প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাজনীতি ও বহুবিধ চাতুরি

বিভুরঞ্জন সরকার : সিনিয়র সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু তার ফেসবুক ওয়ালে একটি ছোট্ট স্ট্যাটাস দিয়েছেন। লিখেছেন : নতুন অভিধান! Politics রাজনীতি কি Polytricks বহুবিধ চাতুরিতে পরিণত হলো?

প্রশ্নটি নিশ্চয়ই অনেকের মনেই ঘুরছে। রাজনীতির নামে দেশে যে নীতিহীনতার প্রতিযোগিতা চলছে এবং সবকিছু যুক্তির আওতায় আনার যে বুদ্ধিবৃত্তিক অসাধুতার প্রসার ঘটছে তা কাউকে কাউকে ভাবিয়ে তুলছে। কেউ কেউ বিচলিত বোধ করছেন, কেউ আবার সবকিছু মেনে নেওয়া বা সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে চলার চেষ্টাও করছেন। যারা পারছেন, তারা এগিয়ে যাচ্ছেন, তাদের জীবনে কিছুটা গতি আছে। আর যারা পারছেন না তারা পিছিয়ে পড়ছেন, হারিয়ে যাচ্ছেন, তাদের জীবন কোথাও আটকে আছে, স্থবির হয়ে আছে।

রাজনীতি নিয়ে আমাদের অনেকেরই আক্ষেপ-সমালোচনার শেষ নেই। রাজনীতি খারাপ হয়ে পড়েছে। রাজনীতিতে ভালো মানুষের জায়গা নেই। কালো টাকার মালিক আর পেশিশক্তির জোর না থাকলে রাজনীতিতে এখন কল্কে পাওয়া যায় না। ভালো মানুষেরা এখন আর রাজনীতি করেন না, রাজনীতিতে আসতে চান না। এ সব কথা এখন আমরা সবাই বলি, সবাই শুনি। রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের কথাও শোনা যায়। দেশের প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি খারাপ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে রাজনীতির বারোটা বাজালো, এটাও আমরা প্রায়ই শুনি এবং বলি। রাজনীতিতে একটি তৃতীয় ধারা বা তৃতীয় শক্তির প্রয়োজনীয়তার কথাও মাঝেমধ্যেই শোনা যায়। কিছু উদ্যোগ-আয়োজন দেখা যায়। কিন্তু কিছুই আর দানা বাঁধে না। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি, এই দুই ধারাই রাজনীতিতে শক্তিমান ও দৃশ্যমান থাকে।

রাজনীতিতে যে বহুবিধ চাতুরির প্রবেশ বা অনুপ্রবেশ ঘটলো সেটা নিশ্চয়ই একদিনে ঘটেনি। রাজনীতিতে পচন ধরার শুরু কবে থেকে তা দিন-তারিখ দেখে বলা যাবে না। তবে রাজনীতিতে ভালো-মন্দের দ্বন্দ্ব সব সময়ই আছে। একসময় রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ ছিলো ভালো মানুষদের হাতে। ধীরে ধীরেই সবকিছু নষ্টদের দখলে চলে গেছে। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ সত্তর দশকের শেষ দিকেই বলতেন, পলিটিক্সে পলিট্রিক্স ঢুকে গেছে।

এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ একটি গল্প বলতেন।

গল্পটি এই রকম : গ্রামের এক কৃষক তার কলেজ পড়ুয়া ছেলেকে পাট বিক্রি করার জন্য হাটে পাঠিয়েছেন। ছেলেটি পাট বিক্রি করেছে ৪০ টাকা মণ। কিন্তু বাবাকে এসে বলেছে ৩০ টাকা মণ। বাবা পরে জানতে পেরে মোজাফফর আহমেদকে বলেছিলেন, তার ছেলে তার সঙ্গে পলিটিক্স করেছে। ছেলের চালাকি বা বাপকে ফাঁকি দেওয়ার বিষয়টিই ছিলো ওই কৃষকের কাছে পলিটিক্স। এখন রাজনীতিতে এই ঠগবাজির পরিমাণ বেড়েছে। পলিটিক্স এখন সত্যি পলিট্রিক্স হয়ে উঠেছে। রাজনীতি সত্যি এখন বহুবিধ প্রতারণার নাম। আদর্শ নিয়ে এখন আর কেউ মাথা ঘামায় না। ব্যক্তিগত লাভালাভের হিসাব ছাড়া আর সবই গৌণ। মুখে নীতিকথা বলা হবে, কিন্তু চর্চা হবে নীতিহীনতার। এই নীতিহীনতার চর্চা যারা করেন তাদের কারো কারো প্রতি আমাদের অনেকের সহানুভূতি থাকে। আবার কারো প্রতি থাকে নির্দয় বিরোধিতা।

যারা দাবি করেন, তারা সাতেপাঁচে নেই। তারা ভালোকে ভালো এবং খারাপকে খারাপ বলেন, তারাও আসলে সত্য বলেন না। মানুষ সাধারণত পক্ষপাতমুক্ত হতে পারেন না। যারা নিজেদের নিরপেক্ষ বলে দাবি করেন তাদের মধ্যেও পক্ষপাত আছে। আমি যদি বিএনপির সমর্থক হই, অথবা আমার কোনো লেখা যদি বিএনপির পক্ষে যায় তাহলে অনেকেই নিরপেক্ষ বলে বাহবা দেবেন। আবার আমার লেখা যদি আওয়ামী লীগের পক্ষে যায় তাহলে আমি হয়ে যাবো, দালাল, দলকানা, দলদাস ইত্যাদি।

আমি একবার, নব্বই দশকের মাঝামাঝি আমাদের দেশের একজন বড় শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেবেন কিনা? তিনি না সূচক জবাব দিয়ে বলেছিলেন, ‘ক্যা দাদা, আমি যে কয়েকজন মন্ত্রী পুষতাছি, তাতেই তো আমার চলে। ওই মন্ত্রীদের মাসে মাসে টাকা দেই, তারাই আমার স্বার্থ দেখে। আমি আমার ব্যবসা দেখি।’ পরে অবশ্য তিনি নিজে সরাসরি রাজনৈতিক দলে যোগ না দিলেও স্ত্রীকে একটি দলের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছেন। তিনিও পেছন থেকে ওই দলের হয়েই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

অনেকেই এখন দেশে গণতন্ত্র নেই বলে হাহাকার করছেন। কেউ কেউ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে নেমেছেন। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেই যে, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র থেকে সরে গেছে, তা বলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব কি বিএনপির কাঁধে চাপানো ঠিক হবে? বিএনপি কি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দল? জামায়াতের মতো একটি জঙ্গি দলকে জোটসঙ্গী-ভোটসঙ্গী করে বিএনপি দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এটা কি আদৌ সম্ভব? এটা কি বিশ্বাসযোগ্য?

ড. কামাল হোসেনের মতো একজন গণতন্ত্রী মানুষ কীভাবে জামায়াতের সঙ্গে সহাবস্থানের বিষয়টি মেনে নিলেন? তিনি ক্ষমতায় যেতে চান না, ভোটেও দাঁড়াননি। তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছেন। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতও আছে। জামায়াতকে ২৫ আসনে ধানের শীষ প্রতীক দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে বিএনপির পক্ষ থেকে যাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে আছে যুদ্ধাপরাধীদের সন্তান কিংবা স্বজন। এটা কি দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সহায়ক? ড. কামাল হোসেন কারো কারো কাছে জাতির বিবেক হয়ে আছেন। কিন্তু বিএনপি যাদের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে, তাদের জন্য নিশ্চয়ই ড. কামাল ভোট চাইবেন, চাইতে হবে।

কেউ হয়তো বলবেন, আওয়ামী লীগের সব প্রার্থী কি ধোয়া তুলসি পাতা? আর্থিক কেলেংকারিসহ নানা কারণে বিতর্কিত, চিহ্নিত সংখ্যালঘু নির্যাতনকারী কি আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পাননি? আওয়ামী লীগ থেকে খারাপ মানুষ মনোনয়ন পেলে ভালো আর বিএনপি থেকে পেলে খারাপ?

না, সেটা নয়। খারাপ, খারাপই। এখন ড. কামাল কি নির্বাচনী প্রচারে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে এটা বলবেন যে, আপনারা আগামী নির্বাচনে খারাপ মানুষদের ভোট দেবেন না। প্রার্থী দেখে ভোট দিন, মার্কা বা দল দেখে নয়।

বহুবিধ চাতুরির আশ্রয় না নিয়ে আগামী নির্বাচনে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনে কেউ ভূমিকা পালন করবেন বলে আমার অন্তত এখন পর্যন্ত মনে হয় না। লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ