প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এড়িয়ে চলি অসুন্দরের শ্রদ্ধা নিবেদন

ফারহানা আজিম শিউলী

সেই ছোট্ট বেলা থেকে, আমার পছন্দের তালিকায় কাজী নজরুল ইসলাম-এর ‘শেষ ভাষণ’ অন্যতম। কতো সহ¯্র বার যে পাঠ করেছি লেখাটা! সব্যসাচীর উদাত্ত কণ্ঠে ওটি শুনলে কখনোই স্থির থাকতে পারি না, চোখের জল আটকাতে পারি না।
‘… যদি আর বাঁশী না বাজে, আমি কবি বলে বলছি নে, আমি আপনাদের ভালবাসা পেয়েছিলাম, সেই অধিকারে বলছি, আমায় আপনারা ক্ষমা করবেন। আমায় ভুলে যাবেন। বিশ্বাস করুন, আমি কবি হতে আসিনি। আমি নেতা হতে আসিনি। আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলাম। সে প্রেম পেলাম না বলে আমি এই প্রেমহীন নিরস পৃথিবী হতে নীরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম। যেদিন আমি চলে যাব, সেদিন হয়ত বা বড় বড় সভা হবে। কত প্রশংসা কত কবিতা বেরুবে হয়ত আমার নামে। দেশপ্রেমী,ত্যাগী, বীর, বিদ্রোহী- বিশেষণের পর বিশেষণ, টেবিল ভেঙে ফেলবে থাপ্পর মেরে, বক্তার পর বক্তা। এই অসুন্দরের শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রার্থ্য দিনে বন্ধু তুমি যেন যেও না। যদি পারো চুপটি করে বসে আমার অলিখিত জীবনের কোন একটি কথা স্মরণ কোর। তোমার ঘরের আঙিনায় বা আশেপাশে যদি একটি ঝরা পায়ে পেষা ফুল পাও, সেইটিকে বুকে চেপে বোলÑ ‘বন্ধু আমি তোমায় পেয়েছি।’…’
আজ আবিষ্কার করলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রায় কাছাকাছি একটি লেখা (দিনাবসান)। দেখে চমকে গেলাম। কী মিল আমার সেই অতি পছন্দের নজরুলের শেষ ভাষণের সাথে!
‘বাঁশি যখন থামবে ঘরে, নিববে দীপের শিখা
এই জনমের লীলার পরে, পড়বে যবনিকা
সেদিন যেন কবির তরে, ভিড় না জমে সভার ঘরে
হয় না যেন উচ্চস্বরে, শোকের সমারোহ।
সভাপতি থাকুন বাসায়, কাটান বেলা তাসে পাশায়
নাই-বা হল নানা ভাষায়, আহা উহু ওহো।
নাই ঘনাল দল-বেদলের, কোলাহলের মোহ।
আমি জানি মনে-মনে, সেঁউতি যূথী জবা
আনবে ডেকে ক্ষণে ক্ষণে, কবির স্মৃতিসভা।
বর্ষা-শরৎ-বসন্তেরি, প্রাঙ্গণেতে আমায় ঘেরি
যেথায় বীণা যেথায় ভেরি, বেজেছে উৎসবে
সেথায় আমার আসন পরে, স্নিগ্ধ-শ্যামল সমাদরে
আলিপনায় স্তরে স্তরে, আঁকন আঁকা হবে।
আমার মৌন করবে পূর্ণ, পাখির কলরবে।…’
দুই কবিই ‘অসুন্দরের শ্রদ্ধা নিবেদন’ চাননি। দু’জনই জানতেন, কেমন করে তাঁদের জন্ম-মৃত্যু দিনে ‘অসুন্দররা’ হামলে পড়বে নানান সভা-সমিতিতে লোক দেখানো শ্রদ্ধা নিবেদন করতে।
নজরুলের ‘শেষ ভাষণ’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বহু বছর আগে থেকেই, যে কোন স্মরণ-সভায় ‘অসুন্দরের শ্রদ্ধা নিবেদনে’ যাওয়া সযতেœ এড়িয়ে চলি। আজ রবীন্দ্রনাথের এই লেখা দেখতে পেয়ে, নিজের বিশ্বাসটা আরো পোক্ত হলো। বিখ্যাত লোকজনের সাথে ছবি তুলে, দেখিয়ে, তাঁদের অযথা মুখস্ত গুণকীর্তন করে, তাঁদের কতো কাছের ছিলাম মরিয়া হয়ে তার সাক্ষ্য প্রমাণ হাজির করতে দেখলেও বারবারই মনে বাজতে থাকে- ‘অসুন্দরের শ্রদ্ধা নিবেদনের’ কথা। সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব/ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ