প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জার্সিবদল ও ক্ষমতালিপ্সা সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাদেরই!

চিররঞ্জন সরকার : ফুটবল-ক্রিকেটে যেমন দলবদলের মৌসুম থাকে, আমাদের দেশের রাজনীতিতে এখন চলছে দলবদলের মৌসুম। জাতীয় নির্বাচনের সময় এই ঘটনাটি খুব বেশি ঘটে। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চলছে দলবদল, জার্সিবদল, আদর্শ বদল, ঘর বদল, ঘোড়া বদল। লোভ-লাভ আর ক্ষমতালিপ্সার জন্য বিপরীত মত ও আদর্শের দলকে আঁকড়ে ধরছেন অনেকেই। দীর্ঘদিন যে দলের রাজনীতি করেছেন, যে দলের হয়ে বড় বড় কথা বলেছেন, প্রতিপক্ষ দল সম্পর্কে অত্যন্ত কটু কথা বলেছেন, সেই দলে এমপি পদে মনোনয়ন না পেয়ে বা সম্ভাবনা না দেখে যোগ দিচ্ছেন বিপরীত আদর্শের দলে। সারাজীবন যিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা বলেছেন, নীতিনৈতিকতা নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন, সেই ড. কামাল হোসেন জোট বেঁধেছেন স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবিরের একান্ত সহচর ও মিত্র বিএনপির সঙ্গে। যে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব দুর্নীতি ও গ্রেনেড হামলার দায়ে আদালতের রায়ে দ-িত, যে দল এখনও সেই নেতৃত্বকেই বন্দনা করে চলেছে, সেই দলের ধানের শীষ প্রতীকে ড. কামাল হোসেন আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণের অভিলাষ ব্যক্ত করেছেন। একই পথের পথিক হিসেবে আছেন মাহমুদুর রহমান মান্না, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, আ স ম আবদুর রব, কাদের সিদ্দিকী প্রমুখ। সম্প্রতি মনোনয়ন না পেয়ে এই দলে যোগ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী আবু সাইয়িদ। ‘পিতার আদর্শ’ বাস্তবায়নের শপথ নিয়ে এই দলে আরও যোগ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার পুত্র রেজা কিবরিয়া। তারা প্রত্যেকেই ধানের শীষ মার্কা নিয়ে নির্বাচন করে ‘রাজনৈতিক আদর্শ’ কায়েম করবেন!

বিএনপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ডা. বি. চৌধুরী, যিনি সারাজীবন আওয়ামী বিরোধী রাজনীতি করে জীবন সায়াহ্নে উপনীত হয়েছেন, তিনি জোট বেঁধেছেন ‘চিরশত্রু’ আওয়ামী লীগের সঙ্গে। তিনিও নাকি নৌকা নিয়ে নির্বাচন করবেন। বিএনপির অপর এক নেতা শমসের মবিন চৌধুরীও বিকল্প ধারায় যোগ দিয়ে নৌকায় উঠার অপেক্ষায় আছেন।

ওদিকে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি গোলাম মাওলা রনি দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। তিনি ধানের শীষে নির্বাচন করার জন্য মনোনয়নও পেয়েছেন। বনিবনা না হলে, পদ-পদবি না পেলে, মনোনয়ন বঞ্চিত হলে রাতারাতি দল-আদর্শ ত্যাগ করে ভিন্ন দলে যোগ দেওয়ার ঘটনা খুবই খারাপ দৃষ্টান্ত। মহৎ কিছুর জন্য মানুষ ভিন্ন দলে যোগ দিতে পারে। কিন্তু কেবল এমপি হওয়ার জন্য, ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার জন্য যদি কেউ রাতারাতি দল-আদর্শ-সাইনবোর্ড-কাপড়-চোপড়-বুলি সব বদলে ফেলে-তাহলে সেটা খুবই নিকৃষ্ট কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।

অনেকেই বলেন, যেকোনো রাজনৈতিক দলে রাজনীতিসংশ্লিষ্টদের যোগ দেওয়ার অধিকার আছে। এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। এটা ব্যক্তির অভিরুচি বা পছন্দও বটে। যেখানে মানুষ জীবনসঙ্গী পর্যন্ত বদল করেন, সেখানে রাজনৈতিক দল তো তুচ্ছ। তাছাড়া আমাদের দেশে আদর্শের রাজনীতি বলে এখন আর কিছু নেই। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে সামরিক শাসন যেভাবে দেশের রাজনীতিকে দূষিত করেছে, তা থেকে বেরিয়ে আসা আর সম্ভব হয়নি। ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’ প্রবর্তনের নামে রাজনৈতিক দল থেকে নেতাকর্মী ভাগিয়ে নেওয়া কিংবা বেচাকেনার প্রবণতা শুরু হয়েছিলো তখনই। ফলে গেল শতকের সাতের দশকের শেষার্ধে যারা অন্য দল থেকে এসে ওই সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন, তাদের অনেককেই আশির দশকের মাঝামাঝিতে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্বে দেখা গেছে। আবার নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনে সরকার পতনের পর নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের মন্ত্রিসভায়ও এরশাদ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অনেক সদস্যকে দেখা গেছে। অর্থাৎ নৈতিকতাবর্জিত একটি রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে অনেক আগে থেকেই।

সম্প্রতি আমরা সেই প্রবণতারই ধারাবাহিকতা লক্ষ করছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো লাভ-লোভ-ক্ষমতালিপ্সাই কি একজন নেতার বৈশিষ্ট্য হতে পারে? এমন বৈশিষ্ট্য নিয়ে তারা কীভাবে ‘এলাকাবাসী’ কিংবা ‘দেশ ও দশের সেবা করা’র কথা উচ্চারণ করেন? ‘সেবা’ করতে হলে কি দল বদল করে হলেও এমপি হতে হবে? এমপি না হলে, পদ-পদবি না পেলে কি ‘সেবা’ করা যায় না?

লোভ আর ক্ষমতালিপ্সা ছোট দুটি শব্দ। কিন্তু এই শব্দ দুটির আবেদন অত্যন্ত ব্যাপক। আমাদের দেশের এই বিশেষ শ্রেণির মানুষেরা লোভের বশবর্তী হয়ে সামান্য একটু পদ-পদবি-ক্ষমতার জন্য নীতি-আদর্শ-আত্মসম্মান, মান-মর্যাদা এমনকি ইজ্জত পর্যন্ত বিসর্জন দিচ্ছেন। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, যাদের আমরা মান্য করি, শিক্ষিত, সচেতন, ভদ্র বলে জানি, যারা জীবনে যথেষ্ট প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেই সব ‘অসাধারণ’ব্যক্তিরাই এমন পদ-পদবি-ক্ষমতার জন্য লালায়িত হচ্ছেন বেশি। এজন্য তারা রাতারাতি বদলে যাচ্ছেন। উল্টোসুরে কথা বলছেন। কিন্তু নিজের আচরণের জন্য একটুও অনুতপ্ত কিংবা লজ্জিত হচ্ছেন না।

এদেরই কি আমরা আগামী দিনে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করব? প্রশ্নটা এখন আমাদের নিজেকেই করতে শিখতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ