প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাংলাদেশ নিয়ে কলকাতার ভাবনা !

ডি সাইফ  কলকাতা : আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলিকাতা আমাদের নিকট আপন ভীষণ। কারণ এখানেও বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বাস করেন। দুই বাংলার সাংস্কৃতিক অনেক মিল আছে,  তবে খানিকটা অমিলও আছে। আমরা যেমন কলকাতা শহরের প্রাচীনতায় মুগ্ধ হই, তাদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিভিন্ন ধরণের বিচার বিশ্লেষণ করি, কলকাতা শহরের ঐতিহ্য নিয়ে কথা বলি, কলকাতার বাংলা সাহিত্যিকদের বই পড়ি, কলকাতার ভাল সিনেমা নিয়ে কথা বলি, তাদের সুন্দর বাংলা গান হেডফোনে বাজাই ঠিক একই ভাবে আমাদের জানতে ইচ্ছে হয় কলকাতার মানুষরা কি ভাবে এই বাংলাদেশ নিয়ে।

যদিও এটা ঠিক যে, যেকোনো শিক্ষিত, রুচিশীল মানুষ দুই বাংলার মানুষের প্রতিই শ্রদ্ধাশীল। কলকাতার মোটামুটি প্রসিদ্ধ সব ব্যাক্তিত্বকেই বাংলাদেশ প্রীতি দেখাতে দেখেছি৷ কয়দিন আগে লিট ফেস্টে এসেও কলকাতার সাহিত্যিক শীর্ষন্দু মুখোপাধ্যায় বাংলাদেশের মানুষের বাংলা ভাষা প্রেমের প্রশংসা করেছেন। তার মতে, ওপার বাংলার তুলনায় এই পাশে বাংলার চর্চাটা বেশি হচ্ছে। যাইহোক, এরকম অনেকেই বাংলাদেশের মাটি, মিষ্টি ভাষা, কালচারের দিলখোলা প্রশংসা করেন। মীরাক্কেল নামক একটা শো হতো ভারতীয় এক টিভি চ্যানেলে। সেখানে বাংলাদেশি প্রতিযোগীরা যখন অসম্ভব ভাল পারফরমেন্স করত তখন উপস্থাপক মীর খোদার কাছে শুকরিয়া জানাতেন বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্যে, কারণ তিনি আপ্লুত বাংলাদেশের মাটি থেকে ওমন প্রতিভাবান পারফর্মারদের জন্ম হয় বলে!

সাধারণ মানুষ বাংলাদেশ সম্পর্কে কতটা ইতিবাচক ধারণা রাখেন, সেটার আরো ভাল উদাহরণ পাওয়া যাবে ইউটিউবে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক ভিডিওতে। সেই ভিডিওতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বক্তব্য পাওয়া যায়। তারা ভিডিওতে, বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের ভাবনা, ভালবাসার কথা জানিয়েছেন।

প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশের নাম শুনলে প্রথমে মাথায় কি ঘুরে? উত্তর এসেছে হুমায়ূন আহমেদ, নদী, মাছ, বাংলা ভাষা, পদ্মার ইলিশ! একজন তো বলেই ফেলেছেন বাংলাদেশ মানে, একটা আবেগ আর ভালবাসা! এছাড়া আর কি কি বলেছেন তারা?

সারেগামাপায় অংশ নেয়া নোবেল এবং অবন্তী সিঁথির এক ভক্ত ভালবাসা জানিয়েছেন তাদের। বাংলাদেশের কোন জনপ্রিয় ব্যাক্তিত্বকে তারা পছন্দ করেন (ক্রিকেটার বাদে) এমন প্রশ্নের উত্তরে হুমায়ূন আহমেদ, তসলিমা নাসরিন, জয়া আহসান, জেমস, আইয়ুব বাচ্চু, ফেরদৌস এই নামগুলো এসেছে।

বাংলাদেশের খাবার দাবার তাদের ভীষণ পছন্দ। বিশেষ করে, আমাদের জাতীয় মাছ ইলিশের প্রশংসা করেছেন। পদ্মার ইলিশের স্বাদে তারা মুগ্ধ। বাংলাদেশের মানুষের আন্তরিকতা, আতিথেয়তাও তারা খুব ভালবাসেন।

বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেল কলকাতায় দেখানো হয় না বলে আফসোস আছে তাদের। এর পেছনে নোংরা রাজনীতি কাজ করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন। ওপার বাংলার সংস্কৃতি যেমন বাংলাদেশের মানুষ তাদের চ্যানেলের বদৌলতে জানতে পারছে, আমাদের দেশের সংস্কৃতিও তারা জানতে চায়। অন্তত, কলকাতার সাধারণ মানুষের মধ্যে সেই আগ্রহ আছে। তারা এই রাজনৈতিক বৈষম্যটা পছন্দ করেন না।

সু্যোগ পেলে তারা বাংলাদেশের কোন জায়গাগুলোতে ভ্রমণ করতে চান? এক্ষেত্রে আশ্চর্যজনকভাবে তাদের পছন্দ ঢাকা শহর। এই জাদুর শহরের মায়া তাদেরকেও প্রলুব্ধ করেছে কিভাবে ভাবার বিষয়। যাই হোক, কলকাতার অনেকের পূর্বপুরুষদের ভিটেমাটি ছিল একসময় বাংলাদেশে। তারা নিজেদের ভিটেবাড়িতে আসার ইচ্ছে পোষণ করেন। দুইদিন আগে একটা ভাইরাল হওয়া ছবি দেখেছি, ওপার বাংলার শিল্পী নচিকেতা বাংলাদেশে নিজেদের আদি নিবাসে গিয়ে হাউমাউ করে কাঁদছেন এমন একটা ছবি। কেউ কেউ যেতে চান কক্সবাজার সি বিচে। ময়মনসিংহে আসতে চান কেউ। চট্টগ্রামের কথাও এসেছে।

বাংলা ভাষার কথা বার বার বলেছেন তারা। এই ভাষাটিকে তারা ভীষণ কদর করছেন। ভাষার আঞ্চলিক বৈচিত্র্যতা, মিষ্টতা তাদের মুগ্ধ করে। বাংলাদেশিরা যেভাবে বাংলা ভাষা বলে এটাকে তাদের কাছে শ্রুতিমধুর মনে হয়, এই ভাষা শুনে তাদের প্রাণ জুড়ায়। একজন বলেছেন, কলকাতায় বাংলা ভাষা বিলুপ্তির পথে, এই ভাষাটাকে যেন আমরা তাই বাঁচিয়ে রাখি। অনেকটা একই রকম কথা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ও বলেছিলেন কিছুদিন আগে!

কলকাতার মানুষের ভাবনা শুনে বেশ গর্বই হচ্ছে বাংলাদেশ নিয়ে। বিশেষ করে আমার দেশের ভাষা, নদী, হাওয়া, জলকে তারাও আসলে বুঝতে পারেন, বোঝার চেষ্টা করেন দেখে স্নিগ্ধ একটা অনুভূতি হচ্ছে। বাংলাদেশি হিসেবে মনে হলো, দায়িত্ব একটু হলেও বেড়ে গেছে। দেশটাকে ভাল রাখার দায়িত্ব, সেটা নিজের পরিধি থেকেই সম্ভব। খুব ছোট ছোট অভ্যাসেই দেশের প্রতি দায়িত্ব পালন করা যায়। যেমন- দুই চারটা ইংরেজি শব্দ মিশিয়ে না বলে সম্পূর্ণ বাংলায় যদি কথা বলি সেটাও একটা দেশপ্রেম। নদী, সমুদ্র ভ্রমণে গিয়ে ময়লা আবর্জনা ফেলে যদি এগুলো নোংরা না করি এগুলোও একটা দেশপ্রেম। অপ্রয়োজনীয় পাশ্চাত্য সংস্কৃতি না অনুকরণ করে, নিজেদের সংস্কৃতিকে ভালবাসাও দেশপ্রেম। কারণ, নিজেদের বাঙ্গালি স্বত্তাটাই দিনশেষে আমাদের পরিচয়।

আমরা অনেক সময় কলকাতার লোকেদের সম্পর্কে দুই একটা নেতিবাচক মন্তব্য করি, তারা হিসেবী এই ব্যাপারটাকে বাজে ভাবে উপস্থাপন করি। কিন্তু, কলকাতার মানুষরা, বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরা বেশ উদার কণ্ঠেই বাংলাদেশের প্রশংসা করলো! দুই বাংলার সেতুবন্ধনে আমাদের সবার এমন উদার হওয়াই উচিত! ধন্যবাদ কলকাতা, বাংলাদেশি হিসেবে আরো একবার গর্বিত হবার অনুভূতি দেয়ার জন্যে… সূত্র :

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ