প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

একজন মাওলা-গোলামের উজবুক প্রার্থনা!

অসীম সাহা : “হে মাওলা, হে মাবুদ, হে পরওয়ারদিগার, আমি তোমার গুনাহ্গার বান্দা। আমাকে তুমি ক্ষমা করো। আমি বুঝিতে পারি নাই, আমার যে-বাপ হাটে-ঘাটে-মাঠে টুকরো কাপড় বিক্রি করিয়া আমাকে বড় করিয়া তুলিয়াছেন, মানুষের মতো মানুষ করিবার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করিয়াছেন, তাঁহার জন্য আমি সময়মতো কিছুই করিতে পারি নাই। যেই সময় আব্বাকে ‘আব্বা’ বলিয়া ডাকিবো এবং আম্মাকে ‘আম্মা’, ঠিক তখনই বাংলাদেশের সবচেয়ে ধূর্ত একজন রাজনীতিক, শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনা আমাকে রাস্তা হইতে তুলিয়া আনিয়া এমন এক ঘেরাটোপে বন্দি করিলো যে, আমি সেখান হইতে বাহির হইতে পারিলাম না।

আমি শেখ মুজিবকে ‘আব্বা’ এবং শেখ হাসিনাকে ‘আপা’ ডাকিতে বাধ্য হইলাম। আমি অস্বীকার করিবো না, আমি তখন একটু বেশি লোভী হইয়া উঠিয়াছিলাম। সেই সময়েই শেখ হাসিনা আমাকে পটুয়াখালী হইতে এমপি বানাইয়া আনিয়া এমনই গ্যাঁড়াকলে ফেলিয়া দিলো যে, আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও পাঁচ বছর খুব দাপটের সঙ্গেই এমপিগিরি করিয়া, সংসদে ওয়াজ-নসিহত করিয়া, পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করিয়া এবং বৃহত্তর বরিশালের আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গে প্রমিত ভাষার মিশ্রণ ঘটাইয়া একটি নতুন ধরনের ‘জগা’ভাষায় টিভিতে নিয়মিত টক-শো করিয়া বেশ সুনাম কামাইলাম। আপনাকে চুপি চুপি ইহাও বলিয়া রাখি, এই সুযোগে আমি একটি মাস্তানবাহিনী গড়িয়া তুলিয়া বৃহত্তর পটুয়াখালী, বরিশাল ও ঢাকায় প্রভূত সম্পত্তির মালিক বনিয়া গেলাম। আমি তখন আওয়ামী লীগের এমপি ছিলাম।

তাই কাহাকেও মানি নাই। কিন্তু বিশ্বাস করুন মালিক, আমি মনেপ্রাণে ইহা চাহি নাই। আমি মানুষ হইতে চাহিয়াছিলাম। কিন্তু শেখ হাসিনার কৌশলের কাছে পরাভূত হইয়া আমি ভুলপথে না সঠিক পথে পরিচালিত হইতেছি, ইহাও বেমালুম ভুলিয়া গিয়াছিলাম। যখন বোধোদয় হইলো, তখন দেরি হইয়া গিয়াছে। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন আমার দিব্যচক্ষু খুলিয়া দিলো। একটি ভোটারবিহীন নির্বাচনকে আমার জন্য আশীর্বাদ মনে করিয়া সুযোগের অপেক্ষায় থাকিলাম। আমি জানিতাম ও বুঝিতাম আমার ‘প্রকৃত পিতামাতা’ কে? কিন্তু মনের দুঃখ কাহাকেও বলিতে পারি নাই। তবু আমি অপেক্ষা করিয়াছি। অকৃতজ্ঞ হই নাই। ভাবিয়াছিলাম, শেখ হাসিনা গুণীর কদর করিবে।

কিন্তু এইবারো শেষপর্যন্ত তিনি স্বরূপে প্রকাশিত হইয়া আমার মতো পরহেজগার বান্দার হক কাড়িয়া লইয়া আমাকে মনোনয়নবঞ্চিত করিলেন! আমি তবু স্বতন্ত্র দাঁড়াইয়া শেষপর্যন্ত তাহার শুভবুদ্ধির উদয় হইবে ভাবিয়া অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। স্বতন্ত্র পদে দাঁড়াইবার জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করিলাম। কিন্তু অবশেষে সিদ্ধান্ত বদলাইতে বাধ্য হইলাম। ভাবিলাম, আমার এতো কী দায় পড়িয়াছে যে, আমিই শুধু স্যাক্রিফাইস করিতে থাকিবো? এতোদিন ধরিয়া তাহার প্রতি প্রাথমিক কৃতজ্ঞতাবশত আমি বেঈমানি করি নাই। বরং নিজের আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়া যিনি আমার পিতা নহেন, যিনি আমার আপা নহেন, তাহাদের তাই বলিয়া সম্বোধন করিয়াছি। বিবেকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করিয়া না পারিয়া আমি আমার প্রকৃত পিতামাতা স্বাধীনতার ঘোষক, গণতন্ত্রের সিপাহশালার শহিদ জিয়া ও আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কোলে ফিরিয়া আসিয়াছি। আমার প্রকৃত পিতার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপিতে যোগ দিয়া আমার পুরানো সকল পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিবার জন্য আমি তাহাদের কাছ হইতে মনোনয়নপত্রও সংগ্রহ করিয়াছি। আমি এখন ভারমুক্ত। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরিয়া আসিয়াছে।

ইহার চাইতে আনন্দদায়ক সংবাদ আর কী হইতে পারে? হ্যাঁ, প্রভু, আপনি প্রশ্ন করিতেই পারেন, এতোদিন ধরিয়া জিয়া ও খালেদা জিয়ার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করিয়া এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে এমনকি খুন করিবার হুমকি দিয়াও আমি বহাল তবিয়তে থাকিয়াছি। এখন সেই দলের মহাসচিবের হাত হইতে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করিতে আমার খারাপ লাগিতেছে না? কেন খারাপ লাগিবে দয়াময়? এতোদিন আমি যাহা করিয়াছি, তাহা তো নিজ ইচ্ছাতে করি নাই। শেখ মুজিবের কন্যা, স্বৈরাচারী নেত্রী, গণতন্ত্রহত্যাকারী শেখ হাসিনার উস্কানিতে করিয়াছি! তাই ইহাতে আমার কোনো দায় নাই। আমি আমার বিবেকের কাছে পরিষ্কার মাবুদ। এতোদিন আমি নাদান ছিলাম।

এখন সাবালক হইয়াছি। তাই মুখব্যাদান করিতে শিখিয়াছি। অজ্ঞাতে ভুল করিয়া থাকিলে, আপনি দয়ালু, আপনি আপনার এই বান্দার গুস্তাকি মাফ করিবেন; এই গুনাহ্গারের ক্রন্দন শুনিয়া তাহার সব দোষত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখিয়া তাহার ইহকাল ও পরকালের শাস্তি মওকুফ করিয়া দিয়া নিজের কোলে আশ্রয় দিবেন। কিন্তু তাহার আগে আপনার কাছে আমার একটাই আকুল আবেদন, আমার প্রকৃত পিতা-মাতা শহিদ জিয়া এবং তার দুখিনি গৃহিণী দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সেবা করিবার সর্বশেষ সুযোগটি অন্তত প্রদান করিবেন। হে রাব্বুল আল-আমিন, আমি আপনার করুণাভিখারি। আমাকে এইটুকু ভিক্ষা কবুল করুন। আমিন!” লেখক : কবি ও সংযুক্ত সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ