প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিএনপি আবারো জামায়াতের পেটেই গেলো

বিভুরঞ্জন সরকার : দেশজুড়ে এখন নির্বাচনের উত্তেজনা। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হলেও এখনও চূড়ান্ত হয়নি জোট-মহাজোট-ঐক্যফ্রন্ট-যুক্তফ্রন্টের প্রার্থিতা। শেষ হয়েও শেষ হচ্ছে না হিসাব-নিকাশ। জাতীয় পার্টি সঙ্গে আওয়ামী লীগের সিট বন্টন নিয়ে ফয়সালা না হলেও বিএনপি ঠিকই জামায়াতের সঙ্গে সিট ভাগাভাগি ফাইনাল করেছে। ৯ ডিসেম্বর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। সেদিনই স্পষ্ট হবে কারা শেষ পর্যন্তলড়াইয়ে থাকবেন, কে কার বিরুদ্ধে লড়বেন। তিনশ আসনের জন্য মোট তিন হাজার ৫৬ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। গড়ে দশের অধিক প্রার্থী প্রতি আসনে। ঢাকা-১৭ আসনের জন্য সর্বোচ্চ ২৭ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন, সর্বনিম্ন ৪ জন দিয়েছেন মাগুরা-২ আসনে। তবে এরমধ্যে কেউ কেউ বাদ পড়বেন যাচাই-বাছাইয়ে। কেউ কেউ করবেন প্রত্যাহার। ফলে ৯ ডিসেম্বর দিন শেষের আগে জানা যাচ্ছে না প্রার্থীর প্রকৃত সংখ্যা।

নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে কিনা, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা এসব প্রশ্ন এখন আর নেই। নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ার সব লক্ষণ এখন স্পষ্ট। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে এবং দলীয় প্রধান খালেদা জিয়াকে জেলে রেখেই। খালেদা জিয়াসহ বিএনপির বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট প্রার্থী মামলা জটিলতায় নির্বাচনে সম্ভবত অংশও নিতে পারছেন না। তারপরও বিএনপি নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার কথা বলছে না। বিএনপি আবার প্রমাণ করেছে, ‘যতো গর্জে ততো বর্ষে না’। আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে দাবি মানতে বাধ্য করার কতো হুংকারই না বিএনপি দিয়েছিলো। কিন্তু শেষে ‘পুনর্মুষিকো ভবঃ’। সরকার কোনো দাবি না মানলেও বিএনপি এখন নির্বাচনের মাঠে। এরকমটাই যে ঘটবে তা আগেই বোঝা গিয়েছিলো। আন্দোলন করার সক্ষমতা বিএনপির নেই। আবার নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার কোনো বিকল্প ছিলো না দলটির সামনে। গত নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি যে ঐতিহাসিক ভুল করেছে তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হচ্ছে এবার খালি হাতে নির্বাচনে গিয়ে।

বিএনপি সরকারের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে সক্ষম হয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে সামিল হয়ে। ড. কামাল হোসেনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে না পারলে বিএনপির জন্য নির্বাচনে যাওয়া খুব সহজ হতো না। তবে কামাল হোসেনদের সঙ্গে ঐক্য করে যে সুবিধা বিএনপি পেয়েছে তা আবার নিজেরাই ঝেটিয়ে বিদায় করেছে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতকে ২৫ টি আসন ছেড়ে। এবার বিএনপির সামনে সুযোগ ছিলো জামায়াতের পেট থেকে বেরিয়ে আসার। বিএনপিতে অনেক মুক্তিযোদ্ধা থাকা সত্ত্বেও দলটির যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ইমেজ সেটা এবার অনায়াসে দূর করতে পারতো জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা না করে। জামায়াত নিবন্ধনহীন দল হওয়ায় দলের নামে নির্বাচন করার কোনো সুযোগ তাদের ছিলো না। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জামায়াতের ভোটে জেতার পরিবেশ-পরিস্থিতি দেশে নেই। রাজনীতিতে জামায়াতকে ‘নাই’ করার একটি সুযোগ ছিলো এই নির্বাচনে। কিন্তু জামায়াতকে রাজনীতিতে পুনর্বাসনের দায়িত্ব অতীতেও যেমন বিএনপিই পালন করেছে, এবারও জামায়াতের জন্য ত্রাতার ভূমিকায় নেমে বিএনপি প্রমাণ করলো যে তারা জামায়াত ছাড়তে পারবে না। জামায়াত এবং বিএনপিকে কেউ কেউ সহোদর ভাই বলে মনে করেন। এই মনে করা যে ভুল নয়, সেটা বিএনপিই বারবার মনে করিয়ে দেয়।

জমায়াতকে ধানের শীষ প্রতীক দিয়ে বিএনপি রাজনীতিতে আরেকটি ভুল করলো। ড. কামাল-রব-কাদের-মান্নাদের পাশে পেয়ে বিএনপি যতোটুকু বদনাম ঘুচিয়েছিলো তারচেয়ে বেশি যোগ হলো জামায়াতের সঙ্গ না ছেড়ে। জামায়াতের পক্ষে বিএনপির সিনিয়র নেতা নজরুল ইসলাম খান যে ভাষায় ওকালতি করেছেন, সেটাও অনেককেই আহত করবে। জামায়াতের মধ্যেও ‘মুক্তিযোদ্ধা’ আছেন বলে সার্টিফিকেট দিয়ে নজরুল ইসলাম খান জামায়াতের বাহবা পেলেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের কাছে নিন্দা-তিরস্কারই পাবেন। জামায়াতে ইসলামী একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত দল। এই দলের পক্ষে সাফাই গেয়ে নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, ‘কেউ যুদ্ধাপরাধ না করে থাকলে তাকে মনোনয়ন দিতে অসুবিধা কী’?

জামায়াতের যারা সরাসরি যুদ্ধাপরাধ করেনি, তারা কী কখনো একাত্তরে কৃতকর্মে জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছে, একাত্তরের ভূমিকার জন্য অনুতপ্ত হয়েছে? তারা তো তাদের অতীত ভূমিকার জন্য গৌরব বোধ করে। এখনও সুযোগ পেলে জামায়াত যে কী ভয়ঙ্কর অপরাধ সংঘটন করতে পারে তার নজির বহুবার বহু ঘটনার মধ্যে তারা দিয়েছে। তাই জামায়াতকে ধানের শীষ প্রতীক দিয়ে বিএনপি গৌরব বোধ করলেও যারা মুক্তিযুদ্ধকে বুকে ধারণ করেন, তারা লজ্জা বোধ করছেন। যুদ্ধাপরাধের দায়ে দন্ডিতদের আত্মীয়দের মনোনয়ন দেওয়াকে যারা জাস্টিফাই করেন এই যুক্তিতে যে বাবার দোষে বা ভাইয়ের দোষে পুত্র কিংবা ভাই তো দোষী হতে পারেন না, তারাও তাদের যুক্তির ত্রুটি বুঝতে পারেন না। দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর ছেলে, আব্দুল আলীমের ছেলে কিংবা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে বা ভাই কি কখনও বলেছেন যে, তারা তাদের বাপ-ভাইয়ের অপরাধের সঙ্গী নন, তারা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে, স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের বিরোধিতা করে ভুল করেছেন?

নির্বাচন নিয়ে মানুষের মন থেকে সব শঙ্কা দূর হয়ে গেছে তা হয় । বিএনপি যদিও শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে থাকার কথা বলছে তবু মানুষ তাদের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে মনে করছেন, বিএনপি কোনো অজুহাতে যেকোনো সময় ভোটের মাঠ ছেড়েও দিতে পারে। আগের বিভিন্ন নির্বাচনে বিএনপি এমন করেছে। তবে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলেও সামগ্রিকভাবে রাজনীতিতে তার খুব প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না। নির্বাচনে আওয়ামী লীগই জিতবে, এটা যেমন অনেকে বলেন বা মনে করেন, তেমনি বিএনপির চমক দেখানোর আশাও কেউ কেউ করছেন।

এই প্রসঙ্গে আমার একটি কবিতার পংক্তি মনে পড়ছে :

পথ ভাবে আমি দেব

রথ ভাবে আমি

মূর্তি ভাবে আমি দেব-

হাসে অন্তর্যামী।

লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ