প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাজনীতির হাটে নেতা কেনা-বেচা

ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন : সারাদেশে নির্বাচনী বাদ্য বাজছে। এখন পর্যন্ত আয়োজন দেখে মনে হচ্ছে আসন্ন নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ সব দলই অংশগ্রহণ করবে। ইতোমধ্যে দলগুলো তাদের প্রার্থী তালিকাও মোটামুটি চূড়ান্ত করে ফেলেছে। সেই সাথে শুরু হয়েছে দলবদলের খেলা। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে বেশকিছু নেতা বিএনপি এবং গণফোরামে ভীড় জমিয়েছে। এইসব দলবদলের অধিকাংশই জনগণের মাঝে তুমুল সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ ব্যাপকভাবে নিন্দিতও হচ্ছেন।

যদিও রাজনীতিতে দলবদল নতুন কিছু নয়, এর সূচনা হয়েছিল স্বৈরাচারী সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের সেনাপতি থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাবার সময় থেকে। পতিত মুসলিম লীগের, ঘৃণিত রাজাকার এবং স্খলিত আওয়ামী লীগের একগুচ্ছ দলছুটদের নিয়ে তিনি তার রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন। রাজনীতির সুষ্ঠু সংস্কৃতিকে তছনছ করে তিনি কোরবানির হাটের মতোই রাজনীতির হাটে নেতা কেনা-বেচা শুরু করেছিলেন। অস্ত্রের মুখে, নানা রকমের ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং টাকা-পয়সার বিনিময়ে তিনি অন্য দলের নেতাদের নিজ দলে ভিড়িয়েছিলেন। সেই ধারা পরবর্তী স্বৈরশাসকের আমলেও অব্যাহত ছিল। অনেকদিন পরে এবারে এসে বিএনপি-গণফোরামের কল্যাণে দলবদল প্রায় শিল্পের পর্যায়ে চলে গেছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে অনেকেই ছুটছে বিএনপি বা গণফোরামের অফিসে। ধান্দা একটাই, ধানের শীষ মার্কা নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, দুটো দলের আদর্শ সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী হলেও শুধু ক্ষমতার লোভে এই দলবদলে এইসব নেতাদের কারো কোনো আপত্তি দেখলাম না। চোখে-মুখে ন্যূনতম লজ্জার কোনো বালাইও নাই।

হালেরটকশো বয়, সাবেক এমপি গোলাম মাওলা রনির কথাই বলি। আওয়ামী লীগের কাছে মনোনয়নের জন্য এবার আবেদন করলেন, মনোনয়নের জন্য সাক্ষাতকারের আগে টেলিভিশনের টকশো’তে গিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করতে করতে মুখে ফেনা তুলে ফেললেন, আর মনোনয়ন না পেয়েই সোজা চলে গেলেন বিএনপির কার্যালয়ে। বিএনপি হলো সেই দল, যে দলটিকে সবাই জামায়াতে ইসলামের আপন ভাই বলেই জানেন। কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, জামায়াত-বিএনপি হলো মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ইউটিউবের কল্যাণে গোলাম মাওলা রনি সাহেবের সংসদে প্রদত্ত একটা বক্তৃতা শুনলাম যেখানে তিনি মওদুদীবাদী ইসলামে বিশ্বাসী জামায়াতকে তুলোধুনো করেছেন। এখন সেই মানুষটিই বিএনপিতে যোগ দিয়ে জামায়াতের সাথে জোট বাঁধলেন। তাহলে নীতি-নৈতিকতার ন্যূনতম জায়গাটা থাকলো কই?

আরেক নেতা, যিনি সারাজীবন বঙ্গবন্ধুর কথা বললেন, দুর্দিনে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একের পর এক বই লিখলেন , যা পড়ে আমরা অনেকেই উজ্জীবিত হয়েছি, শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের যিনি তথ্য প্রতিমন্ত্রী ছিলেন, সেই অধ্যাপক আবু সাঈয়িদ মনোনয়ন না পেয়ে যোগ দিলেন ড. কামাল হোসেনের গণফোরামে। ধারণা করছি, তিনিও ধানের শীষ প্রতীকে পাবনা থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ওই আসনে তার পক্ষে নির্বাচনে কাজ করবেন যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসিতে ঝোলা জামায়াতের নেতা মতিউর রহমান নিজামীর অনুসারীরা। মন থেকে মেনে নিতে পারবেন তিনি? এক জীবনে মানুষের কতোকিছু চাই? সাঈয়িদ সাহেবদের তো বয়সও হয়েছে। মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসার আসন থেকে রাতারাতি ঘৃণার আসনে পর্যবসিত হওয়া কি খুব জরুরি? এরকম আরো অনেকেই দলবদল করেছেন, তালিকা দীর্ঘ করে লাভ নেই।

আমরা যারা পঁচাত্তরপরবর্তী প্রতিকূল পরিবেশে রাজনীতি করেছি তাদের জন্য এসব মেনে নেওয়া কষ্টকর। প্রথম যৌবনে রাজনীতিকে আমরা ত্যাগ-তিতিক্ষায় ভরপুর জনকল্যাণমূলক একটা কাজ বলেই জেনেছি। জাতীয় পর্যায়ের অনেক নেতার সাথে প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতি করার সুযোগ আমার হয়েছিলো। শুধু রাজপথের রাজনীতিই নয়, পারিবারিক জীবনেও খুব কাছ থেকে তাদের অনেককে দেখেছি। ব্যক্তিজীবনে ধণাঢ্য এক আওয়ামী লীগ নেতাকে একবার আমি ছেড়া জামা রিপু করে পরতে দেখে খুব বিস্মিত হয়েছিলাম। সেবার ভারত থেকে পড়াশোনার ছুটিতে ফেরার পথে আমি সেই আওয়ামী লীগ নেতার জন্য উপহার হিসেবে একটা জামা কিনে এনেছিলাম। তিনি সবিনয়ে আমার উপহারটি ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি আমার স্বস্তিটুকু নষ্ট করো না’। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, আমি রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে সেরকম ত্যাগ আর আশা করি না সত্য, তাই বলে ন্যূনতম কোনো সততা থাকবে না? মনোনয়ন পেলে ভালোু, না পেলেই ¯্রফে নির্বাচনী মনোনয়নের লোভে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর দলে গিয়ে যোগদান করতে হবে? ইবলিশের তাও কিছু নীতি আছে, এদের দেখি তাও নেই। দলমত নির্বিশেষে এইসব চূড়ান্ত নীতিহীন দলছুট নেতাদের বর্জন করা এখন সময়ের দাবি।

লেখক : অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী কবি ও চিকিৎসক। চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ