প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নন-পলিটিক্যালি পলিটিক্যাল

ফরিদ কবির, ফেসবুক থেকে: ১৯৯১ সাল। তখন আমি দৈনিক আজকের কাগজে। এরশাদ সরকারের পতনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনের প্রথম নির্বাচন। সারা দেশেই চরম উত্তেজনা। নির্বাচনের বিশ-পঁচিশদিন আগে আজকের কাগজের জেলা প্রতিনিধিদের জরিপের ওপর ভিত্তি করে মনোনয়ন পাওয়া নেতাদের মধ্যে কাদের জনপ্রিয়তা বেশি, কারা সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থী তা নিয়ে একটা রিপোর্ট ছাপা হলো। যতোদূর মনে পড়ে, সেই জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২২৯টি আসনে বিজয়ী হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছিলো!

আমার মনে আছে, তখন অনেকেই সেই রিপোর্টটিকে যথেষ্ট অথেনটিক মনে করেছিলেন! আমাদের পত্রিকার অনেক সাংবাদিকই সেই জরিপের ফল বিশ্বাস করেছিলেন। পাঠকরাও। কিন্তু এ ধরনের জরিপ নিয়ে আমার বরাবরই সংশয় আছে। সেবার একই আসনে দাঁড়িয়েছিলেন শেখ হাসিনা ও সাদেক হোসেন খোকা। খোকা রাজনীতিতে তখন তেমন কোনো পরিচিত মুখ নন। কাজেই আমাদের পলিটিক্যাল বিটের রিপোর্টাররা সহজ সমীকরণই করেছিলেন! তারা সেই আসনে শেখ হাসিনাকেই সম্ভাব্য বিজয়ী মনে করেছিলেন!

দেশের অন্য প্রান্তেও রিপোর্টাররা মিডিয়ায় পরিচিত প্রার্থীদেরকেই সম্ভাব্য বিজয়ী মনে করেছিলেন! কিন্তু মিডিয়ায় পরিচিত হলেই যে তিনি এলাকায় জনপ্রিয় হবেন, লোকে তাকে ভোট দেবে, তা নয়। মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই ভোট দেয় মার্কা দেখে। কখনো সখনো লোক বুঝে।

যেমন, হাসানুল হক ইনু বা রাশেদ খান মেনন মিডিয়ার কল্যাণে খুবই পরিচিত নাম। কিন্তু তারা নৌকায় চড়ার আগে কখনোই তেমন ভোট পাননি! ৯১ সালে নির্বাচনের ফলাফলের অনেকটাই আমরা কাগজ অফিসে বসেই পাচ্ছিলাম! প্রায় সব জায়গাতেই গনেশ উল্টে যাচ্ছিলো!

আপনারা সকলেই জানেন, অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষককে হতবাক করে দিয়ে সেবার বিএনপিই সর্বাধিক আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছিলো। আমি যদি ভুল না করে থাকি তবে, ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময়ও তেমন একটা জরিপ করেছিলো প্রথম আলো। তাতে বিএনপিই আওয়ামী লীগের চাইতে বেশি জনপ্রিয় বলে তারা জানিয়েছিলো! কিন্তু সেবার তাদের জরিপের ফলাফলও মিথ্যে প্রমাণ করে আওয়ামী লীগই সরকার গঠন করে।

এ ধরনের জরিপ থেকে এটাই স্পষ্ট হয়, আমাদের সাংবাদিকরা এখনো সাধারণ মানুষের মনস্তত্ব বুঝতে অক্ষম। শুধু সাংবাদিকদের কথাই বলছি কেন, শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান মানুষরাও সাধারণ মানুষের ভোটের মনস্তত্ব বুঝতে পারেন না। ফলে তারা যাকে হেভিওয়েট প্রার্থী মনে করেন, কার্যত দেখা যায়, জয় পান কোনো লাইটওয়েট প্রার্থী! মিডিয়া ও সামাজিক কারণে কাউকে কাউকে হেভি দেখালেও এলাকায় তাদের অনেকেরই ইমেজ ততোটা হেভি নয়।

সবচাইতে বড় সমস্যা, আমাদের জনগণের চরিত্র! তারা কখন কাকে ভোট দেবে তা আন্দাজ করা কঠিন। তাছাড়া, তারা একই দলকে কেন জানি দুবার ক্ষমতায় দেখতেই চায় না! কোনো দল ভালো করলেও দেখা গেছে পরের নির্বাচনে অন্য দলকে তারা পছন্দ করেছে। অন্তত গত নির্বাচনগুলিতে তেমনই দেখা গেছে। এটা একটা রহস্যই বটে।

কোনো দল যথেষ্ট উন্নয়নমূলক কাজ করলেও জনগণ কেন একটা দলকে দ্বিতীয়বার দেখতে চায় না, সেটা নিয়ে একটা গবেষণা হওয়া দরকার। গতবার বিএনপি নির্বাচনে না আসায় জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয়টা তেমন বোঝা যায়নি।

এবারের নির্বাচন শেষ হলে হয়তো বোঝা যাবে, জনগণের মনস্তত্ব একই রকম আছে, নাকি বদলেছে।

ততোদিন অপেক্ষা করাই ভালো। গত এক দশকে নতুন ভোটার হিসেবে যারা আবির্ভূত হয়েছে, এবারের নির্বাচনী ফলাফলে তাদের ভূমিকাই বেশি থাকার সম্ভাবনা। তাদের মনস্তত্ব না বুঝে কোনো রকম জরিপ-টরিপ করতে যাওয়া কাগজগুলোর অন্তত ঠিক হবে বলে মনে হয় না।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ