প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শাহরুখ খানকে খোলা চিঠি…সখী, ভাবনা কাহারে বলে…!

শিশিরকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় : শ্রীমান শাহরুখ, মিডিয়াসূত্রে জানলাম কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে আপনি অভিযোগ করেছেন, ২৭ বছর অভিনয় করার পরেও আপনাকে বুদ্ধিজীবীর স্বীকৃতি দেয়া হয়নি, শুধু ‘নাচাগানার’ শিল্পী হিসেবেই আপনাকে নিমন্ত্রণ করা হয়।
তখন কানে এয়ার ফোনে বাজছিলো। স্ত্রীর কণ্ঠে প্রিয় গান, ‘সখী, ভাবনা কাহারে বলে…’। শাহরুখ, আপনি আমার স্ত্রীর প্রিয় অভিনেতা। বলতো, ‘পেটে বিদ্যে আছে, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়র। গাবলু-গুবলু চেহারার না হলে হিরো হওয়া যাবে নাÑএই কনসেপ্টটাই ভেঙে দিলো। দেখবে, ওর হাত ধরেই সাধারণ চেহারার কিন্তু ট্যালেন্টেড ছেলেমেয়েরা বলিউড কাঁপাবে’।
ভাই শাহরুখ, আমার স্ত্রী কলকাতা আর বম্বে-দিল্লি-মাদ্রাসের সব বড় মঞ্চে অভিনয় করেছেন, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত আর মৃণাল সেন বহুবার ডেকেছেন, নাটক আর মেয়ের পড়ার ক্ষতি হবে বলে রাজি হননি। তিনি অভিনয় বুঝতেন, তার এই সার্টিফিকেট আপনার বড় পাওনা। কিন্তু বাজারে আমার প্রচুর ছাপানো লেখা থাকলেও আর অন্নদাশঙ্করের প্রশংসা সত্ত্বেও তিনি নিজের স্বামীকে বুদ্ধিজীবীর স্বীকৃতি দেননি, আপনাকেও না!
বুদ্ধিজীবী মানে বুদ্ধির ব্যবহার নয়, বুদ্ধি বিক্রি করে বা ব্যবহার করে পেটের ভাত জোগাড় করা নয়। বুদ্ধিজীবী তৈরি হয় ভাবনার স্তরে, চেতনার স্তরে। অভিনেতা মুছে যায়, যতোই আপনি এখন ফেবারিট হন, যদি না টিঁকে থাকবার মতো অন্য সৃষ্টি থাকে। উৎপল দত্ত, শম্ভু মিত্র আস্তে আস্তে মুছে যাবেন অভিনেতা হিসেবে। বেঁচে থাকবে উৎপলের লেখা নাটক আর ‘শেক্সপীয়রের সমাজচেতনা’, যেটা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য। শম্ভু মিত্র বেঁচে থাকবেন তার লেখা নাটক ‘বিভাব’-এ, ‘প্রসঙ্গ : নাট্য’ আর ‘চাঁদ বণিকের পালা’য়। মিঃ খান, আপনি কি বলতে পারেন গ্লোব থিয়েটারে শেক্সপীয়রের নির্দেশনায় অভিনীত ‘হ্যামলেট’ প্রযোজনায় মূলচরিত্রের অভিনেতার নাম কী ? কিন্তু ‘হ্যামলেট’ আপনি পড়েছেন এবং নাট্যকারের নাম শুনেছেন চারশো বছর পরেও। এইখানেই ২৭ বছর ধরে অভিনয় করা অভিনেতার সাথে সৃষ্টিশীল বুদ্ধিজীবীর তফাৎ।
বুদ্ধিজীবী বলে যিনি স্বীকৃত, সেই রবি ঠাকুরের গান বাজছে আমার ইয়ার ফোনে, ‘সখী ভাবনা কাহারে বলে, সখী যাতনা কাহারে বলে’। খান ভাই, এই বুড়োটা এই রোম্যান্টিক গানে ‘ভাবনা’ বলতে বোঝাচ্ছে ‘চিন্তা’ আর ‘যাতনা’ বলতে বোঝাচ্ছে ‘কষ্ট’ বা ‘অনুভব’। চিন্তা আর ভাবনা নিয়েই একজন বুদ্ধিজীবী হয়।
আপনি রাগ করে বলতে পারেন, তাহলে অভিনেতা বুদ্ধিজীবী হতে পারে না? কেন পারবে না? চ্যাপলিন হয়েছেন। কিন্তু শুধু অভিনয়ের জন্য নয়, বইগুলোর বক্তব্যর জন্য, অভিনয়ের মাধ্যমে দেশকাল ছাড়িয়ে যাওয়া বক্তব্যের জন্য।
জানেন, জেনস্টাইন নৌবাহিনীর জাহাজের লোকেদের নিয়ে একটা ছবি করেন, ‘ব্যাটলশীপ পটেমকিন’। নেভির লোকদের খাবারের মাংসে পোকা পাওয়া নিয়ে বিদ্রোহ। আপনি হলে ডেকের ওপর বগলকাটা জামা পরা হিরোইন নাচাতেন। বিদ্রোহের পর আরেক জাহাজ এসে কামান তাক করলো পটেমকিনের দিকে। তারপর কামান নামিয়ে নেভির সিগন্যালে বললো, ‘ব্রাদার্স’। দূরদিগন্তে ছড়িয়ে গেলো রাশিয়ার নৌবিদ্রোহ, পারবেন এমন ছবি করতে? পারবেন কুরোশায়া হতে, যিনিশেক্সপীয়রের বাইরে গিয়ে শেষদৃশ্যে দেখান লেডী ম্যাকবেথ গর্ভবতী, বলে দেন, তোমার পাপ পরবর্তী জেনারেশনকেও স্পর্শ করবে। হতে পারবেন সøীপবার্গ, যিনি জুরাসিক পার্ক করে সাবধান করছেন প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে দানব তৈরি করো না, কারণ তার বাবা মাকে গ্যা চেম্বারে পুড়িয়ে মারে হিটলার। হতে পারবেন আপনি ঋত্বিক ঘটক, যিনি শেষ ছবিতে গুলি খেয়ে মরবার সময় ক্যামেরার ক্লোজ শটে নিজের হাতের বোতলটাকে ধরেন?
শুনেছেন গান শাহরুখ, ‘আমার জীবনপাত্র উচ্ছলিয়া যে মাধুরী করেছি দান’?পারবেন কি সাহস করে মৃণাল সেনের মতো দেখাতে ‘কলকাতা-৭১’-এ পুলিশের হাতে সরোজ দত্তের খুন? ময়দানে মর্নিং ওয়াকে যেটা দেখে পুলিশের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেয়ার ভয়ে আরেক হিরো উত্তম লেজ গুটিয়ে পালান বোম্বে, পারবেন সরকারের বিরুদ্ধে কোর্টে সাক্ষী হতে? উত্তম আর আপনার মতো মহিলাদের হার্টথ্রব, পারবেন?
আঁতেল বোঝাতে আমি আর সত্যজিৎ টানলাম না। স্কটিশের বন্ধু গৌরাঙ্গ, যাকে আপনি মিঠুনদা বলেন, তার কাছে জেনে নেবেন, ওর মালিকানায় চলা বম্বের সিনেমা পত্রিকায় সত্যজিৎ নিয়ে আমার দশ পাতা লেখায় কী আছে? বেশিদূর যেতে হবে না, গতকাল মঞ্চেই আপনার সৌমিত্র চট্টোপ্যাধায় ছিলেন, সত্যজিতের বেশিরভাগ ছবির নায়ক। কিন্তু তিনি অভিনেতা বলে বুদ্ধিজীবী নন, ‘এক্ষণ’-এর মতো বিখ্যাত মাসিক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক, ‘নীল ঘোড়ার সওয়ার’ কাব্যগ্রন্থের কবি, ‘পরিচয়’ পত্রিকায় অজস্র প্রবন্ধের লেখক। আপনার অভিনয়জীবন ২৭ বছর, সত্যজিতের ৫০, তিনি কখনো প্রকাশ্যে দাবি করেননি, ‘আমাকে বুদ্ধিজীবী বলা হোক’। এবার কথা শেষ করি, আপনাকে আইজেনস্টাইন অথবা সত্যজিৎ হতে হবে না, আপনি শুধু আমার স্ত্রীর প্রিয় এই গানটা শুনুন, ‘সখী ভাবনা কাহারে বলে, সখী যাতনা কাহারে বলে’। আপনি ‘ভাবনা’ আর ‘যাতনা’র মানে বুঝুন, মানুষের দুঃখে আলোড়িত হোন, ভাবনায় ভাবিত হোন, মানুষের দুঃখে যন্ত্রণা পান, তাহলেই সাধারণ মানুষ আপনাকে বুদ্ধিজীবীর স্বীকৃতি দেবে, অন্য কারো সার্টিফিকেট লাগবে না!

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ