প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জগতের সব ঋণ শোধ করা যায় না

ড. সেলিম জাহান : তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ তালিকাটির দিকে। শেষ হয়নি এখনো, তবু এর মধ্যেই দীর্ঘ হয়েছে। আর পাঁচ সপ্তাহ পরে কর্মাবসারে যাচ্ছি। তার আগে হস্তান্তর দলিলপত্রের অংশ হিসেবে প্রস্তুত করতে হবে জাতিসংঘে কর্মকালীন অবস্থায় যে সবদেশ ভ্রমণ করেছি, তার একটি তালিকা। সামনে ছড়ানো গত তিন দশকের একরাশ পাসপোর্টÑ বাংলাদেশের এবং জাতিসংঘের। সবগুলো থেকেই তৈরি করছি তালিকাটি – কর্মটি সহজতর নয়ই, বিরক্তিকরই বলা চলে। তবে তার মধ্যে একটিই হৃদয়-নাড়ানিয়া ব্যাপার- যতোবারই সবুজ পাসপোর্টটির দিকে চোখ যায়, ততোবারই বুকের মধ্যে রক্ত ছলকে ওঠে। আহ্, এক টুকরো বাংলাদেশ সর্বদা হৃদয়ে বহন করি। হিসাব করলে, কম দিন তো হলো না যে কাজ করছি, তেতাল্লিশ বছর। এম. এ. পরীক্ষার ফল বের হওয়ার আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৫ সালের অক্টোবর মাসে।

ফল বের না হওয়ায় প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া যায়নি। পঞ্চাশ বছর আগে একই পরিস্থিতিতে অধ্যাপক অমিয় কুমার দাশগুপ্তের নিয়োগের উদাহরণ টেনে আমাকেও প্রথম নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো মাসিক ৪০০ টাকায় টিউটর হিসেবে। ১৯৭৬ সালের মার্চ নাগাদ ফল বেরুলে আমার নিয়োগের রূপান্তর ঘটে প্রভাষকে। প্রায় দুদশক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শেষে কাজ করতে এলাম আন্তর্জাতিক বলয়ে ১৯৯২ সালে -জাতিসংঘে। কর্মস্থল নিউইয়র্কে। এ কাজেও তো কাটালাম প্রায় তিন দশক। হাসি-আনন্দে, সুখে-দুঃখে, শোকে-বেদনায় এতোগুলো বছর কেটে গেলো! কর্মক্ষেত্রে কতো বিচিত্র অভিজ্ঞতা, কতো অনন্য সাধারণ মানুষকে সহকর্মী হিসেবে পেয়েছি, কতো প্রতিভাবান উদ্দীপ্ত তরুণ-তরুণী কাজ করেছে আমার সঙ্গে। তালিকাটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অবাক মানলামÑ বিশ্বের ৮৫টা দেশে গেছি কর্মসূত্রে… বেড়াতে!

এক জীবনে কমতো দেখিনি। বাংলাদেশের ছোট্ট একটি মফঃস্বল শহরের ছেলে আমি। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানÑ বাবা কলেজ শিক্ষক ছিলেন, মার পড়াশোনা প্রাইমারী অবধি। না, কোনো অভিজাত স্কুল-কলেজে যাইনিÑ বাংলা মাধ্যমেরই ছাত্র। উচ্চশিক্ষা ঢাকা আর ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। যেখান থেকে এখানে এসেছি, সে আমার ভাগ্য বলে মানি, নমিত হই বারবার। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যখন নোবেল বিজয়ীদের সঙ্গে কাজ করি, রাজা-রানী, যুবরাজ-রাজকুমারী, রাষ্ট্রপ্রধান-প্রধানমন্ত্রী কিংবা বিশ্বনেতাদের সঙ্গে একই মঞ্চে বসি, অথবা বিশ্বের বিখ্যাত নামী-দামি সংবাদ মাধ্যমগুলোর সঙ্গে কথা বলি, তখন প্রায়ই সবকিছু অবিশ্বাস্য মনে হয়Ñ উৎপল দত্তের ভাষায় ‘প্রেত্যয় হয় না’। কিন্তু সবচেয়ে ভালো লাগে এটা ভাবতে যে এ জীবনে পৃথিবীর কতো দেশে গিয়েছি। আমার মতো মানুষের জন্যে সে যে কতো বড় সৌভাগ্য!

কি সব আশ্চর্য্য সে সব ভূখ-Ñ দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ, জর্ডানের মৃত সমুদ্র, ব্রাজিলের আমাজন অরণ্য, জাম্বিয়ার ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত। সাহারার গরমে গা পুড়ে গেছে, আইসল্যান্ডের তুষার ঝড়ে পড়েছি, জাম্বিয়ার অরণ্যে পথ হারিয়েছি, কপ টাউনের লাঙ্গা বস্তিতে গিয়ে ভয়ে কেঁপেছি। রবেন দ্বীপে ম্যান্ডেলার কারাবাসে গিয়ে মাথা নুয়ে গেছে, সেনেগালেরগারী দ্বীপে গিয়ে দাস প্রথার কথাভবে মন কেমন যেন হয়ে গেছে, ইয়েমেনের সন্ত্রাসের জায়গাগুলো দেখে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণায় মন ভরে গেছে। কতো রাজধানী থেকে রাজধানীতে গিয়েছি। শুধু গত বছরই মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে ১৫ দিনে ১২টি রাজধানীতে উপস্থি ছিলাম।

তার মধ্যে ঢাকাও ছিলো। এতো বিমান বন্দর থেকে আরেক বিমান বন্দরে পাড়ি দিয়েছি। কতো শত হোটেলে যে থেকেছি, তার গোনা-গুণতি না করাই ভালো – রাত্রিবাস নম্বরে পরিণত হয়েছিলো। সে সেবের কোনো কিছুই মনে নেই। নানান রাজধানীর দ্রষ্টব্য স্থানগুলো ভুলে গেছি। বিস্মৃত হয়েছি কোথায় কোন হোটেলে ছিলাম। মনে নেই কোন সব বিখ্যাত ব্যক্তিদের সঙ্গে ওঠা-বসা করেছি। আসলে পৃথিবীর যেখানেই গেছি, সবখানেই সব চেয়ে বেশি আকর্ষিত হয়েছি মানুষের প্রতি। মস্কোর শেষ বিকেলের মেয়েটিকে মনে আছে, সিরিয়ার সেই শরণার্থী শিশুটির কথা ভুলিনি যে, আলেপ্পো থেকে নিয়ে আসা তার ছেঁড়া পুতুলটি ছাড়বে না, মনের চোখে চীনের সেই ছেলে-মেয়ে দুটোকে দেখতে পাই যারা মুখোমুখি দুটে সাইকেলের হাতল ধরে তাদের ভালোবাসার যতি টানছিলো, মুষলধারে বর্ষার মধ্যে ইউক্রেনের যে মা নিজে ভিজে জবজবে হয়ে তিনটে বাচ্চাকে নিজের ছেঁড়া কোট দিয়ে রক্ষা করছিলেন, তার ছবি এখনও আমাকে তাড়া করে। আসলে স্মৃতিতে রয়ে গেছে সেই সব মানুষেরা যাদের সঙ্গে দেখা পথে-ঘাটে, বাজারে-বন্দরে, অরণ্যে-লোকালয়ে। মনের মধ্যে তাদের ‘নিত্য আনাগোনা’।

দেশে দেশে আমার দেখা নানান মানুষের কেউ কেউ আমার লেখায় উঠে এসেছে, কিন্তু লেখা হয়নি বহু মানুষের কথা। লন্ডনের এক মেম সাহেবের কথা এখনও তো লিখে উঠতে পারিনি, লিখিনি মলদোভারস তরুণী বধূটির কথা, যে পরম মমতায় যতœ করে রাখে তার পঙ্গু স্বামীটিকে, বাহরাইনের সে ডাক্তারটি কথায় প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ মাইল ঘুরে ঘুরে রোগী দেখে। লেখা হয়নি আয়ারল্যান্ডের সেই ঋষিতুল্য বৃদ্ধের কথা, যিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘গ্রন্থই আমার জীবন’, রুমানিয়ার সেই জিপসি নারীর কথা, যিনি দাবি করেছিলেন যে আমি তার হারিয়ে যাওয়া ভাই কিংবা দক্ষিণ সুদানেরসই শিশুটির কথা, যে আমার চশমাটি চেয়েছিলো।

এদের সবাইকে নিয়ে মনের মধ্যে এক ধরনের আর্তি আছে। লিখতে কি পারবো সবার কথা? কে জানে। জানি, এ দীর্ঘ ভ্রমণ-যাত্রায় যে সব জায়গায় গিয়েছি, সখানেও আর যাওয়া হবে না। আর গেলেই বা কি? এক নদীতে যেমন দুবার পা দেয়া যায় না, এক শহরেও দুবার যাওয়া যায় না। তার চেয়েও বড় কথা, এ পথ চলায় যাদের দেখা পেয়েছিলাম, দেখা হবে না তাদের কারো সঙ্গেই এ জীবনে। এ জীবনে কতোজনের কাছে কতো যে ঋণÑ দিয়েছি যা, নিয়েছি তার চেয়ে অনেকবশি। ও নিয়ে বেশি ভাবি নাÑ জগতের সব ঋণ শোধবার নয়, আর তা শোধ করাও যায় না একজীবনে। লেখক : অর্থনীতিবিদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ