প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খ ম জাহাঙ্গীর বনাম গোলাম মাওলা রনি

মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু, স্টকহোম থেকে: দেশের পত্র পত্রিকা কিংবা টকশোগুলোতে গোলাম মওলা রনি একটি পরিচিত নাম। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই তার কোনো না কোনো বিষয়ের উপর লেখা চোখে পরে। এছাড়া টকশোগুলোতে তার উপস্থিতি সবসময় লক্ষণীয়। ব্যক্তিগতভাবে আমার সাথে তার কখনো দেখা হয়নি। তবে আওয়ামী লীগের এমপি থাকাকালীন তিনি একবার স্টকহোম সফরে আসেন। এইসময় তার সাথে অন্যান্য সংসদ সদস্যও ছিলেন। দশে ফিরে গিয়ে তার এই সফর সম্পর্কে একটি লেখা লিখতে গিয়ে বিএনপির জনৈক মহিলা সংসদ সদস্য নিয়ে কিছু রসিকতা করে লিখেছিলেন। শুনেছি স্টকহোমে অবস্থানকালে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা তার সাথে দেখা করেছেন ,ছবি তুলেছেন। ষ সেই ছবি আবার ফেসবুকে আপলোডও করেছেন। তবে আওয়ামী লীগের এমপি হলেও আমার কাছে তিনি ছিলেন একজন গুরুত্বহীন ব্যক্তি।

গোলাম মাওলা রনির নাম আমি প্রথমে শুনি যখন তিনি পটুয়াখালীর খেপুপাড়া এলাকা থেকে আওয়ামী লীগের টিকেটে এমপি নির্বাচিত হন। কারণ এই এলাকাটা আমার কাছে অনেক আগে থেকেই পরিচিত। আমার একসময়ের রাজনৈতিক বন্ধু ঢাকা ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক (১৯৭৩) স. ম জাহাঙ্গীরের মুখে আমি গলাচিপা খেপুপাড়ার কথা প্রথম শুনি। জাহাঙ্গীর এখন না ফেরার দেশে চলে গেছে। শুনেছি মৃত্যুর পূর্বে সে এই এলাকায় বঙ্গবন্ধু কলেজের উন্নয়নে কাজ করেছে।

তবে স. ম জাহাঙ্গীর না থাকলেও সেখানে আমার পরিচিত দ্বিতীয় ব্যক্তি আছেন। তিনি হলেন খ. ম জাহাঙ্গীর। যিনি একসময় ছাত্রলীগের সভাপতি ও পরবর্তিতে শেখ হাসিনার ৯৬ মন্ত্রী সভায় পাট প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তিতে ডক্টর ফখরুদ্দিন আহমেদের অস্থায়ী সরকারের সময় তাকে ষড়যন্ত্র করে সংস্কারপন্থীতে জড়িয়ে দূরের ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিলো। আর এই কারণেই হঠাৎ করে ভাগ্য খুলে যায় গোলাম মওলাা রনির। খ. ম. জাহাঙ্গীরের পরিবর্তে নমিনেশন দেয়া হয় আওয়ামী লীগে হঠাৎ করে উড়ে এসে জুড়ে বসা গোলাম মওলা রনিকে। সময়ের সাথে সাথে তার মুখোশ উন্মোচন হলে গত নির্বাচনে (২০১৩) দ্বিতীয়বারের মতো তাকে প্রার্থী না করে খ. ম জাহাঙ্গীরকে করা হয়।

গোলাম মওলা রনি আগে কোনদিন ছাত্রলীগ-যুবলীগ বা আওয়ামী লীগ করেছেন বলে আমার জানা নেই। ছাত্র অবস্থায় ছাত্রলীগ করলেও করতে পারেন। সত্যি সত্যি যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কোনো দল না করা সত্ত্বেও সেদিন ঠিকই তিনি আওয়ামী লীগের নির্বাচনী টিকেট যোগাড় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কী সৌভাগ্যবান ব্যক্তি তিনি। তার কৌশলের প্রশংসা না করে উপায় নেই। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে তিনি কৌশলে নিজের পক্ষে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। কারণ ২০০৮ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ খ. ম জাহাঙ্গীরকে নমিনেশন না দিয়ে দিয়েছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত গোলাম মওলা রনিকে নমিনেশন। রনি যেন হঠাৎ করে হাতে আসমানের চাঁদ পেলেন। হয়েও গেলেন পটুয়াখালীর গলাচিপা নির্বাচনী এলাকার নির্বাচিত এমপি। সম্পূর্ণ অপরিচিত এক ব্যক্তি রাতারাতি সারা দেশে পরিচিত হয়ে উঠলেন। এমন সৌভাগ্য কয়জনের হয়! কোনোদিন আওয়ামী লীগ কিংবা তার কোনো অঙ্গসংগঠনের সাথে জড়িত না হয়েও বাগিয়ে নিলেন আওয়ামী লীগের টিকেট।

কথায় বলে শাক দিয়ে কখনো মাছ ঢাকা যায় না। রনির বেলায়ও একসময় তাই হলো। টকশো ও পত্র পত্রিকার মাধ্যমে একসময় সামনে বেরিয়ে আসতে লাগলো তার আসল চেহারা। শেষ পর্যন্ত তাকে যেতে হলো জেলে। হারালেন তার এমপি পদ। কিন্তু তবুও তিনি থামবার মানুষ নন। এর পর খুব কৌশলে লেখালেখি ও টকশোর কাজ চালিয়ে যান। এর মাঝে তিনি শাহরিয়ার কবিরকে অসম্মান করে তার ফেসবুক একটি পোস্টও দিয়েছিলেন। যেটা বাঁশের কেল্লাসহ এই গোষ্ঠির মিথ্যাবাদীরা প্রচার করে। ওই পোস্টের সূত্র ধরে আমি গোলাম মওল্ ারনির ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্টগুলো পড়লা॥ সব কিছু দেখে আমাকে অবাক হতে হয়েছে। ভাবলাম আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা এধরনের চিন্তাধারার একজন ব্যক্তিকে কীভাবে আওয়ামী লীগ থেকে নমিনেশন দিলেন? টিভিতে গোলাম মওলা রনির লাগামহীন মিথ্যা আর ফেসবুকে লেখা দেখে মনে হয় তিনি কখনো আওয়ামী লীগের আদর্শের লোক ছিলেন না। তিনি সুযোগ বুঝে দলে ঢুকে পড়েছেন। সময় আসলে ভবিষ্যতে হয়তো তার আসল চেহারা উন্মুক্ত হতে পারে।

শুনেছি রনি এলাকায় জন্মসূত্রে স্থায়ী বাসিন্দা না হয়ে নাকি বিয়ের সূত্র ধরে এখানে বাস করতেন। অর্থাৎ তিনি ছিলেন এই এলাকার জামাই। বিবাহসূত্রে এই নির্বাচনী এলাকায় তার বসবাস। কিন্তু তাতে কী হয়েছে? তিনি তো জন্মসূত্রে বাংলাদেশেরই নাগরিক। বাংলাদেশের যে কোনো স্থান থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সকলেরই জন্মগত অধিকার। সুতরাং এখানে আপত্তি আসবেই বা কেন? কিন্তু এভাবে না দেখে, না জেনে শুনে তাকে সেদিন আওয়ামী লীগের নমিনেশন দেয়া কত ভুল ছিলো, তা এখন আওয়ামী লীগ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। তাহলে কি আওয়ামী লীগ এবার সেই একই ভুল করতে যাচ্ছে?

পটুয়াখালী-৩ আসনে এবার খ. ম জাহাঙ্গীরকে নমিনেশন না দিয়ে দেয়া হয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভাগ্নে ছাত্রলীগের সাবেক স্থানীয় নেতা এস এম শাহাজাদাকে। যার কারণেই বিরোধী দলগুলো থেকে আওয়ামী লীগ এখন সমালোচনার মুখে পড়েছে। নির্বাচন কমিশনকে এখন অনেকেই সন্দেহ করছে। আসছে নিরপেক্ষতার প্রশ্ন। আওয়ামী লীগ পুনরায় তাদের আপনজনকে চিনতে ভুল করছে। তা না হলে ছাত্রজীবন থেকে পরীক্ষিত ও পঁচাত্তরের পরবর্তীতে আন্ডারগ্রাউন্ডে ছাত্রলীগকে সুসংগঠিত করতে যিনি অগ্রগামী ভূমিকা রেখেছিলেন তাকে কেন পুনরায় প্রত্যাখ্যান করা হলো? বিষয়টি এলাকার মানুষের কাছে পরিষ্কার নয়। যেখানে উঠতে বসতে বিরোধী পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের সমালোচনা আসছে, সেখানে বার বার জয়ী হওয়া একজন যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভাগ্নেকে নমিনেশন দেয়া আওয়ামী লীগের জন্য ক্ষতি ছাড়া অন্য কিছু বয়ে আনবে না। কারণ এবার সেই গোলাম মওলা রনি বিএনপিতে যোগদান করে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে একই নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থী হয়েছেন।

গোলাম মওলা রনি ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নমিনেশন চেয়েছিলেন। না পেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী খ. ম জাহাঙ্গীরের বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে লড়াইয়ে নেমে হেরে যান। সারা জীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী খ. ম জাহাঙ্গীর সেবার নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হয়ে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। এই খ. ম জাহাঙ্গীরের সাথে আমার পরিচয় বাহাত্তর সাল থেকে। ১৯৭৪-৭৫ বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জেনারেল জিয়ার সামরিক আইনের আড়ালে ঢাকা শহরে যারা সেদিন ছাত্রলীগকে সংঘটিত করেছিলেন, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন খ. ম জাহাঙ্গীর। এই সময় আরো যারা সক্রিয় ছিলেন; তাদের মধ্যে ওবায়দুল কাদের, রবিউল আলম মুক্তাদির চৌধুরী, মমতাজ হোসেন, ইসমত কাদির গামা, মানিকগঞ্জ আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি গোলাম মহিউদ্দিন, কামাল আহমেদ মজুমদার, মুকুল বোস, চট্টগ্রামের এস এম ইউসুফসহ আরো অনেকে। ৭৫ সালের ৪ নভেম্বরের মৌন মিছিল থেকে শুরু করে ছাত্রলীগের সব কিছুতেই তাদের অবদান আওয়ামী লীগকে স্বীকার করতে হবে। কারণ ওই সময় ছিলো আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে দুর্দিন।

আবারো সেই দুঃসময়ের পরীক্ষিত নেতা খ. ম জাহাঙ্গীরকে পটুয়াখালীর খেপুপাড়ার প্রার্থী পদ থেকে বঞ্চিত করা হলো। জানি না তার দোষ কী? তবে আজকের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী ওয়াবায়দুল কাদেরের কাছে তিনি কোনো অপরিচিত ব্যক্তি নন। খ. ম জাহাঙ্গীরকে নমিনেশন না দিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভাগ্নেকে নমিনেশন দেয়া আদৌ যুক্তিসঙ্গত কি না, বিষয়টা আশা করি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড নুতন করে ভেবে দেখবে। সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব