Skip to main content

গোলাম রাব্বানীর নির্দেশে সায়েন্স ল্যাব–ধানমন্ডিতে হামলা: প্রথম আলো

রবিন আকরাম : প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সায়েন্স ল্যাবরেটরি–ধানমন্ডি এলাকায় ৫ আগস্ট শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছিলেন মূলত ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর নির্দেশে এই বেপরোয়া হামলার ঘটনা ঘটে। আর মাঠে থেকে হামলায় নেতৃত্ব দেন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সিহাবুজ্জামান ও কলেজ শাখা ছাত্রলীগের অন্তত পাঁচজন যুগ্ম আহ্বায়ক। ঢাকা কলেজের বিভিন্ন আবাসিক হলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৪ আগস্ট শনিবার ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলা হয়েছে শুনে কলেজ ছাত্রলীগের নেতারা সংগঠনের কর্মীদের সেখানে নিয়ে যান। পরে রাতে নেতারা সবাইকে পরের দিনের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের ওপর ৪ আগস্টও জিগাতলায় হামলা হয়েছিল। এ হামলার প্রতিবাদে ৫ আগস্ট শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ মিছিল বের করে। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ঢাকা নার্সিং কলেজের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী শাহবাগে জড়ো হন। দুপুর ১২টার দিকে তাঁদের মিছিলটি শাহবাগ থেকে জিগাতলা হয়ে আবারও শাহবাগে ফিরে প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করে জিগাতলার দিকে অগ্রসর হয়। অন্যদিকে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা রামদা, রড, হকিস্টিক, চেলা কাঠ নিয়ে ঢাকা কলেজ থেকে সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ের দিকে রওনা হন। সামনের সারির নেতারা মাথায় হেলমেট পরে এতে নেতৃত্ব দেন। ততক্ষণে জিগাতলায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়। আন্দোলনকারীরাও ছত্রভঙ্গ হয়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েন। হামলার শিকার সাংবাদিকেরা জানান, ছাত্রলীগের হেলমেট পরা দলটি সেদিন প্রথমেই সায়েন্স ল্যাবরেটরির মোড়ে অবস্থান নেন। এরপর মোড়ের পদচারী-সেতুর (ফুটওভারব্রিজ) ওপর থেকে যেসব ফটোসাংবাদিক ও সাংবাদিক ক্যামেরা বা মুঠোফোন দিয়ে ছবি তুলছিলেন, তাঁদের উদ্দেশে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে নামতে বাধ্য করেন। বেশ কয়েকজনকে তখনই বেধড়ক পেটানো হয়। এরপর ছাত্রলীগের কর্মীরা অন্তত পাঁচটি ভাগে ভাগ হয়ে পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। শুরু হয় বেধড়ক মারধর। হামলায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সিহাবুজ্জামান। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঘটনার পরপর ১০ আগস্ট তিনি প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘ওই দিন অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীদের নিয়ন্ত্রণ করতে আমরা মাঠে ছিলাম। তবে আমার সামনে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী বা সাংবাদিকদের মারধরের কোনো ঘটনা ঘটেনি।’ আর ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী গত রোববার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, সেদিন সিটি কলেজ এলাকায় তিনি ও সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি আন্দোলনকারীদের হামলার শিকার হয়েছিলেন। এ সময় তাঁদের কয়েকজন কর্মীও আটকা পড়েন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের কর্মীদের নিয়ে আটকা পড়া কর্মীদের উদ্ধার করেন। সাংবাদিক বা কোনো ছাত্রকে মারধরের ঘটনায় তাঁরা জড়িত নন বলে তিনি দাবি করেন। আলোকচিত্রীদের তোলা ছবিতে হামলাকারী ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের পাঁচজন যুগ্ম আহ্বায়কসহ অনেকের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাঁরা সবাই ছাত্রলীগের নেতা–কর্মী। হামলায় অংশ নেওয়া পাঁচ যুগ্ম আহ্বায়ক হলেন এস এম জোহা, ইমরুল হাসান ওরফে লেনিন, ফরহাদ মির্জা, মোনায়েম হোসেন ওরফে জেমস ও চিরঞ্জিত বিশ্বাস। এর মধ্যে মোনায়েম ও ফরহাদ হেলমেট পরা ছিলেন। ১২ আগস্ট এস এম জোহা প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘কলেজের অনেকে গিয়েছিল। আমিও গিয়েছিলাম। মারধরের কোনো ঘটনার সঙ্গে আমি জড়িত নই।’ আপনার অনুসারীরা তো সহিংস ছিল—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পাসে আমি একা নেতা না। অনেকের অনুসারী আছে। কারা করেছে আমি জানি না।’ হামলার সময় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী ঢাকা কলেজে ছিলেন। এ বিষয়ে ১৫ আগস্ট কলেজ শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক ইমরুল হাসান বলেছিলেন, ‘সাধারণ সম্পাদক সেদিন সাড়ে ১২টার দিকে কলেজে আসেন। তিনি আমাদের ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষের কক্ষে এসে বসেন।’ তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না ছাত্রলীগের কেউ সাংবাদিকদের মারধর করেছে। এরপরও কেউ যদি আমার কলেজের হয়ে থাকে, ছাত্রলীগের কোনো কর্মী হয়ে থাকে; আমি তাদের চিহ্নিত করে অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করব।’ সেদিন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষের কক্ষে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের অবস্থানের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ মোয়াজ্জম হোসেন মোল্লাহ গত ২৩ নভেম্বর প্রথম আলোকে বলেন, ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সেদিন তাঁর কক্ষে এসেছিলেন পরিচিত হতে এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করতে। কিছুক্ষণ অবস্থানের পর চা খেয়ে তিনি চলে যান। সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ের হামলা বা পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন না বলে দাবি করেন ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক ফরহাদ মির্জা। ১৫ আগস্ট তিনি প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘আমি ওই দিন কলেজের সামনে শান্তিপূর্ণ অবস্থান করেছিলাম। সেখানে কোনো ঘটনা ঘটেনি।’ আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক মোনায়েম হোসেনও ঘটনাস্থলে ছিলেন না বলে প্রথম আলোর কাছে দাবি করেছেন। আর চিরঞ্জিত বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

অন্যান্য সংবাদ