প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

একজন হিজড়া এবং একটি বিষন্ন বিকাল

সুফিয়ান রায়হান : হালকা ঠান্ডা হাওয়া বইছিলো, বিকেলবেলা একবুক অক্সিজেন এর আশায় বসে আছি রমনাপার্কে ঠিক তখনি টাকা গুনতে গুনতে এক হিজড়া আমার সামনে হাজির।’আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া কেমন আছেন?’ হিজড়ার এমন সম্বোধনে আমি অবাক, ভীত ও কিঞ্চিত। না জানি কোন মতলব, না তেমন কিছু নয়, কুশল বিনিময় করে চলে গেলো। আর বলে গেলো তার মন ভালো নেই।

রীতিমত চিন্তায় পড়ে গেলাম, অবশ্য তার মন খারাপের কারণ আমি জানি, সেটা বলবো আগে জেনে নিই হিজড়া মানে কী? হিজড়া শব্দটি উর্দু হলেও উৎপত্তিগত ভাবে সিমেটিক এরাবীয়। “হিজর” বা যাকে আমরা হিজরত বলি সেটা থেকেই হিজড়া শব্দের উৎপত্তি। এই হিজর এর অর্থ নিজ গোত্র ত্যাগকারী।

পরিবার এদের তাড়িয়ে দেয় বলে এদের হিজড়া বলা হয়। ইংরেজিতে Eunuch বাHermaphrodite ঐGender Dzsphoria বলে একে। হিজড়া হল একটা অদ্ভুত মানসিক সমস্যার রোগী। এই রোগের নাম Gender Identitz Disorder (GID) ।

এর জন্য আমাদের আগে  Transgender কথাটি বুঝতে হবে। Transgender রা এমন মানুষ যারা মানসিক দিক থেকে নিজেদের যা ভাবে শারীরিক দিক থেকে ঠিক তাঁর বিপরীত হয়। অর্থাৎ, কেউ যদি ছেলে হয় তারা ভাবে যে আসলে তারা মেয়ে এবং যারা মেয়ে হয় আসলে, তারা ভাবে যে তারা ছেলে। এরাও কিন্তু একধরনের ইন্টারসেক্স। তবে ইন্টারসেক্সরা নিজেদের লিঙ্গ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে আর ট্রান্সজেন্ডাররা সন্তুষ্ট থাকেনা। তারা তাদের লিঙ্গ নিয়ে খুবই অস্বস্তি বোধ করে। ট্রান্সজেন্ডারদের এই মানসিক সমস্যার নাম  Gender Dzsphoria। অনেক ট্রান্সজেন্ডার নিজেদের ছেলেও মনে করে মেয়েও মনে করে। এদের Bigender বলে।

আবার অনেকে নিজেদের কোন লিঙ্গই ভাবেনা যাদের অমবহফবৎ বলে। ট্রান্সজেন্ডাররা নিজেকে বিপরীত লিঙ্গ ভেবে ছেলেরা মেয়েদের পোশাক আর মেয়েরা ছেলেদের পোশাক পরে থাকে যাদের Agender বলে। এগুলা সবাই ট্রান্সজেন্ডারের অন্তর্ভুক্ত। তবে আসল হিজড়া হল যারা ছেলে হিসেবে জন্ম নেয় কিন্তু নিজেদের মেয়ে মনে করে।

গত এপ্রিল ২০১৭ তে আন্তর্জাতিক মানসিক রোগ সংস্থা অনুসারে এই মানসিক সমস্যাটা Cross Dresser এর অন্তর্গত করা হয়। আবার আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন এই Dual Role Transvestism কে সরাসরি মানসিক সমস্যা মনে করেনা।

হিজড়া সম্প্রদায়ের অন্যতম নেত্রী অনন্যা বনিক বলেন, “আমি যখন বড় হচ্ছিলাম আমার পুরুষের পোশাক পরতে ভালো লাগতো না।Gender Dzsphoria আমার বড় দুটো বোন ছিল আমি প্রায়ই ওদের ফ্রক পরতাম।’

’ “আমার পাশের বাসার কাকিমা বলতো তুইতো আসলে পোলা না মাইয়াও না। তাহলে তুই মনে হয় খোজা। তুই তো হিজড়া। আমি তখন আমার মাকে প্রশ্ন করেছিলাম আসলেই কি আমি হিজড়া? আমার মা তখন কোন উত্তর দিতে পারেননি।

” “আমার দাদারা আমাকে নিয়মিত মারধোর করতো, কেন আমি মেয়েদের মতো সেজে থাকি। আমাকে জোর করে মাঠে খেলতে নিয়ে যেতো, সাইকেল চালানো শেখানোর চেষ্টা করতো। যাতে আমি পুরুষের মতো হয়ে উঠি”। “গৌতম হিসেবে ওরা আমাকে পুরুষ তৈরি করতে চেয়েছে কিন্তু আমিতো পুরুষ না। শাস্তি হিসেবে আমাকে সাইকেলের চেইন দিয়ে পায়ে বেড়ি বানিয়ে তালা দিয়ে রাখা হতো। শুধু বাথরুম পর্যন্ত যেতে পারতাম।”

কিন্তু মায়ের সাহায্য নিয়ে এই শিকল ছিঁড়ে একদিন বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে আসি। হয়ে উঠলাম অনন্যা বনিক। “যখন আমি বুঝলাম এই পরিবার আমার জন্য না, যে গলিটাতে আমি বড় হয়েছি, যে গলির কাকিমা হিজড়া খেতাব আমার মাথায় চাপিয়ে দিয়েছেন, সেই গলির সমাজটা আমার জন্য না। আমি সেই সমাজকে, সেই পরিবারকে মুক্তি দিয়ে আমার কমিউনিটিতে চলে এসেছি।

” এভাবে বেঁচে আছে হাজারো হিজড়া, তবে হিজড়া শব্দটি শুনে বিরক্ত হননি এমন মানুষের সংখ্যা নেই বললেই চলে, হ্যাঁ বিরক্ত উৎপাদনে তারা পিছিয়ে নেই বলেই এমন বিরক্তি আমাদের। তারাও তর্কে কম যান না, কাজ নেই, কেউ কাজ দেয়না, জীবিকার তাগিদে অপ্রীতিকর কাজে জড়িয়ে পড়ে তারা।

তবুও এখন সরকারী বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে কর্মসংস্থান এর ব্যবস্থা করা হচ্ছে যা আমাদের আশার আলো দেখাচ্ছে। হিজড়াদের অসম্মান করলে তারা বেশি রেগে যায় আর আমরা সেটাই করি বেশী। তাদের কে শত্রু না ভেবে পাশে দাঁড়ানো দরকার। তাদের মন খারাপের কারণ যেন আমি না হই সেদিকে নজর রাখতে হবে। আমার মত একটি বিষন্ন বিকেল যেন কারো আর না কাটে। সম্পাদনা : জেকী

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ