প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নতুন সরকার কী দরকার?

বিভুরঞ্জন সরকার : দুপুরে খেতে ঢুকেছি একটি হোটেলে। ভরদুপুর। কাজেই খদ্দেরও বোঝাই। বসার জায়গা পাওয়ার জন্য একটু অপেক্ষা করতে হলো। চুপচাপ দাঁড়িয়ে মানুষের কথা শুনতে লাগলাম। আমাকে কেউ চেনে না। তাই কারো আলোচনায়ও কোনো ব্যাঘাত ঘটলো না। ছোটবেলায় খেতে বসে কথা বললে গুরুজনেরা শাসিয়ে বলতেন, চুপচাপ খেয়ে ওঠো। খেতে বসে কথা বলতে নেই। এখন আর খেতে বসে কথা না বলার রীতি কেউ মানে না। বরং অন্য সময়ের চেয়ে খাবার সময়ই সম্ভবত বেশি কথা হয়। এখন খাবার সময় বাজে কথার চেয়ে কাজের কথাই হয়তো বেশি হয়। অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা, বিজনেস ডিল ইত্যাদি তো এখন খাবার টেবিলেই হয়। ওয়ার্কিং লাঞ্চ বা ডিনারের কথা আজকাল খুব শোনা যায়। বরিশালের রাধুনি রেস্তোরাঁয়ও আমি কাউকে চুপচাপ খেতে দেখলাম না। যারা কথা বলছেন, তাদের অনেকেরই কণ্ঠস্বর উচ্চগ্রামে। খুশি হলাম এটা দেখে যে আলোচনা হচ্ছে রাজনীতি নিয়ে, আগামী নির্বাচনে প্রার্থী নিয়ে। একজন একটা বলছেন তো আরেকজন তার পাল্টা একটা বলছেন। রেস্তোরাঁর তরুণ ম্যানেজারও আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন মাঝে মাঝে। এক ফাঁকে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আর সামান্য সময় অপেক্ষা করেন। ওই টেবিলটা এখনই খালি হবে। তারপর হাসতে হাসতে বললেন, আমার হোটেলে এরকম টকশো প্রায়ই হয়। হ্যাঁ, আলোচনার ধরনটা টকশোর মতোই।

একজনের কথা কানে এলো। তিনি বলছেন, বরিশাল সদরে এবার বিএনপি প্রার্থী না বদলালে ঠকবে। যারে নিয়ে বিতর্ক আছে তাকে প্রার্থী করলে খবর আছে।

আরেকজন বললেন, পুরান চাল ভাতে বাড়ে। নতুন প্রার্থী দিলে বিএনপি ডুববে। নতুন যার নাম শোনা যাচ্ছে তিনি বড় নেতা, ঢাকায় থাকেন। টকশোতে ভালো ভালো কথা বলেন কিন্তু এখন দরকার মানুষের কাছাকাছি থাকেন এমন নেতা। দূরের নেতাদের মানুষ দূরেই রাখবে।

এই কথারও প্রতিবাদ হলো। রাখো তোমার নীতি কথা। আওয়ামী লীগ এবার জেতার জন্য মরিয়া। কাজেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সঙ্গে সমানে সমানে লড়ার মতো প্রার্থী বিএনপিকেও দিতে হবে।

আওয়ামী লীগ যদি প্রার্থী বদল না করে তাহলে বিএনপি যাকেই নমিনেশন দেবে সেই জিতবে, একজন বললেন বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই। তিনি এটাও যোগ করলেন যে, বরিশালের মাটি বিএনপির ঘাঁটি, এটা সবারই জানা।

এ কথারও প্রতিবাদ হলো। একজন বললেন, মানুষ এবার আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে না। ভোট দেবে শেখ হাসিনাকে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে মানুষ যেমন স্থানীয় প্রার্থী দেখে ভোট না দিয়ে ভোট দিয়েছিলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, নৌকা মার্কায়, আগামী নির্বাচনেও মানুষ তাই করবে। স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের কারো কারো গণবিরোধী, গণবিচ্ছিন্ন ভূমিকায় মানুষ অসন্তুষ্ট, বিরক্ত হলেও শেখ হাসিনার প্রতি মানুষের আস্থা-বিশ্বাস-ভালোবাসা-শ্রদ্ধা শুধু অটুট আছে তাই নয়, সেটা বরং বেড়েছে। কাজেই এবার ভোট হবে শেখ হাসিনা বনাম অন্যান্য।

এই কথা শুনে আমার মনে পড়লো, কিছুক্ষণ আগে শোনা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে একজন সাংবাদিকের বক্তব্য। ওই সাংবাদিক বন্ধুও বলছিলেন, অনেক মানুষই এখন সরকারের পরিবর্তন চান না। তাদের প্রশ্ন, সরকার বদল কিসের জন্য? সরকার বদলালে কার লাভ হবে? সরকার বদল হলে বরং দেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। উন্নয়ন কর্মকা- ব্যাহত হতে পারে। এমনকি পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অতীতেও দেখা গেছে, বিএনপি সরকারে এসে আওয়ামী লীগ সরকারের ভালো কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে না। প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর লক্ষ্যে হাসিনা সরকারের কমিউনিটি ক্লিনিকের মতো কর্মসূচিটিও বিএনপি বন্ধ করেছিলো। আগামী নির্বাচনে যদি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে না আসতে পারে তাহলে এই সরকারের কোন কোন কর্মসূচি বন্ধ হবে, সেটা কে বলতে পারে? কাজেই সাংবাদিক বন্ধু বলেছিলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে সরকার-পরিবর্তন চান না। যারা ক্ষমতায় যেতে চায়, যারা ক্ষমতায় গিয়ে লুটপাটের অংশীদার হতে চায়, তারা ছাড়া সাধারণ মানুষ সরকার পরিবর্তনের জন্য কোনো গরজ অনুভব করে বলে মনে হয় না।

সাংবাদিকদের মধ্যেও সবাই একমত পোষণ করেন তা নয়। নির্বাচন হওয়া না-হওয়া নিয়ে যেমন সংশয় আছে, তেমনি কেউ কেউ আবার মনে করেন, নির্বাচন কোনোভাবেই সুষ্ঠু হওয়া সম্ভব হবে না। কারণ আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে হারতে চাইবে না। বিএনপির হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়ার মতো অবস্থা আওয়ামী লীগের হয়েছে বলে মনে হয় না। অন্যদিকে, সুষ্ঠু নির্বাচন কোনো দলেরই নিশ্চিত জয়ের গ্যারান্টি দেবে না। তাই শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা যারা করছেন তারা এবার হতাশ হবেন।

এই সব বারোয়ারি আলোচনা থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না ঠিক, তবে মানুষের চিন্তা-ভাবনার ভিন্নতা বোঝা যায়। রাজনীতিতে নানা মেরুকরণ চলছে। আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ বিএনপি এখন ঐক্যফ্রন্ট ও ২০-দলীয় জোটের কব্জায় থেকে জগাখিচুড়ি রাজনীতি করছে।

ঐক্যফ্রন্টের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, ‘এ সরকারকে আমরা দুই পয়সা দিয়েও বিশ্বাস করি না। এমন কৌশল প্রয়োগ করবো, যাতে এবার একটা কিছু হবেই।’

মান্নার বক্তব্য অনেকের কাছেই ইঙ্গিতপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। কী কৌশল করছেন তিনি? কোনো নাশকতার পরিকল্পনা করছেন নাতো? কী ঘটাতে চান মান্না? ক্ষমতার পরিবর্তন, নাকি আরো কিছু? মান্নার বক্তব্য সম্পর্কে বরিশালের একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বললেন, মান্না কী করবেন বা কী করতে পারবেন তা পরীক্ষিত নয়। তবে তার রহস্যময় বক্তব্য থেকে কারো কারো মনে একটি বাক্য ঘুরছে আর তা হলো, ‘মান্না, নির্বাচন চান না’’।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ