প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মেরুকরণ নয়, রাজনীতির মরুকরণ

মঞ্জুরুল আলম পান্না : ‘ব্যক্তি যেই হোক, ভোট দিতে হবে মার্কায়’ রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের জায়গা থেকে এখন এই স্লোগানই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মার্কা-ই যেখানে ফ্যাক্টর সেখানে নির্বাচনে চোর-ছ্যাচ্চর-ডাকাত-সন্ত্রাসী-দুর্নীতিবাজ প্রার্থীতে আর কি এসে যায়! ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্ট গঠন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সংলাপে বসার মধ্য দিয়ে একটা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আশা জেগে ওঠার পাশাপাশি আরেকটা বিষয় টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছিলো। তা হলো- রাজনীতিতে মেরুকরণ ঘটতে যাচ্ছে এবং তা ইতিবাচক। সেই আলোচনা এখন হতাশায় রূপ নিয়েছে সাধারণ মানুষের মাঝে। মেরুকরণের বদলে তা রাজনৈতিক মরুকরণের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে গতানুগতিক অপসংস্কৃতির সঙ্গে আরও নতুন কিছু অসুস্থ প্রতিযোগিতা।

এক. ঘুরে ফিরে সেই পেশিশক্তি আর কালো টাকার মালিক, মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজদের আবারও মনোনয়ন দেয়া হলো।

দুই. প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে অপেক্ষাকৃত প্রতিশ্রুতিশীল তরুণদের জায়গা করে দেয়ার কথা বলা হলেও তার সংখ্যা নিতান্তই হাতে গোনা।

তিন. নিজ দল থেকে মনোনয়ন না পেয়ে নীতি-আদর্শকে পায়ে দলে ঝাঁকে ঝাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে যোগ দেয়া কেবল মার্কার আশায়।

চার. জার্সি বদল করেই মুহুর্তের মধ্যে মনোনয়ন নিশ্চিত করা।

পাঁচ. সংসদ সদস্য হওয়ার স্বপ্ন এতোটাই সহজ হয়ে উঠেছে যে যাদের কাছে কদিন আগেও ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার-চেয়ারম্যান হওয়াটাও দুঃস্বপ্নের মতো ছিলো, ঝাঁকে ঝাঁকে তারাই এমপি হওয়ার বাসনায় ঢাক-ঢোল পিটিয়ে দলের মনোনয়ন ফরম কিনলেন।

ছয়. জনগণকে বোকা বানাতে নাম সর্বস্ব দলগুলোকে বাগিয়ে জোট-মহাজোটের সংখ্যাগত মাত্রা বাড়িয়ে নিজেদের গুরুত্ব বৃদ্ধি করা।

সাত. হালুয়া-রুটিতে ভাগ বসাতে ডান-বামের ছোট দলগুলো নিজেদের আদর্শ বিকিয়ে দিয়ে বড় দলগুলোর কাছে আত্মসমর্পন করা।

আট. মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে এর আগে যা কখনও হয়নি এবার তা দেখলো দেশবাসী। যোগ্য প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থী দেখার আশায় একক যোগ্য প্রার্থী বাছাই না করে প্রধান দুই দল অনেক আসনে একাধিক ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিলো। এসব আসনে প্রাথমিকভাবে মনোনয়নপ্রাপ্তদের মধ্যে চূড়ান্তভাবে একজন বাদে বাকিদের সরে দাঁড়াতে হবে। এতে করে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল-সংঘর্ষ অযথা আরও বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে।

নয়. ক্ষেত্র বিশেষ ছাড়া সামরিক-বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী হাইব্রিডদের কাছে তৃণমূলের পোড় খাওয়া রাজনীতিকদের পরাজয়গুলো দৃশ্যমান হলো আবারও।

দশ. নির্বাচনী বৈতরনি পার হতে চরম মৌলবাদী দলগুলোকে আদর-সোহাগে কাছে টানতে কারোর আদর্শে কোনো রকম আঘাত লাগলো না।

এগারো. মুখে স্বাধীনতাবিরোধীদেরকে বয়কট করার কথা বলে চললেও রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে কমবেশি সবারই যে তাদের সঙ্গে হাত মেলাতে কোন বাঁধা নেই, তা আবারও প্রমাণিত হলো। বারো. নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে অনেকের ক্ষেত্রে আদালতকে ব্যবহারের অভিযোগ উঠল এবং শেষ পর্যন্ত আবারও প্রমাণিত হলো যে, ক্ষমতাই সকল রাজনীতির শেষ লক্ষণ।

আসলে এখন আর রাজনীতিবিদদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। সমস্যাটা হলো আমরা যারা সাধারণ ভোটার তাদের মধ্যেই। বড় দলগুলোর নীতি-নির্ধারকরা বুঝে গেছেন শাসকগোষ্ঠীর সমালোচনা যতোই করা হোক, শেষমেষ ভোট পড়বে ওই নৌকা কিংবা ধানের শীষেই। সবার ওপরে মার্কা সত্য, তার ওপরে নাই। তাই প্রার্থী যেমনই হোক সিল পড়বে ঘুরে ফিরে ওই মার্কাতেই। লেখক : সাংবাদিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত