প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খেজুর গাছ আর গাছী বিলুপ্তির পথে

শাহীন কামাল: ইট ভাটায় খেজুর গাছ পোড়ানো, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবসহ নানাবিধ কারনে খেজুর গাছ বিলুপ্তির পথে। ফলে আবহমান বাংলার দীর্ঘ ঐতিহ্য খেজুর রসের পিঠা পায়েসও আজ হারিয়ে যাচ্ছে স্মৃতির অতলে। নতুন প্রজম্মের কাছে খেজুর রসের পিঠা পায়েস আজ প্রায়ই অপরিচিত আর প্রবীণদের কাছে রসালো অতীত স্মৃতি। অথচ, কনকনে শীতে বাংলার প্রতি ঘরে ঘরে পিঠা পায়েসের উৎসব এক নিত্য ঘটনা ছিল। সমবয়সী কয়েকজন মিলে রাত্রিবেলা রস নিয়ে পায়েস রান্না করে খাওয়া আজ রুপকথার মত। ভাপা পিঠাকে আগুনে তাপ দেয়া লালছে রসে চুবিয়ে খাওয়ার মধুর স্বাদ অতীত সুখস্মৃতি জাগিয়ে দেয়।

গাছের মাথা থেকে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে মধুময় রস আহরণ করে রসনা বিলাসী বাঙালির মুখে পৌঁছে দিতে যারা নিয়োজিত তারা গাছী নামে পরিচিত। কোন কোন এলাকায় এদের শিয়ালী বলা হয়। এদের কর্মকা- বিচিত্র ও বেশ সাজানো। পুরো দিনটি ব্যস্ততায় থেকে নানারকম কর্মকান্ডের মাধ্যমে তারা এ ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে বছরের পর বছর। নানাবিধ পেশার হাতছানি, প্রত্যাশিত প্রাপ্তির অভাব আর খেজুর গাছের অপ্রতুলতা ইত্যাদি কারণে অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছে। ফলে, আমাদের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের বড় এক চিহ্ন ধীরে ধীরে নিঃশেষ হওয়ার পথে। এতে শুধু একটা পেশা নয়, একটা ঐতিহ্যেরও মৃত্যু ঘটবে।

আশ্বিন মাসের শেষের দিকে গাছীরা খেজুর গাছের রস আহরণ প্রক্রিয়া শুরু করে। স্থানীয়ভাবে এটাকে গাছ কাটা বলে। এই গাছ কাটতে গাছিরা বড় ধারালো দা ব্যবহার করে। এটাকে কাটাইল বা ছেনি বলা হয়। দাটিকে বালি দিয়ে প্রতিদিন ভাল করে কাঠের বিশেষ পাতের উপর ঘঁষতে হয়। এতে দা বেশ ধারালো হয়। বাঁশের সরু নলের অংশকে মাঝ বরাবর কেটে দুইভাগ করা হয়। বাঁশ এর সংযোগস্থল দিয়ে কেটে ছোট ছোট টুকরা করে এক মাথাকে একবারে সরু করা হয় যাতে সহজেই গাছের নরম অংশে প্রবেশ করানো যায়। বাকি অংশ পাইপের মত থাকে, যার উপর দিয়ে গড়িয়ে রস প্রবাহিত হয়ে পাত্রে পড়ে। পাইপ সদৃশ এই বাঁশের অংশকে চুংগি বলা হয়। রস আহরণের জন্য মাটির তৈরী হাঁড়ি সংগ্রহ করা হয়। হাঁড়ির গলায় রশি দিয়ে আংটা বা তোড়া তৈরী করা হয়। বাঁশের পাতের তৈরি বিশেষ ধরণের বাক্স বা ঝুড়ির (যা কিনা ঠুলি নামেও পরিচিত) ব্যবস্থা রাখা হয়। মোটা কঁছি আর কাঠের তৈরী হাতুড়ি নিয়ে যাত্রা শুরু করে গাছী।

সাধারণত গাছের বয়স ৫বছর হলেই খেজুর গাছ থেকে রস আহরণ শুরু হয়। যে গাছগুলো পুরাতন তাদের বিপরীত পাশ থেকে কাটতে হয়। প্রথমদিকের কাজ বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ। গাছী তার ধারালো বড় দা কিংবা ছেনী দিয়ে গাছের পাতার গোড়া থেকে কাটা শুরু করে। এগুলোকে ডোগা বলে। গাছের মাথার উপরের অংশের বেশির ভাগ ডোগা কেটে গাছের ঐ অংশকে ভালভাবে ছেঁটে পরিস্কার করে সে। দেখতে তখন সাদা বর্ণ ধারন করে। বড় গাছে এ কর্ম সম্পাদনের জন্য গাছী তার পা বরাবর গাছ কিংবা বাঁশের টুকরাকে খেজুর গাছের সাথে বেঁধে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করে। ওখানে দাঁড়িয়ে কোমরে মোটা রশি গাছের সাথে বেঁধে ২০/৩০ ডিগ্রি কোণে অবস্থান করে সে । দৃশ্যটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হলেও দৃষ্টিনন্দন।

এইভাবে ১০/১৫ দিন রেখে দিলে সাদা অংশ রোদে শুকিয়ে হালকা হলুদ বর্ণ ধারণ করে। গাছী রস সংগ্রহের জন্য যাত্রা শুরু করে তখন। গাছের সংখ্যার উপর নির্ভর করে সে তার সময় ঠিক করে নেয়। সন্ধ্যার আগেই তাকে সকল গাছে হাঁড়ি বসাতে হবে। ঐ দিনে তার প্রয়োজনীয় সকল হাঁড়িগুলোকে এক জায়গায় জড়ো করে সে কাজ শুরু করে। পরনের লুঙ্গিকে বিশেষভাবে গুছিয়ে কোমরে ঢুলি বা বাক্সে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, বাক্সের পিছনে আংটার সাথে হাঁড়ি ঝুলিয়ে সে গাছে উঠে। পা দুটোকে ভালভাবে গাছের সাথে ঠেক দিয়ে কোমরে রশি বেঁধে ঈষৎ ঝুলে ধারালো দা বা কাটাল দিয়ে হলুদাভ অংশ ছেঁটে চুংগির সরু অংশ ছাঁটা অংশের নিচের অংশে খানিকটা বাঁকা করে ঢুকিয়ে দেয়। তার দুইপাশে বাঁশের তৈরী সরু টুকরো তারকাটাসম গাছে প্রবেশ করিয়ে তাদের সাথে হাঁড়ি ঝুলিয়ে দেয়।

কুয়াশার তীর্যক আলো ভেদ করে পৌঁছানোর অনেক অগেই রস নামানো শুরু করে গাছী। প্রচন্ড শীতেও লুঙ্গি গুছিয়ে গায়ে পরা চাদরকে এপাশ ওপাশ দিয়ে দ্রুত বেগে রস সংগ্রহ করে। সে যেন দৌড়ে গাছে উঠে। সকল রস আহরণ করে এক স্থানে জড়ো করে। নানাবিধ হাঁড়ি থেকে অল্প কয়েক হাঁড়িতে রস একত্রিত করে। অন্য খালি হাঁড়িগুলোকে খাল কিংবা পুকুরের পানিতে ভালভাবে পরিস্কার করে রোদ মুখে রেখে বাড়িতে যাত্রা করে সে। বাঁশের তৈরী বড় অংশের টুকরোর উভয় পাশে সমপরিমাণ হাঁড়ি নিয়ে বাঁশটির মাঝ বরাবর কাঁধে নিয়ে বিশেষ ভঙ্গিমায় হেলেদুলে বাড়ি রওয়ানা দেয়।

রস বাড়িতে নিয়ে পাতলা কাপড় দিয়ে ছেঁকে টিনের তৈরী পাত্রে রাখা হয়। পাত্রটিকে তাওয়া বলে। উঠানে খোলা আকাশের নিচে মাটির তৈরী উনুন বা চুলায় শুরু হয় রস থেকে গুড় তৈরির প্রক্রিয়া। এ ক্ষেত্রে গাছী পত্মীর ভূমিকাই প্রধান। দীর্ঘসময় আগুনের সংস্পর্শে পানিসম রস রঙ পাল্টাতে থাকে। সাথে সাথে গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে উঠে। গুড় তৈরী সম্পন্ন হলে বড় পাত্রে সংরক্ষণ করে তা বাজারজাতের ব্যবস্থা করা হয়।

এত এত পরিশ্রম আর ঝুঁকিপূর্ণ কাজে প্রাপ্তি আশানুরূপ না হওয়ায় অনেকে এ পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ফলে হারাতে বসেছে গ্রামবাংলার দীর্ঘ বছরের লালিত ঐতিহ্য পিঠা পায়েস,হারিয়ে যাচ্ছে গাছী নামের পেশা। কে জানে হয়ত আমাদের নতুন প্রজন্ম গাছী নাম শুনে ওপাশ ওপাশ তাকাবে একদিন!

লেখক : প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ, নাজিউর রহমান কলেজ
সম্পাদনা : নুসরাত শরমীন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ