম্মান করে কথা বলিনি। – এত কথা বলে লাভ নাই। বিশেষজ্ঞ আনাও। – আজকে শুক্রবার। আপনি বাইরে ক্লিনিকে চলে যেতে পারেন। সেখানে অন কল কনসালটেন্ট পাবেন। এখানে থাকলে আমার কথাই শুনতে হবে। – তোমারে চিনি না। তুমি কে? বাড়ি কই? ততক্ষণে ঘটনাস্থলে তাদের আরো ১০/১২ জন হাজির। ‘ভদ্রলোক’ কথা বলতে বলতে তখন আমার নাকের সামনে। আমার পিঠ দেয়ালে। আমি উনাকে বললাম, একটু দূরে যেয়ে কথা বলেন। ইন্টার্ন একজন উনাকে পেছনে সরিয়ে দিলো একটু। সাথে সাথে ঝাপিয়ে পড়লো ওদের দলের ৪/৫ জন। গায়ে হাত দিলা কেন? আমি সাথে সাথে প্রতিবাদ করলাম। ‘অসম্ভব। কেউ গায়ে হাত দেয় নাই। জাস্ট আপনাকে পেছনে যেতে বলেছেন। আপনি আমার গায়ের উপর উঠে কথা বলছেন।’ ভদ্রলোকেরা তখন ভদ্রতার শেষ সীমাও অতিক্রম করলেন। ‘তোর বাড়ি কই? তুই হাসপাতাল থেকে বের হলে গর্দান ফেলে দেবো। সাথে অশ্রাব্য সব গালি।’ আমি ধৈর্য্যসীমার শেষ প্রান্তে গিয়ে বললাম – ‘আপনার রোগীর চিকিতসা না দেয়ার অধিকারও আমার আছে। প্লিজ, চলে যেতে পারেন। হাসপাতালের অভাব নাই দেশে।’ উনারা আমার ছবিও তুললেন। আমি ইন্টার্ন নিয়ে রুমের দিকে এসে দরজা লক করে দিলাম। ফিম্যাল ইন্টার্ন আছেন কয়েকজন। তাদের নিরাপত্তার দিক দেখাও আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। একটু পরেই দরজায় ঠাস ঠাস লাথি। সাথে অশ্রাব্য সব গালি। ‘মেরে ফেলবো, কেটে ফেলবো, নাম ঠিকানা সব জোগাড় করেছি, তোরা যাবি কই?’ ফোন দিয়ে বন্ধু-বান্ধবকে জড়ো করার চেষ্টা করছিলাম আর ভাবনার ঝড় চলছিলো মনের ভেতরে। মেডিসিন আমার কাছে শুধুই একটা পেশা না। আমার কাছে এটি একটি দর্শন। আমি মাঝারী মানের ছাত্র। মেডিসিনের ছাত্র হওয়ার জন্য যে প্রতিভা দরকার তার ছিটেফোটাও আমার নেই। তবে চেষ্টার কমতি আমি কখনো করিনা। অনেকেই জিজ্ঞেস করেন – ‘এত কষ্ট করে, আয়োজন করে মেডিসিন পড়ছো? চেম্বারে রোগী হবে?’ আমি শুনে হাসি। চেম্বারে রোগী হয়তো কম হবে। কিন্তু Science of Uncertainty and an Art of Probability দিয়ে সবচেয়ে বেশি মহিমান্বিত করা যায় এই স্পেশালিটিকেই। আমি এই স্পেশালিটিকে ভালোবাসি। আমার ক্রোমোজোমে জড়িয়ে থাকা জ্বিনগুলোকে যতটা ভালোবাসি হয়তো তোতোটাই। আমার বিরুদ্ধে একশটা অভিযোগ করে ফেলা যাবে। কিন্তু খারাপ প্যাশেন্টের ব্যাপারে কোনোদিন এক বিন্দু অবহেলা করেছি এই অভিযোগ কোনো শত্রুও কখনো করতে পারবেনা। এই অহংকার আমি আগেও করেছি, এখনো করি, ভবিষ্যতেও করবো। কিন্তু এরকম ঘটনার পরে সব কিছু দ্বিতীয়বার ভাবতে ইচ্ছা করে। মনে পড়ে অক্সফোর্ড মেডিসিনের সতর্কবানী – ‘Be kind to yourself: you are not an inexhaustible resource.’ এই নিয়ে দ্বিতীয়বার ঘটলো এরকম। আগেরবার ঘটেছিলো বছরখানেক আগে। প্রায় ২ মাস ট্রমার মধ্যে ছিলাম। যেকোনো রোগীর সাথে ৩/৪জন অ্যাটেনডেন্ট থাকলেই মনে হতো – এই বুঝি কলার ধরে বলবে – রোগী মরলে মাটিতে পুতে ফেলবো। এইবারের ট্রমা কয়দিনে কাটে কে জানে! ঘটনার এক ঘন্টা আগেই পড়ছিলাম – এপ্রোচ টু প্যাশেন্ট উইথ শক। আয়রনি হলো, বই অনুযায়ী এপ্রোচ করতে করতেই ঘটে গেলো এত সব ঘটনা। বইয়ের বাইরেও কতো কিছু থেকে যায়, প্রিয় টিনসলি রেন্ডলফ হ্যারিসন সাহেব! (লেখক আলিম আল রাজীর ফেসবুক থেকে নেয়া)

অন্যান্য সংবাদ