প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গোনাহের পার্থিব ক্ষতি

এসএম আরিফুল কাদের : গোনাহের দরুন যেসব ক্ষতি বা শাস্তি পরকালে ভোগ করতে হয়, তেমনি দুনিয়ায়ও এর ভয়ানক ক্ষতি বা শাস্তি রয়েছে। সে ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন, ‘জলে ও স্থলে যেসব বিপদ সংঘটিত হয়, সব মানুষের হাতের কামাই করা।’ (সুরা রূম : ৪১) এমনকি পবিত্র কালামেপাকে পূর্ববর্তী প্রেরিত নবী-রসুলগণের (আ.) গোত্রের ওপর পতিত পার্থিব আজাব সম্পর্কে জানা যায়। তা সবই নিজেদের নাফরমানির ফল। কিন্তু মানুষ যে ধর্মের অনুসারীই হোক না কেন, পার্থিব গোনাহের ক্ষতি অবশ্যই ভোগ করতে হবে।

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) থেকে বর্ণিত। মুসলমানরা সিসিলি দ্বীপ বিজয়ের দিন হজরত আবু দারদা (রা.)-কে একাকী বসে কান্না করতে দেখে হজরত জুবায়ের ইবনে নকীর (রা.) বললেন, আজ মুসলমানদের উল্লাসের দিন হওয়া সত্ত্বেও আপনার কান্নার কারণ কী? উত্তরে তিনি বললেন, হায় আফসোস! তুমি সহজ কথাটি বুঝতে পার না? যখন কোনো জাতি আল্লাহর হুকুমের অবাধ্যাচরণ করে, তখন তারা শাহী তখতের মালিক হয়েও বেইজ্জত ও পর্যুদস্ত হয়। তার প্রমাণ মিলে সিসিলিবাসীর পরাজয়ে। আমার কান্নার কারণ এটাই। (জাযাউল আ’মাল : ১১)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত। আমরা ১০ জন লোক হুজুর পাক (সা.)-এর খিদমতে হাজির হলাম। তিনি (সা.) আমাদের লক্ষ্য করে ইরশাদ করেন, পাঁচটি ভয়ানক ব্যাপার থেকে আল্লাহ তোমাদের হেফাজত রাখুন। সে পাঁচটি কাজ হলো- ১. নির্লজ্জতা শুরু করলে প্লেগসহ এমন রোগ দেখা দেবে যা কখনো পূর্বপুরুষরা দেখেনি। ২. ওজন কম দিতে শুরু করলে দুর্ভিক্ষসহ অত্যাচারী শাসকের শোষণ দেখা দেবে। ৩. জাকাত বন্ধ করা শুরু করলে রহমতের বৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হবে, যা পশুপাখি না থাকলে একফোঁটাও বর্ষিত হতো না। ৪. ওয়াদা ভঙ্গ করা শুরু করলে বিভিন্ন দুশমন তাদের ওপর জয়যুক্ত হয়ে ধন-সম্পদ আত্মসাৎ করবে। ৫. জিনাকে জায়েজ কাজের মতো প্রকাশ্যে এবং শরাব ও গান-বাদ্য শুরু করলে আল্লাহপাক অসন্তুষ্ট হয়ে ভূমিকম্প শুরু করার আদেশ দেন। (সহিহ ইবনে মাজাহ)

হজরত ইবনে আবিদ্দুনিয়া (রা.) বর্ণনা করেন, হুজুর (সা.) ইরশাদ করেন- যখন আল্লাহপাক বান্দাদের শাস্তি দিতে ইচ্ছা করেন, তখন বেশি বেশি করে শিশুসন্তানদের অকাল মৃত্যু দেন এবং মেয়েলোকরা বন্ধ্যা হয়। (জাযাউল আ’মাল : ১৩)

হজরত মালেক বিন দীনার (রহ.) বলেন, আমি হেকমতের কিতাবে পেয়েছি, আল্লাহপাক বলেন- আমি সব বাদশাহর বাদশাহ। বাদশাহের অন্তর আমার হাতে, যারা আমার হুকুম পালন করে আমি বাদশাহর অন্তর সদয় করে দিই। যখন নাফরমানি করে, তখন বাদশাহর অন্তর তাদের জন্য নিষ্ঠুর করে দিই। অতএব তাদের মন্দ না বলে; আমার কাছে ক্ষমা চাও, আমিই তাদের তোমাদের ওপর বাদশাহকে সদয় করে দেব। (জাযাউল আ’মাল : ১৩)

ইমাম আহমদ (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে। আল্লাহপাক বনি ইসরাঈলদের লক্ষ্য করে বলেন, আমাকে ইবাদত করে খুশি করালে, আমি বরকত দান করি। পক্ষান্তরে আমার নাফরমানি করলে, আমি রাগান্বিত হয়ে অবাধ্য ব্যক্তির ওপর এমন লানত বর্ষণ করি, যা তার সাতপুরুষ পর্যন্ত পৌঁছে থাকে। (জাযাউল আ’মাল : ১৪) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) রসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, যে সম্প্রদায়ের মাঝে সুদের প্রচলন বৃদ্ধি পায় তারা দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয়। (মুসনাদে আহমদ-৩৭৫৪)

হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, একসময় আমার কিছু উম্মতকে ধসিয়ে দেওয়া হবে, উল্টিয়ে দেওয়া হবে ও বিকৃত করে দেওয়া হবে। জিজ্ঞাসা করা হলো, ইয়া রসুলুল্লাহ (সা.)! তারা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা অবস্থায়ও? রসুল (সা.) বলেন- হ্যাঁ, আর তা হবে যখন গান-বাদ্যের ছড়াছড়ি ঘটবে, জিনা বৃদ্ধি পাবে, মদপান করা হবে ও রেশমের কাপড় পড়া হবে তখনই এগুলো ঘটবে। (আদদুররুল মানসুর ২/৩২৮)

রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ওই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ। কারো গায়ে যখন কোনো লাকড়ির আঁচড় লাগে, কিংবা রগে যন্ত্রণা হয় বা পাথরে আঘাত লাগে, কিংবা পা পিছলে পড়ে যায়, সেটা তার গুনাহের কারণেই হয়ে থাকে। অর্থাৎ ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর সব বিপদাপদই মানুষের গোনাহের প্রতিদান হিসেবে আসে। (তাফসিরে ইবনে কাছির ৪/১৭৬)

কোনো কোনো আলেম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো এক ব্যক্তি বা প্রাণীকে জুলুম করে, সে সারা দুনিয়ার মানুষ জীবজন্তু ও পশুপাখির ওপর জুলুম করে। কেননা তার গুনাহের কারণে যখন অনাবৃষ্টি, খরা ইত্যাদি বিপদাপদ দেখা দেয় তখন দুনিয়ার সব প্রাণীই কষ্ট পায়। তাই কেয়ামতের দিন এরা সবাই ওই গুনাহকারীর বিরুদ্ধে নালিশ করবে। (তাফসিরে মা’আরিফুল কোরআন)

এ ধরনের আরো বহু হাদিস রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে কোনো গোনাহের ওপর কোনো আজাব আসে, তার সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। অতএব প্রথমত আল্লাহকে ভয় করা, অতঃপর পৃথিবীর শান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে মানবজাতির উচিত যাবতীয় পাপকর্ম থেকে বিরত থাকা এবং নিজেদের কৃতকর্ম দ্বারা নিজেদের ওপরই গজব টেনে না আনা। তাছাড়া এগুলো তো হলো পার্থিব কিছু বিপদাপদ ও ক্ষয়ক্ষতি। বাকি রয়েছে পরকালীন শাস্তি, যার কোনো তুলনাই হয় না। আল্লাহপাক আমাদের সঠিক দ্বীন বুঝে যাবতীয় গোনাহ থেকে বাঁচিয়ে দুনিয়া ও পরকালীন শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়ার তৌফিক দিন। আমিন!

লেখক : আলেম ও গবেষক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত