প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মানসিক রোগ : নীরব ঘাতক

প্রতীতি শিরিন : মানসিক স্বাস্থ্য আমাদের দেশের সবচেয়ে অবহেলিত ও উপেক্ষিত একটি বিষয়। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার সংখ্যা দেখে বোঝা যায়, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠেও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি অবহেলিত, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেটা চরমে পৌঁছে যায়।

মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে খুবই সাধারণ একটি ভুল ধারণা হলো আত্মহত্যা করতে চাওয়া মানেই কাউকে মানসিকভাবে অসুস্থ ধরে নেয়া। কিন্তু সত্যিটা হলো কোনো ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে বিষণ্ন থেকে তীব্র বিষণ্নতায় ভুগতে থাকে। এই অবস্থায় আত্মহত্যার কথা চিন্তা না করেই দিনের পর দিন সে তার স্বাভাবিক কাজকর্ম করে যায়। আর একদিন অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ বা ছুরি বা হারপিক বা অন্য কোনো কিছু তার জীবনটা শেষ করে দেয়।

আত্মহত্যা সম্পর্কে আরেকটি সাধারণ ভুল ধারণা হলো মুহূর্তের আবেগ বা মাথা গরম হয়ে গেলেই মানুষ আত্মহত্যা করে। তা কিন্তু নয়। আত্মহত্যা অনেক সময় পূর্ব-পরিকল্পিতও হয়। অর্থাৎ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে মানসিকভাবে অসুস্থ বা বিষন্ন থাকে, কিন্তু সেটা সে প্রকাশ করে না।

২০০৩ সাল থেকে আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ সংস্থার সহযোগিতায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য ফেডারেশনের যৌথ উদ্যোগে প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর ‘বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ’ দিবস পালন করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় আট লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। ২০১৫ সালে এটি ছিলো ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কারণ। বাংলাদেশে এক লাখেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে। ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী ছাত্রদের মধ্যে ৪ শতাংশ আত্মহত্যা করে আর ৬ শতাংশ আত্মহত্যার চেষ্টা করে। বিশ্বে যত মানুষ আত্মহত্যা করে তার ২.০৬ শতাংশই বাংলাদেশি।

বিবিসি নিউজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে মেয়েদের মধ্যে আত্মহত্যা প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। সমাজে তাদের মর্যাদাই সবচেয়ে কম। এছাড়া নিরক্ষরতা ও পুরুষের ওপর নির্ভরশীলতাও নারীদের আত্মহত্যার আরেকটি কারণ। কিছু সাধারণ কারণ যেমন: অর্থনৈতিক সঙ্কট, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, অসুস্থতা, শরণার্থী বা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে আত্মহত্যা প্রবণতা বেশি। এছাড়া যেকোনো দুর্যোগ, সহিংসতা, যুদ্ধ, যৌন হয়রানি বা নিপীড়ন এবং অনেক সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ভয়েও মানুষ আত্মহত্যা করে।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে অনেক পরামর্শই দিচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা। বাংলাদেশে পেনাল কোড ১৮৬০ অনুযায়ী, শিশুদের আত্মহত্যায় সাহায্য করলে মৃত্যুদ-ের শাস্তি রয়েছে। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্কদের শাস্তির বিধান নেই। তবে ইসলামে আত্মহত্যা হারাম। আর আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ মুসলিম। কিন্তু তা হলেও বিশ্বব্যাপী আত্মহত্যা একটি সামাজিক ও মানসিক সমস্যা। শুধু আইন করে এর প্রতিরোধ সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে ২০১৩ সাল থেকে ইয়াশিম ইকবাল পরিচালিত ‘কান পেতে রই’ নামক একটি এনজিও টেলিফোনে কাউন্সেলিং-এর ব্যবস্থা করেছে। যাদের দরকার তারা সাহায্য চাইলে সংস্থাটির কর্মীরা তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। তবে এর প্রধান লক্ষ্য হলো আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা। যাই হোক না কেন, যতক্ষণ পর্যন্ত বৃহত্তর পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি করা না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আত্মহত্যার সংখ্যা কমানো যাবে না। আর এর জন্য নীরব ঘাতক মানসিক রোগকে আগে চিহ্নিত ও প্রতিরোধ করতে হবে।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। (মূল ইংরেজি লেখা থেকে অনূদিত ও সংক্ষেপিত) সম্পাদনা : ইকবাল খান, আলমগীর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ