প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রিয়ালের কোচের চাকুরি সকালে আছে তো বিকালেই নেই!

স্পোর্টস ডেস্ক: সপ্তাহখানেক আগেও যার অবিশ্বাস্য সাফল্যে ধন্য ছিলেন সবাই, মাত্র একটি হারেই সেই সান্তিয়াগো সোলারিকে নিয়ে উঠে গেছে প্রশ্ন। ৪২ বছর বয়সী এই আর্জেন্টাইন রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হিসেবে টিকে থাকতে পারবেন তো? প্রশ্নটা তুলে দিচ্ছে রিয়ালে পূর্বসূরি কোচদের নিয়তি! সোলারির আগে গত ৯ বছরে রিয়ালের কোচ হয়েছেন যারা, তাদের কেউই চুক্তির মেয়াদপূর্ণ করতে পারেননি! ব্যর্থ হলে তো বটেই; ছাটাই বা চলে যেতে হয়েছে অবিশ্বাস্য সাফল্যের পরও! মোদ্দাকথা কেউ টিকতে পারেননি। তল্পি-তল্পা গুটিয়ে মেয়াদ শেষের আগেই বিদায় নিতে হয়েছে সবাইকে।

এটা এখন প্রবাদই হয়ে গেছে-দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষণস্থায়ী চাকরি ফুটবল কোচদের। বিশেষ করে ক্লাব কোচদের। সকালে আছে তো বিকালেই নেই! পান থেকে চুন খসলেই হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় ছাটাইয়ের চিঠি। এই কোচ ছাটাই রোগ কম বেশি সব পেশাদার ক্লাবেরই আছে। তবে কোচ ছাটাই করা বিশ্বসেরা রিয়াল মাদ্রিদের স্থায়ী রোগ!

আরও একটু স্পষ্ট করে কোচ ছাটাই রোগটা বেশি রিয়াল মাদ্রিদের উচ্চাবিলাসী সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের। উপরে উল্লেখিত তথ্য সেই বার্তাই দিচ্ছে। পেরেজ দ্বিতীয় মেয়াদে রিয়ালের সভাপতি নির্বাচিত হন ২০০৯ সালে। সেই থেকে সোলারির আগ পর্যন্ত ৬ জন রিয়ালের কোচের তক্তাসনে বসেছেন।

সেই ৬ জনকেই মেয়াদপূতির আগেই বিদায় নিতে হয়েছে। সবচেয়ে আশ্চার্যজনক হলো, দলকে টানা তিন মৌসুমে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জেতানোর অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়ার পরও টিকতে পারেননি জিনেদিন জিদান। সভাপতি পেরেজের সঙ্গে মতানৈক্য দেখা দেওয়ায় তাকেও বিদায় নিতে হয়েছে।

মেয়াদপূতির আগেই বিদায় নেওয়া সেই ৬ কোচের গল্পে একটু পরে আসি। তার আগে বর্তমান কোচ সোলারির বিষয়টা একটু বলে নেওয়া যাক। এই আর্জেন্টাইন হুট করেই রিয়াল মাদ্রিদের অন্তর্র্বতীকালীন কোচের দায়িত্ব পান। দলের টানা ব্যর্থতার দায়ে জুলিয়েন লোপেতেগুইকে ছাটাই করে অন্তর্বরতী দায়িত্ব দেওয়া হয় সোলারিকে। আচমকা এই দায়িত্ব পেয়েই অবিশ্বাস্য সাফল্যের গল্প লিখেছেন এই আর্জেন্টাইন।

লোপেতেগুইয়ের অধীনে চরম ব্যর্থ রিয়ালকে জেতান নিজের প্রথম ৪ ম্যাচেই। কল্পনাকেও হার মানানো এই সাফল্যের পুরস্কারটাও পেয়ে গেছেন দ্রুত। দুই সপ্তাহের মধ্যেই অন্তর্র্বতী থেকে পদোন্নতি পেয়ে হয়ে গেছেন স্থায়ী কোচ। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, এই পদোন্নতিটাই কাল হয়েছে সোলারির জন্য! টানা ৪ জয়ের পর গত শনিবার সোলারির রিয়াল ৩-০ গোলে হেরে গেছে পুঁচকে এইবারের কাছে। আর এই হারই আগের ৪ জয়কে ছাপিয়ে তাকে তুলে এনেছে কাঠগড়ায়। সোলারি কতদিন টিকতে পারবেন, শুরু হয়ে গেছে সেই আলোচনা।

রিয়াল তথা সভাপতি পেরেজের কোচ ছাটাই নেশাটা যে বড় বেশি প্রবল। ২০০৯ সালে সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি কোচ করে আনেন ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনিকে। চিলিয়ান এই কোচের সঙ্গে রিয়ালের চুক্তিটা ছিল ২০১৩ সাল পর্যন্ত। কিন্তু শিরোপা সাফল্য না পাওয়ায় এক মৌসুমের বেশি টিকতে পারেননি। ব্যর্থতার দায় চাপিয়ে ২০১০ সালেই বিদায় করে দেওয়া হয় তাকে।

পেলেগ্রিনিকে ছাটাই করে পেরেজ কোচ হিসেবে ভাড়া করেন উচ্চমূল্যের হোসে মরিনহোকে। ইন্টার মিলানের মতো ক্লাবকে ইতিহাসে প্রথম বারের মতো ‘ট্রেবল’ জেতান মরিনহো। রিয়ালের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতেই দৈত্য বায়ার্ন মিউনিখকে হারিয়ে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা জেতে মরিনহোর ইন্টার মিলান। ইন্টারের কোচ হিসেবে সেই অবিশ্বাস্য সাফল্যই মরিনহোর প্রেমে ফেলে দেয় পেরেজকে।

টাকার জোর খাটিয়ে ইন্টারের সোনার খাঁচা থেকে নিয়ে আসেন মরিনহোক। এই পর্তুগিজ কোচ দ্বিতীয় মৌসুমেই রিয়ালকে এনে দেন লিগ সাফল্য। বার্সেলোনার রাজত্বে হানা দিয়ে রিয়ালকে ৩ মৌসুম পর জেতান লিগ শিরোপা। লিগের পাশাপাশি চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও উন্নতির ছাপ রাখে মরিনহোর রিয়াল। শিরোপা সাফল্য না পেলেও তিন বছরই তিনি দলকে তোলেন সেমিফাইনালে। পুরস্কার হিসেবে তার চুক্তি চুক্তিটা নবায়ন করা হয় ২০১৬ সাল পর্যন্ত। কিন্তু পরের মৌসুম শেষেই, মানে ২০১৩ সালেই পারস্পারিক সমঝোতার মাধ্যমে বিদায় নিতে হয় মরিনহোকে।

মরিনহোর বিদায়ের পর কোচ করা হয় কার্লো আনচেলত্তিকে। বর্ষিয়ান এই ইতালিয়ান কোচকে জোর করে নিয়ে আসে পিএসজি থেকে। দায়িত্বের প্রথম মৌসুমেই রিয়ালকে জেতান বহুপ্রতীক্ষার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা। কিন্তু সেই সাফল্যও আনচেলত্তির চাকরিটাকে মেয়াদপূর্তি দিতে পারেনি। ২০১৬ সাল পর্যন্ত চুক্তি হলেও ২০১৫ সালেই ধরিয়ে দেওয়া হয় বরখাস্তের চিঠি।

এরপর কোচ হয়ে আসেন রাফায়েল বেনিতেজ। তার সঙ্গে চুক্তিটা হয় ২০১৮ সাল পর্যন্ত। কিন্তু স্প্যানিশ ভদ্রলোক ৬ মাসের বেশি টিকতে পারেননি। ব্যর্থতার দায়ে ২০১৬ সালের জানুয়ারিতেই বিদায় করা হয় তাকে। বেনিতেজের বিদায়ের পর হুট করে দায়িত্ব পান অনভিজ্ঞ জিদান।

কিন্তু অনভিজ্ঞ হলেও ফরাসি মহানায়ক কোচ হিসেবে অকল্পনীয় সফল। রিয়াল চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতান টানা তিন মৌসুমে।

একবার জিতিয়েছেন লিগ শিরোপাও। সব মিলে আড়াই বছরেই রিয়ালকে উপহার দেন ৯টি শিরোপা। যা তাকে বসিয়েছে ক্লাব ইতিহাসে রিয়ালের দ্বিতীয় সফল কোচের আসনে। কিন্তু এই অবিশ্বাস্য সাফল্যও জিদানকে মেয়াদপূর্ণ করতে দেয়নি। ২০২০ সাল চুক্তি থাকলেও গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জিতেই নিজে থেকে বিদায় নেন জিদান।

জিদানের উত্তরসূীর হিসেবে দায়িত্ব পান লোপেতেগুই। ৪৭ বছর বয়সী এই স্প্যানিশ জাতীয় দলের কোচের চাকরির মায়া না করে রিয়ালকে পাকা কথা দেন। কিন্তু রিয়ালের ডাগআউটে ৫ মাসও টিকতে পারেননি। ২০২১ সাল পর্যন্ত চুক্তি হলেও ৫ মাস পরই তিনি হয়ে গেছেন সাবেক।

এবার সোলারির পালা! এই আর্জেন্টাইন কোচ রিয়াল সভাপতি পেরেজের খাস লোক বলেই খবর। কিন্তু ব্যক্তিগত সেই খাতির দিয়ে কোচের চাকরিটা যে তিনি দীর্ঘ মেয়াদী করতে পারবেন, সেটা তিনিও জানেন। কারণ ব্যক্তিগত সম্পর্ক যতই ভালো হোক, পেরেজের পেশাদারিত্বের কাছে তার কোনো মূল্য নেই। তার কাছে দলের সাফল্যই শেষ কথা।

সফল হলে চাকরি থাকবে, ব্যর্থ হলে তুলে দেওয়া হবে বাড়ির বিমানে। সোলারি পারবেন, বিশ্বসেরা রিয়াল এবং সভাপতি পেরেজের চাহিদা পূরণ করে কোচ হিসেবে চুক্তির মেয়াদপূর্ণ করতে? যদি পারেন, সেটা হবে তার জন্য অনেক বড় সাফল্য।

পেরেজের দুই মেয়াদে একজন মাত্র কোচই চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছেন। তিনি ভিসেন্তে দেল বস্ক। তবে স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী কোচ দেল বস্ক ২০০৩ সালে দলকে লিগ জেতানোর পরও তার সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করেনি পেরেজের পরিচালন বোর্ড। মানে শিরোপা জেতানোর পরও তার উপর আস্থা রাখেননি রিয়াল কর্তারা! এই তথ্যই বলে কোচ ছাটাই আসলেই রিয়ালের স্থায়ী রোগ!

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ