প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অচেনা বাংলাদেশ ও আমার বন্ধু কৃষ্ণ

সালেহ্ রনক: কৃষ্ণ পদ সরকার। আমাদের বন্ধুত্ব কলেজ জীবনে। ওর দাদা বিষ্ণু পদ সরকার আমাদের কলেজের হিসাব বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। যদিও আমি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম তারপরও বিষ্ণু স্যারকে ভীষণ পছন্দ করতাম। কৃষ্ণ নিজেও হিসাব বিজ্ঞানের ছাত্র ছিল তারপরও আমাদের বন্ধুত্ব জমে ক্ষীর হতে বেশি সময় নেয়নি।

আমরা আমাদের শৈশব কৈশোরের সময়গুলোতে হিন্দু মুসলমানসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী সহপাঠি, খেলার সাথিদের সাথে গালাজড়াজড়ি,ভালোবাসায় মাখামাখি করে বেড়ে উঠেছি। আমার বন্ধু জীবন ঋদ্ধ হয়ে আছে অসাধারণ কয়েকজন ভিন্ন ধর্মালম্বীদের নিত্যদিনের পদচারণায়। ভোলা সরকারী স্কুলে পড়াকালীন সময়ে এক ঝাঁক হিন্দু ধর্ম বিশ্বাসী সহপাঠিদের সাথে বড় হয়েছি, হৃদ্যতা ছিল আকাশ ছোঁয়া।যারা আজ বন্ধু হয়েই আমার বন্ধু জীবনে বিরাজমান। বেশ কিছু স্কুল জীবনের বন্ধুরা ভারতে বসবাস করলেও এখন যোগাযোগ হয় নিয়মিত,কথা হয়, হয় দুঃখ সুখের আলাপন। এইতো বেশ কয়েক মাস আগে এক বন্ধুর চিকিৎসা সহায়তার জন্য ভারতে অবস্থানরত বন্ধুরা ভালো অংকের টাকা পাঠিয়েছিল। বাল্যকালের মতো যেকোন প্রয়োজনে এখনও সবাই এক জোট।

আমাদের বেড়ে ওঠার সময়টাই ছিল অন্যরকম। বাবার চাকুরির সুবাদে লালমোহনে গিয়ে পেয়েছিলাম বাবুল নামের আর এক হিন্দু সহপাঠি।আমরা দল বেঁধে ওর রুমে গিয়ে আড্ডা দিতাম। স্কুলের জীবনের অসংখ্য মধুর স্মৃতি ওকে ঘিরে। বাবুল এখন আমেরিকা প্রবাসী। কলেজ জীবনে হিন্দু বন্ধু হিসাবে জীবনে এলো পাপড়ি,কৃষ্ণসহ আরো অনেকে। পাপড়ি তো বন্ধু থেকে দোস্ত হয়ে গেছে। সে এখন ভারতে থাকে। ওর কন্যা অনন্যা যখন মামা বলে ডাকে, এতদূরে থেকেও ঐ মধুর, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা মেশানো ডাক আমি শুনতে পাই। পাপড়ির এক একটি কন্যা এক একটি রত্ন।বরুণ নামে এক হিন্দু সহপাঠি, বন্ধু ছিল, হারিয়ে ফেলেছি, অনেক যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও খুঁজে পাইনি। বরুণ আমার জীবনে যখন বন্ধু হয়ে এসেছিল আমি তখন প্রাইমারী স্কুলের ছাত্র। স্কুল ছুটির পর প্রায়ই ওদের বাড়িতে যেতাম। মাসিমা যত্মভরে কতকিছু যে খাওয়াতেন, যা আমায় আজও স্মৃতি কাতর করে তোলে। বিশ্বাস, একদিন ওকে ঠিকই খুঁজে পাব।

আমার ছোট ভাই, আমার স্ত্রীকেও দেখেছি এক ঝাঁক ভিন্ন ধর বিশ্বাসী বন্ধুদের সাথে বেড়ে ওঠেছে। বন্ধুর বড় ভাই হিসাবে বেশ সমীহ করত, কখনো শ্রদ্ধা, ভালোবাসা প্রকাশে কার্পণ্য করেনি। গোপাল, রাজন, সঞ্জয় ও বিশ্বজিত, অসাধারণ সব ছেলেগুলো ছিল ছোট ভাইয়ের বন্ধু, আমার বউয়েরও। দল বেঁধে মজা করতো, আড্ডা দিত। ঐসব আড্ডা কখনো কখনো আমারও জায়গা হতো। ধর্মীয় উৎসবগুলোতেও দল বেঁধে আনন্দ করতো। আমাদের ঈদ উৎসবে ওরা বাসায় বেড়াতে আসতো, পেটভরে খেতো। আমরাও ওদের পূজার নিমন্ত্রণে যেতাম, পূজা মন্ডপে ঘুরে বেড়াতাম। পেটপুড়ে নাড়ু মুড়ি খেয়ে আবার সঙ্গে করে নিয়েও আসতাম। ধর্ম নিয়ে কখনোই বাড়াবাড়ি করিনি আমরা। অন্য ধর্মের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা রেখেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বড় হয়েছি। আর এখনকার ছেলে মেয়েরা কেমন যেন। আমার ছেলের কোন হিন্দু বন্ধু নেই। বড় মেয়ের কয়েকজন ভালো হিন্দু বন্ধু আছে তা অবশ্য ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের পরিবেশের কারণে। এদের জীবনে নেই কোন বৈচিত্র্য। এখনকার ছেলে মেয়েদের আগ বাড়িয়ে হিন্দু সহপাঠিদের সাথে মিশতে, বন্ধুত্ব করতে খুব একটা দেখা যায় না। আর তাই অসাম্প্রদায়িকও হয়ে ওঠা হয় না। আগের বাংলাদেশটাই বড্ড প্রিয় ছিল, ভালো ছিল।

বছর তিনেক আগে তন্ময় নামে এক অনুজ বন্ধুর সাথে পরিচয় হলো। ওর কথা বলার ধরণ,শান্ত প্রকৃতির ব্যবহার আমায় মুগ্ধ করে। প্রায় একবছর যাবত আমার অজানাই ছিল যে ও অন্য ধর্মের মানুষ। দল বেঁধে একসাথে ঘুরেছি, মজা করেছি কিন্তু কখনো মনে হয়নি যে সে মুসলমান নয়। একদিন নিজ থেকেই তার নিজের পরিচয় দেয়। অবশ্য সে ততদিনে বুঝে গেছে সামাজিক বন্ধনের জন্য ধর্ম আমার কাছে মূখ্য বিষয় নয়। গত রোজার আগের রোজায় একদিন ইফতারির অল্প কিছু আগে ব্যতিব্যস্ত হয়ে আমার কাছ থেকে বিদায় নিল। জিজ্ঞেস করাতে সে জানাল, রুমের বন্ধুরা রোজা রেখেছে তাদের জন্য ইফতার নিয়ে যেতে হবে। এই বাংলাদেশটাই বড় সুন্দর।

পাগলে পাগল চেনে। কৃষ্ণ আমার তেমন বন্ধু। রুচিতে, চিন্তায় আর দুষ্টুমিতে একজন আর একজনের কার্বণ কপি। আর তাইতো এতো মিল। কলেজ জীবনে নাকি সত্যিকারের বন্ধু খুঁজে পাওয়া যায় না। কৃষ্ণ সে ধারণাকে ভুল প্রমানিত করে আমার জীবনের সাথে লেপ্টে আছে। দুর্লভ সব স্মৃতির ভাণ্ডার কৃষ্ণকে জড়িয়ে। কৃষ্ণর দাদা ছিলেন স্বল্পভাষী মানুষ। নিয়মের বিরুদ্ধে যেতেন না কখনো। আমরা দাদাকে খুব ভয় পেতাম। তারপরও দাদার শাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে পড়ালেখা শেষ করে রাত ১২ টার পর বের হতাম মহল্লা চক্কর কাটতে, নতুন নতুন দুষ্টুমির রিহার্সাল দিতে।

অসাম্প্রদায়িক এক সমাজে বড় হয়েছে কৃষ্ণ। নালী গ্রামের যেখানে ওর বাড়ি সেখানে হিন্দু মুসলমানের পাশাপাশি বাস। শুধু বাস বললে ভুল হবে সবাই মিলে যেন একটি পরিবার। স্কুল জীবনের বন্ধুরা এখনো ওর জীবনের সাথে শক্তপোক্ত হয়ে জড়িয়ে আছে। আড্ডায় এখনো সেই প্রাণ, সেই সুর ও আনন্দ। আযান দিলে কেউ কেউ আড্ডা ছেড়ে উঠে মসজিদে যায় নামাজ পড়তে, ফিরে এসে আবার আড্ডায় শামিল হয়। ওর গ্রামে বেশ কয়েকবার যাওয়ার কারণে ওর বন্ধুরাও আমার বন্ধু হয়ে উঠেছে। বাবর, সুকর্ণ,ইয়াছিন,গোবিন্দ,বাচ্চু,নাজিম,বিশ্বজিত,আফসার,রাজু,মিন্টু ও প্রশান্ত এরা সবাই কৃষ্ণর বন্ধু। একসাথে বেড়ে উঠেছে এখনও একসাথেই আছে। ওদের আড্ডায় যখন শামিল হই কখন সময় ফুরিয়ে যায় টেরই পাই না। আযান দিলে কখনো প্রশান্ত কিংবা বিশ্বজিত মনে করিয়ে দেয় নামাজের কথা।বিশ্বজিতের স্লিপার পায়ে দিয়ে চলে যাই নামাজ পড়তে, ফিরে আসি আবার পুরানো কোলাহলে।

মানিকগঞ্জ জেলার, শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়নের এক বাড়িতে আমাদের দুপুরের দাওয়াত ছিল। আমার ধারনারও বাহিরে ছিল যে এক মুসলিম বাড়িতে দাওয়াত খেতে যাচ্ছি। বাড়ির মালিকের নাম সেলিম, দুই পুত্র সন্তানের জনক। আমরা মোট পাঁচজন গিয়েছিলাম। সেলিম ভাইয়ের ছেলে মাহাথির মোহাম্মদ যেভাবে কৃষ্ণ ও তার বন্ধুদের মামা বলে ডেকেছে সারাক্ষণ তাতে করে যে কেউ ভাববে আপন মামা। মাহাথিরের মা খুব যত্ন করে আমাদের খেতে দিয়েছেন। পিঠা থেকে শুরু করে মুরগীর মাংস, ইলিশ মাছ, কই মাছ, পায়েসও ছিল।

তেওতা যাওয়ার সময় কৃষ্ণ আমায় বলেছিল ভগ্নিপতির বাড়িতে বেড়াতে যাবে। সেলিম সাহেবের বাড়িতে যেয়ে আমি একটা ধাক্কাই খেয়েছিলাম। সেলিম সাহেবকেও দেখলাম কৃষ্ণর ভগ্নিপতি হতে পেরে ভীষণ খুশি ও গর্বিত। কি রেখে কি করবে, কি রেখে কি খাওয়াবে তা নিয়েই ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। মাহাথিরের মা যেভাবে কৃষ্ণকে আদর ও ভালোবাসা মেখে নিজ হাতে খাবার তুলে দিয়েছে পাতে তা দেখে বোঝার উপায় নাই এরা ভিন্ন ধর্মের।প্রায় পাঁচ বছর পর কৃষ্ণকে বাড়িতে পেয়ে খাওয়াতে পেরে গৃহিণীর সেকি আনন্দ। ফেরার সময় রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেছে যেভাবে বোন তার ভাইকে বিদায় দেয়। আমি পুরোটা সময় মুগ্ধ হয়ে শুধু দেখে গেছি।

মানবিক ও মা ভক্ত কৃষ্ণ আমার ভীষণ প্রিয়। তাইতো তেওতা থেকে ফিরে মাকে খুশি করার জন্য আমায় নিয়ে আবার খেতে বসে গেছে। ভাবখানা এমন ছিল যে তেমন কিছুই খাওয়া হয়নি। কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও মাসি মার হাতের তৈরি সকল পদের খাবার খেয়েছে, আমাকেও খাইয়ে ছেড়েছে। মা কষ্ট করে রান্না করছে, না খেলে মনে কষ্ট পাবে এই ভাবনায় ভরাপেটে আবার খাওয়া। আমুদে কৃষ্ণ বিপদে আপদে বন্ধুর পাশে দাঁড়াতে যেমনি করে ছুটে যায় তেমনি করে পাশে থাকে এলাকার পরিচিতজনদের।এলাকার ছোট বড় সকলের প্রিয় কৃষ্ণর ঢাকায় ফেরার সময় মায়ের হাতখানা নিজের মাথায় রাখা চাই ই চাই।

পরিবারকে ভীষণ ভালোবাসে, ভালোবাসে আমার মতো ঘুরতে।কৃষ্ণর আরেক নাম বৈদ্য, বাড়ির সবাই আদর করে বৈদ্য নামেই ডাকে। আসলেই ও দুঃখের বৈদ্য, সুখের বৈদ্য, বন্ধুত্বের বৈদ্য, ভালোবাসার বৈদ্য। মানবিক ও ভ্রমণ বিলাসী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার কৃষ্ণ বেঁচে থাকুক আরো অনেক অনেক যুগ আর আমি যেন বন্ধু হয়েই পাশে থাকি আমৃত্যু

আজকের বাংলাদেশ আমার কাছে বড্ড অচেনা লাগে। মনে হয় এই বাংলাদেশকে আমি চিনি না। ধর্মের নামে চারপাশে শুধু বাড়াবাড়ি। দেশে হিন্দুদের সংখ্যা কমতে কমতে বিপদজনক অবস্হায় এসে দাঁড়িয়েছে। এদেশে ভিন্ন ধর্মের মানুষজন দিন পার করে নিরাপত্তা হীনতায়। ভিন্ন ধর্মালম্বীদের উপাসনালয়, প্রতিমা ভাংচুর সাধারণ নিয়মে পরিনত হয়েছে। স্বাধীনতা লাভের পর থেকে স্বেচ্ছায় যতো হিন্দু ধর্মের মানুষ দেশ ছেড়েছে, নিরাপত্তার অভাবে দেশ ছেড়েছে তার চেয়ে কয়েকশগুণ বেশী।অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। এদেশের স্বাধীনতা লাভে হিন্দুদের অবদান কোন অংশে কম নয়। বরং পাক হানাদার বাহিনীর অত্যাচার, নির্যাতন তাদেরই সইতে হয়েছে বেশি। এদেশের শিক্ষা প্রসার ও সমাজ বিনির্মাণে হিন্দুদের অবদান অবস্মরনীয়।দেশের বিখ্যাত বিদ্যাপীঠগুলো হিন্দুদেরই তৈরি। কিন্তু ভাবখানা এমন যে এদেশ তাদের নয়, তাদের কোন অবদান নেই এদেশে।ঠিক যেন নিজ দেশে পরবাসী।

সাম্প্রদায়িকতা বিষবাষ্প সমাজ, রাষ্ট্রকে গ্রাস করে চলছে। অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা তো প্রায় উঠেই গেছে। হিন্দু মুসলমানসহ অন্য ধর্মের মানুষের সহাবস্থানের যে বৈচিত্র বাঙালি সমাজে বিরাজমান ছিল তা যেন আজ কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে প্রায়। যদিও অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে তারপরও চাইলে এই ক্ষয় রোধ করা সম্ভব। নইলে যে স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশের সৃষ্টি, সেই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ শুধু স্বপ্ন আর বইতেই লিপিবদ্ধ থাকবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ