প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মনোনয়ন বাণিজ্য বিএনপিতেও

সমকাল : দলীয় যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ করেছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। তাদের দাবি, প্রার্থী বাছাইয়ের দায়িত্বে থাকা জ্যেষ্ঠ নেতারা যোগ্যদের বাদ দিয়ে নিজ অনুসারীদের মনোনয়ন দিয়েছেন। বিএনপির গুলশান কার্যালয়ের কর্মকর্তারা মনোনয়ন পেলেও আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখা কয়েকজন নেতা বঞ্চিত হয়েছেন। শরিক দলের নেতাদের ভোট না থাকলেও তাদের দেওয়া হয়েছে বিএনপি অধ্যুষিত আসন। এসব কারণে অসন্তোষ বিএনপিতে। ১২ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকলেও এবারের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মনোনয়নে বাণিজ্যেরও অভিযোগ উঠেছে। এর আগে জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধেও এই অভিযোগ ওঠে। বিএনপি প্রায় প্রতিটি আসনে একাধিক প্রার্থী দিয়েছে। দলীয় মনোনয়নের প্রত্যয়নের চিঠিতে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে এমন আনকোরা নেতাদের নাম জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে অপমানিত বোধ করেছেন পুরনো নেতারা। নতুন মুখের একটি বড় অংশ টাকার বিনিময়ে নাম তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, এসব অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের শাস্তি দিতে নির্দেশ দিয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

প্রায় ৭০০ নেতাকে মনোনয়নের চিঠি দেওয়া হলেও, ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান, সাবেক এমপি লায়ন হারুন অর রশিদ, নাজিমউদ্দিন আহমেদসহ আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক এমপি মনোনয়ন পাননি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে সারাদেশে বিএনপির ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যেও চাঁদপুর-২ আসনে লায়ন হারুন অর রশিদ ও লক্ষ্মীপুর-১ আসনে নাজিমউদ্দিন জয়ী হন।

বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবন্দি থাকায় এবার প্রার্থী বাছাই করেছেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা। কিন্তু তারা নিজেদের মতো করে আসন ভাগাভাগির কাজ করেছেন। কুমিল্লা-২ আসনে দলের স্থায়ী কমিটির প্রয়াত সদস্য এম কে আনোয়ারের আসনে তার ছেলেকে বাদ দিয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন নিজেই কুমিল্লা-১ এবং কুমিল্লা-২ আসনে প্রার্থী হয়েছেন।

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্যের আপত্তিতে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির কারাবন্দি সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেল নির্বাচন থেকেই সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন। কেন্দ্র থেকে বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করায় দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল নির্বাচন থেকেই সরে দাঁড়িয়েছেন।

দলটির ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা জানান, দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রির সময় যে উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছিল তার বিপরীত ছিল গুলশান কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র বিতরণের ক্ষেত্রে। প্রতারণা আর হয়রানির শিকার হতে হয়েছে অনেক মনোনয়নপ্রত্যাশীকে।

দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয় গুলশানে গত সোম ও মঙ্গলবার মনোনয়নপত্র বিতরণে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী নেতারা নাম প্রকাশ না করে জানিয়েছেন, কার্যালয়ে প্রবেশ থেকে মনোনয়নের চিঠি হাতে পাওয়া পর্যন্ত ‘ঘাটে ঘাটে’ টাকা দিতে হয়েছে। দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাও বড় অঙ্কের টাকা নিয়েছেন। এ কারণে দলের মনোনয়নপ্রাপ্ত নেতার পরিসংখ্যান পর্যন্ত নেই।

রাজধানীর গুলশান এলাকার কয়েকজন নেতা অভিযোগ করে বলেন, ঢাকা-১৭ আসনে শওকত আজিজ রাসেল নামের একজন বিএনপির মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। দলে তার কোনো পদ নেই। তিনি কখনও বিএনপি করেননি। তিনি নোয়াখালী-৩ আসনে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন, গুলশান কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে পেয়ে যান ঢাকা-১৭ আসনের টিকিট। অভিযোগ রয়েছে, তিনি টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন পেয়েছেন। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ মঞ্জুর হোসেন এ অভিযোগ করেছেন।

বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতারা জানান, গুলশান কার্যালয় থেকে টেলিফোন করে তাদের মনোনয়নের প্রত্যয়নপত্র নিতে বলা হয়। গুলশান কার্যালয়ের কর্মকর্তা পরিচয় দেওয়া তিনজন ছাড়াও একজন ভাইস চেয়ারম্যানের সহকারী এবং একজন সিনিয়র নেতার ব্যক্তিগত সহকারী তাদের ফোন করেন। কার্যালয়ের এই ‘সিন্ডিকেট’ তাদের মনোনয়নপত্র দেওয়ার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে।

বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্বাক্ষর করা মনোনয়নপত্র কার্যালয়ের দ্বিতীয়তলা থেকে নিচতলায় আসার পর গায়েব হয়ে যায়। পরে প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকার বিনিময়ে মনোনয়নপত্র দেয় ‘সিন্ডিকেট’। আবার অনেক ক্ষেত্রে একই আসনের প্রভাবশালী প্রার্থীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে মনোনয়নপত্র গায়েব করার ঘটনাও ঘটেছে। এ রকম ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রে দলের মহাসচিব দ্বিতীয়বার মনোনয়নপত্র দেন। রাজবাড়ী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ ও চুয়াডাঙ্গা জেলার বিএনপির সদস্য শরীফুজ্জামান শরীফের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটে। হারুন অর রশিদ  জানান, তার প্রথম চিঠিটি হারানো গেছে বলে গুলশান কার্যালয় থেকে বলা হয়েছিল। তবে কোনো আর্থিক লেনদেন ছাড়াই দ্বিতীয় চিঠি পেয়েছেন।

শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, তিনি ও কর্নেল (অব.) কামরুজ্জামান সোমবার থেকে মনোনয়নের জন্য ঢাকা অবস্থান করলেও তাদের মনোনয়ন পেতে হয়েছে মঙ্গলবার রাতে। এর জন্য তাদের অনেক জায়গায় ধর্ণা দিতে হয়েছে।

বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, ‘সিন্ডিকেটে’র দুই নেতার ব্যক্তিগত সহকারী দেশের বিভিন্ন জেলার প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। বাকি তিনজন তাদের কাছ থেকে আর্থিক লেনদেন করতেন। এ ‘সিন্ডিকেটে’র বিরুদ্ধে মহাসচিবের স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া প্রত্যয়নপত্র বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। কুমিল্লা-১১ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী কামরুল হুদা এর শিকার হয়েছেন। এ কারণে তিনি মনোনয়ন জমা দেননি। তার মতো কয়েকজনের কাছে ভুয়া প্রত্যয়নপত্র বিক্রির ঘটনা ঘটেছে। গুলশান কার্যালয়ের ‘সিন্ডিকেট’ এবং দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার রোষানলে পড়া বেশ কয়েকজন প্রার্থী প্রত্যয়নপত্র নিতে পারেননি।

নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের হেভিওয়েট প্রার্থী অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারকে বাদ দিয়ে দলের সিনিয়র নেতাদের ব্যক্তিগত পছন্দের কাজী মনিরসহ আরেকজনকে মনোনয়নপত্র দেওয়া হয়। তবে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তৈমূর আলম খন্দকার গুলশান কার্যালয়ে শোরগোল সৃষ্টি করলে তাকে শেষ পর্যন্ত মনোনয়নপত্র দেওয়া হয়।

তৈমূর আলম খন্দকার জানান, দলের জন্য তার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। এখনও যদি দলের কাছে নিজের প্রাপ্য বুঝে নিতে হয়, তবে তা লজ্জার বিষয়। দলের চেয়ারপারসন কারাগারে বন্দি, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বিদেশে। এই অবস্থায় ব্যক্তিস্বার্থ নিয়ে চিন্তা করলে দলের ক্ষতি।

চট্টগ্রাম-১২ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী সৈয়দ সাদাত আহমেদকেও মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক কারণে তাকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। তিন মাস ‘নিখোঁজ’ ছিলেন। তার ব্যবসা ধ্বংসের মুখে। অথচ তাকে মনোনয়ন না দিয়ে ১০ বছর ধরে কানাডায় থাকা গাজী শাজাহান জুয়েলকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান ২০০১ ও ২০০৮ সালে টাঙ্গাইল-৮ আসন থেকে নির্বাচন করেন। জোটবদ্ধ নির্বাচনে কারণে এবার আসনটি ঐক্যফ্রন্টকে ছেড়ে দিচ্ছে বিএনপি। আযম খান বলেন, দলের কেউই তাকে এ কথাটি জানাননি। সান্ত্বনা পর্যন্ত দেননি।

একই অবস্থা লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের তিনবারের এমপি আশরাফউদ্দিন নিজানের। তার আসনে জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রবকে বিএনপি জোটের মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে। এতে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বিএনপি। তারা বলছে, আ স ম রব গত নির্বাচনের নিজানের কাছে জামানত হারিয়েছিলেন; কিন্তু তিনিই এবার জোটের প্রার্থী!

বিএনপির বিশেষ সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন এবং যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন হাসান একই বঞ্চনার শিকার বলে অভিযোগ করেছেন তাদের অনুসারীরা। ঢাকা-১৫ আসনে ধানের শীষের টিকিট পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান। এ আসনে জামায়াত কখনও জামানত বাঁচাতে না পারলেও জোটের সমীকরণের কারণে বিএনপি নেতারা বঞ্চিত হয়েছেন।

বাগেরহাট-৩ আসনে ২০০১ সালে মনোনয়ন পায় জামায়াতের প্রয়াত নেতা গাজী আবু বকর সিদ্দিকী। পরের নির্বাচনে জামায়াতের আবদুল ওয়াদুদ শেখ জোটের প্রার্থী হয়েও ৩৩ হাজার ভোটে হারেন আওয়ামী লীগের কাছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংখ্যালঘু ভোট থাকা এ আসনে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন বিএনপির ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম। কিন্তু এবারও জামায়াতকে এ আসনটি ছেড়ে দিচ্ছে বিএনপি। এতে ক্ষুব্ধ স্থানীয় নেতারা। ফরিদুল ইসলাম বলেছেন, জামায়াতের জয়ী হওয়ার মতো প্রার্থী থাকলে তার আপত্তি ছিল না আসন ছাড়তে। যাকে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে তিনি আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ, জয়ী হতে পারবেন না। আসনটি হারাবে জোট।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত