প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

তোরা যে যা বলিস ভাই, আমি এমপি হতে চাই

দৈনিক আমাদেরসময় : এবারে নির্বাচনের মেজাজ অনেক দিক থেকেই ভিন্ন। কখনো কখনো এই মেজাজে ভর করছে নতুন নতুন ঘটনা, যা আবার কখনো সবার নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিচ্ছে। এবারের নির্বাচনের সবচেয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এমপি হওয়ার জন্য মানুষের অসীম আগ্রহ। বহুজন এমপি হতে চান। আর তাদের এই চাওয়ার পেছনে জনগণকে দোহাই হিসেবে ব্যবহার করছেন, বলছেন জনগণ তাদের চায়। তাই রাজনীতির মাঠে বিচরণ না করা আমলা, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, চিকিৎসক, অভিনেতা, খেলোয়াড়রাও শামিল হয়েছেন দলীয় মনোনয়ন জেতার দৌড়ে। বিভিন্ন চ্যানেল প্রচার করছে নতুন মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার, তাদের স্বপ্ন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ছুড়ছেন তাদের কাছে, কেন এমপি হতে চান? মজার বিষয় হলো দলীয় ভিন্নতা থাকলেও এ প্রশ্নের উত্তরে এমপি হওয়ার জন্য প্রস্তুত মনোনয়নপ্রত্যাশীরা সবাই প্রায় এক রকমভাবেই বলছেন, দেশ ও জনগণের সেবা করতেই এমপি হতে চান তারা। এরই ধারাবাহিকতায় অনেকেই জনসংযোগও করা শুরু করেছিলেন। এমপি হওয়ার জন্য মানুষের ঝোঁক বাড়ছে দিন দিন। কারণটি সহজেই অনুমেয়।

১৯৯০ সালের পর গত ২৮ বছরে চারটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশে। তবে কোনোটিতেই মোট প্রার্থীর সংখ্যা তিন হাজার ছাড়ায়নি। অতীতের তথ্য থেকে জানা যায়, ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ভোট করেন ২ হাজার ৭৮৭ জন। ১৯৯৬ সালে সপ্তম সংসদে প্রার্থী ছিলেন ২ হাজার ৫৭২ জন। তবে এই সংখ্যা কমে যায় ২০০১ সালে। অষ্টম সংসদে ভোটে দাঁড়ান ১ হাজার ৯৩৯ জন। ২০০৮ সালে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা চালুর পর নবম সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীসংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৬৭ জনে। তবে এবার তা প্রায় ১০ গুণ বেড়েছ। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে এমপি হতে চান ১২ হাজারের বেশি নেতা। দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে রয়েছেন তারা। এ প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণরা অবতীর্ণ হবেন ৩০ ডিসেম্বরের ভোটযুদ্ধে। তাদের বড় অংশই শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে যেতে পারবেন না। তবে অতীতের কোনো নির্বাচনেই এত মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন না। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যেই প্রাথমিকভাবে ২৩০টি আসনের প্রার্থীর নাম প্রকাশ করেছে। তবে জোটের হিসাব এখনো ফাইনাল হয়নি। সেভাবে এগোচ্ছে বিএনপিও।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত ১২ নভেম্বর শেষ হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়নপত্র বিক্রি কার্যক্রম। ১৩ নভেম্বর মঙ্গলবার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার কাজও শেষ হয়। নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দলটির মনোনয়নপত্র কিনেছেন ৪ হাজার ২৩ জন। জানা গেছে, সর্বশেষ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২ হাজার ৬০৮ জন আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র কিনেছিলেন। সেই হিসাবেও মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। বিএনপিও পিছিয়ে নেই, বরং আওয়ামী লীগ থেকে এগিয়েই আছে। আওয়ামী লীগের থেকে বিএনপির এমপি হতে ইচ্ছুক নেতা বেশি বলেই মনে হচ্ছে। বিএনপির মনোনয়নপত্র বিক্রি হয়েছে আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশি। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহীদের মাঝে ৪ হাজার ৫৮০টি দলীয় মনোনয়নপত্র বিক্রি করেছে। এর অনেকগুলো কারণের একটি দীর্ঘদিন পর বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে।

নানা সংশয়কে পাশ কাটিয়ে, ঐক্যফ্রন্টের নানা হিসাব মাড়িয়ে সেই ফ্রন্টে বিএনপির যুক্ততা এবং শেষ পর্যন্ত বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত এবারের নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক আশা-উদ্দীপনা তৈরি করেছে। স্পষ্টভাবেই মনে হচ্ছে এবারের নির্বাচন কোনোভাবেই একতরফা হবে না। তবে কিছুটা সংশয় আছেই, থাকবেই ৩০ তারিখ পর্যন্ত। আর সেই সংশয়ের মূলে রয়েছে কিছু শঙ্কাÑ নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে তা নিয়ে। বিগত কয়েকটি নির্বাচন আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে এখন আর প্রার্থী হতে কে কত বছর ধরে রাজনীতি করেন, এলাকার মানুষের জন্য তার কতটুকু অবদান, প্রার্থী নিঃস্বার্থ কিনা? ত্যাগী কিনা? মানুষের পাশে থাকার, কাছে থাকার অভিপ্রায়/অভিজ্ঞতা আছে কিনাÑ সেগুলো খুব কমই বিবেচনায় আনা হয়। এবারের নির্বাচনে এমপি হওয়ার লাইনে থাকাদের মধ্যে রয়েছেন বিভিন্ন পেশার মানুষই। শোবিজ তারকা, এ ছাড়া সাবেক জনপ্রতিনিধি, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, প্রবাসী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, সাবেক পুলিশ অফিসারÑ নেই শুধু সম্পদহীন মানুষেরা। আসন্ন নির্বাচনে অন্তত ৫০ জন চিকিৎসক এমপি প্রার্থী হতে মাঠে নেমেছেন। কীভাবে যেন সবাই জেনে গেছেন সাধারণ মানুষরা এ দেশ স্বাধীন করলেও এরা এ দেশে শুধু হয়তো ভোটাধিকারই পাবে এর বেশি নয়। এই প্রার্থিতার দৌড়ে সবচেয়ে বেশি রয়েছেন গার্মেন্ট ব্যবসায়ীরা। এবারের এমপির টিকিট পাওয়ার দৌড়ে মাঠে নেমেছেন অর্ধশতাধিক গার্মেন্ট ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি।

বাংলাদেশের রাজনীতি যে অর্থের কাছে বন্দি তা স্পষ্টতই বোঝা যায় ব্যবসায়ীদের এমপি হওয়ার খায়েশ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর থেকে এর অনুমোদন দেখে। জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ী সংসদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বর্তমান সংসদে ব্যবসায়ীদের হার ৫৯ শতাংশ। সংখ্যায় ১৭৭ জন। তারা কোনো না কোনো ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে কমপক্ষে ৩০ জন শিল্পপতি-ব্যবসায়ী সংসদ সদস্য আছেন। জানা যায়, ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৫ জন শিল্পপতি-ব্যবসায়ী মনোনয়ন নিয়ে সংসদ সদস্য হন। ১৯৯৬ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৪ জনে। ২০০১ সালে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪ জনে। ওয়ান-ইলেভেন ঝড়ে এ সংখ্যা কমে গেলেও ২০০৮ সালে ৩৮ ব্যবসায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে এবার বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় ব্যবসায়ীর সংখ্যা আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশি, কারণ বিএনপিতে ব্যবসায়ী নেতার সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। অতীত তথ্য থেকে জানা যায়, নবম সংসদে বিএনপি থেকে সবচেয়ে বেশি, ৭৩ শতাংশ ব্যবসায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আসন্ন নির্বাচনেও শতাধিক ব্যবসায়ী বিএনপি থেকে মনোনয়নপত্র কিনে জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে নতুন মুখের সংখ্যাও অনেক। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ছাড়াও ১৪ দলীয় জোট, ঐক্যফ্রন্ট ও যুক্তফ্রন্টের বিভিন্ন শরিক দল থেকে মনোনয়নপত্র নিয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী। তাদের বেশিরভাগই এফবিসিসিআই, পোশাক খাতের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা। বিভিন্ন পণ্যভিত্তিক ব্যবসায়ী সংগঠন ও জেলাভিত্তিক ব্যবসায়ীদের সংগঠন জেলা চেম্বারের অনেক নেতাও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনয়নপত্র কিনে জমা দিয়েছেন।

সংখ্যার হিসাবে আরও এগিয়েছেন নারীরাও। সাবেক নারী এমপিদের বেশিরভাগই আবার নিজ নিজ দলের মনোনয়ন চাইছেন। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তথা সিটি করপোরেশন, জেলা ও উপজেলা পরিষদ এবং পৌরসভার চেয়ারম্যান, মেয়র ও কাউন্সিলর পদে দায়িত্ব পালন করছেনÑ এমন বেশ কয়েকজন নারীও এমপি হওয়ার প্রত্যাশা থেকে মাঠে আছেন। এ ছাড়া দলীয় রাজনীতির বাইরেও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সমমনা সংগঠনের নেতৃত্বে থাকা নারীরাও নিজ নিজ মতাদর্শের দলগুলো থেকে প্রার্থী হতে চাইছেন। এ ক্ষেত্রে আইনজীবী, চিকিৎসক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী এবং চলচ্চিত্র, নাট্য ও সংগীত জগতের তারকাসহ সংস্কৃতিকর্মীদের প্রাধান্য বড় দুটো দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় দেখা গেছে।

জনগণের মধ্যে যে এমপি হওয়ার ঝোঁক অতিমাত্রায় বেড়েছে, তা বোঝা যায় দলীয় মনোনয়নপত্র কেনার জন্য আগ্রহী প্রার্থীদের হুমড়ি খেয়ে পড়া দেখে। এমনকি এবার এক আসনে সর্বোচ্চ ৫২ জনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করার ঘটনাও হয়েছে।

কেন সবাই এমপি হতে চান? সবার ক্ষেত্রেই একই বাক্য জনগণ তাদের চায়। আর তারাও জনগণের সেবা করতে চান। সবকিছুই এখন ক্ষমতাকেন্দ্রিক। সবাই কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতা চায়। যারই কিছু অর্থ রয়েছে, সেই অর্থের ওপর ভর করে সে-ই ক্ষমতা পেতে মরিয়া হয়ে উঠছে। ক্ষমতাকাক্সক্ষীরা মনে করেন একবার এমপি হতে পারলেই নিজের ক্ষমতার প্রদীপটি তার কাছেই থাকবে। এখন যতই জনগণের দ্বারে দ্বারে কথার ফুলঝুরি ফোটাক না কেন, জনগণও জানে নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের কাছে পাওয়া কতটা কঠিন হয়। আর সবাই এমপি হতে চান জনগণের সেবা করার জন্য, কিন্তু এমপি না হয়ে কী এই সেবা করা যায় না। পৃথিবীর বহু মানুষ এমপি না হয়েও মানুষ হিসেবে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন জনসেবা দিয়েই। আপনাদের প্রত্যেককে জনগণ এমপি হিসেবে দেখতে চায় কিনা জানি না, তবে জনগণ এতদিনে জেনে গেছে, তাদের সেবক হওয়ার জন্য এখন আর কেউ এমপি হতে চান না। তাদের আগ্রহ অন্যত্র, উদ্দেশ্যও একবারেই অনুমেয়। ত্যাগী রাজনৈতিক নেতাদের আর কোথাও দেখি না, তারা কোথাও নেই।

য় ড. জোবাইদা নাসরীন : শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

zobaidanasreen@gmail.com

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ