প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

২০ দল-ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী মনোনয়ন এবং রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতি

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : একাদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং আগে থেকে পরিচিত জামায়াত-বিএনপির ২০ দলীয় ঐক্যজোট নির্বাচনী মনোনয়ন প্রদানের ক্ষেত্রে বেশ কিছু জটিল রাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। ২০ দলীয় জোট গত ৫ বছর নানা অভ্যন্তরীণ সংকটে সক্রিয় হতে পারেনি। বিশেষত ২০১৪ সালের ০৫ জানুয়ারি নির্বাচন প্রতিহত করতে ব্যর্থ হওয়ার পর ২০১৫ সালে ৯৩ দিনের ব্যর্থ আন্দোলন শেষে অনেকটাই ¤্রয়িমান হয়ে পরে। বিএনপি তখন ধারণা করেছিলো যে, ২০১৪ সালের নির্বাচন জামায়াত শিবিরের ক্যাডারের ওপর ভর করে ব্যর্থ করতে সক্ষম হবে, দেশে বড় ধরনের অভ্যুত্থান ঘটবে, পরিণতিতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে বাদ্য হবে, ক্ষমতায় একচেটিয়াভাবে ২০ দলীয় জোট অধিষ্ঠিত হবে। ২০১৪ সালে সেটি ব্যর্থ হয়। ২০১৫ সালে একইভাবে ৯৩ দিন দেশব্যাপী অবরোধ, হরতাল ও পেট্রলবোমার আতঙ্ক ছড়িয়ে যেই নৈরাজ্য সৃষ্টি করা হয়েছিলো সেটিও সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ায় বিএনপি এবং জামায়াত জনগণের সম্মুখে কোন সুষ্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। ফলে রাজনৈতিক জোট হিসেবে ২০ দল তথা বিএনপি ও জামায়াত বড় ধরনের সংকটে পরে। এছাড়া ওই সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে অভিযুক্তদের বেশিরভাগ নেতাই দোষী সাব্যস্থ্য হওয়ায় আইনানুগ রায় কার্যকর হয়। এতে জামায়াত ইসলাম বড় ধরনের নেতৃত্ব শূন্যতায় পরে, বিএনপিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকাতে না পারার কারণে জামায়াত-বিএনপি আস্থা-অনাস্থার সংকটে পরে। সেই থেকে ২০ দলীয় ঐক্যজোট অনেকটাই কিং কর্তব্য বিমূঢ় হয়ে পরে। এই সময়ে সরকার দেশে আর্থ সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম নীরবে সম্পূর্ণ করে। ফলে রাজনৈতিকভাবে ২০ দল তথা বিএনপি ও জামায়াত সরকার বিরোধী কোনো অবস্থান গড়ে তুলতে না পারার অবস্থানে চলে যায়।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের একটি অংশ বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে কৌশলী ঐক্য গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। অন্যদিকে এক সময়ের আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকা কিছু কিছু নেতা এবং তাদের রাজনৈতিক দল বিএনপির বিকল্প চিন্তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেন। বিএনপি অনেকটাই যেন আশার আলো দেখতে পায়। ড. কামাল হোসেন ঐক্যফ্রন্টের মূল নেতা হিসেবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ১৪ দল এবং মহাজোটের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন। বিষয়টি সকল মহলেই আলোড়ন সৃষ্টি করে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা একাদশ নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের অংশগ্রহণকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার মনোভাব ব্যক্ত করার পর ড. কামাল হোসেন সংলাপের আহ্বান জানিয়ে পত্র লেখেন। প্রধানমন্ত্রী ঐক্যফ্রন্টসহ সকল রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে নির্বাচনের একটি পরিবেশ সৃষ্টি করেন। ফলে দূর হয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে কুয়াশা ও কালো মেঘ তৈরি হয়েছিলোÑ সেটি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি অনন্য ঘটনা। মোটামুটি একটি সুষ্ঠ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিক থেকে ব্যক্ত হওয়ায় সকল রাজনৈতিক জোট এখন নির্বাচনী মাঠে, নির্বাচন কমিশন কর্তৃত্ব ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী সকলেই প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে ব্যস্ত আছে।

এরই মধ্যে ২০ দলীয় জোট এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়ন নিয়ে দলীয় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন লন্ডনে অবস্থানকারী তারেক রহমান যেসব দিক নির্দেশনা দিয়েছেন তার ফলে ঐক্যফ্রন্টের মূল নেতৃত্বের সঙ্গে বিএনপির পূর্ব প্রতিশ্রুতির ব্যাপক ব্যত্যয় ঘটায়। ড. কামাল হোসেনসহ বেশ কয়েকজন নেতা কিছুটা নিরবতা পালন করছেনÑ যা রাজনৈতিক মহলে বেশ আলোচনার ঝড় তুলেছে। মূলত প্রার্থী মনোনয়ন দানে ঐক্যফ্রন্টের ভূমিকা গৌণ হয়ে পরেছে, অন্যদিকে বিএনপি ও জামায়াতের যে দীর্ঘদিনের ঐক্য ও ঘনিষ্ঠতা সেটি সম্মুখে চলে আসে। বিএনপি জামায়াত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ঐক্যফ্রন্টের গুরুত্বকে এখনই হালকা করে ফেলেছেন বলে ঐক্যফ্রন্টের কোনো কোনো নেতার কাছে মনে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসার সুযোগ ফেলে রাজনৈতিকভাবে যেসব গুণগত পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি ১১ দফাতে দেওয়া হয়েছিলো সেগুলোর কোনটিই যে রক্ষা বা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না সেই ধারণাও তাদের মধ্যে উঠতে শুরু করেছে। বিষয়টি অবশ্য রাজনীতির বিশ্লেষকগণ আগেই ঐক্যফ্রন্টের মূল নেতৃত্বকে সতর্ক করেছে। কেননা ২০ দলীয় ঐক্যজোটে অর্ন্তভুক্ত রাজনৈতিক শক্তির আদর্শ ও চিন্তা ভাবনার সঙ্গে সাবেক আওয়ামী লীগ নেতাদের মতাদর্শগত পার্থক্য বিস্তর। এই মুহূর্তে জামায়াত ও বিএনপি নানা সংকটে থাকায় ঘুরে দাঁড়াতে ড. কামাল হোসেনদের সঙ্গে যে ঐক্যটি করে ছিলো সেটি ছিলো তাদের কৌশলগত ঐক্যÑ কোনোভাবেই আদর্শগত নয়। সুতরাং নির্বাচনের আগেই মনোনয়নদানের প্রশ্নে জামায়াত এবং বিএনপি যেসব কৌশল নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে বা হতে চাচ্ছে তার পরিণতি হবে ঐক্যফ্রন্টের চিন্তাভাবনার জলাঞ্জলি।

বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ কৌতুহলের সৃষ্টি করেছে। ড. কামাল হোসেন এবং অন্যান্য সাবেক আওয়ামী নেতৃবৃন্দ বিএনপি ও জামায়াতকে সঙ্গে করে কতটা অগ্রসর হতে পারবেন, ইশতেহারে বর্ণিত প্রতিশ্রুতির ধারে কাছে কতটা যেতে পারবেন- সেটিই মৌলিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখা যাক, মনোনয়নকে কেন্দ্র করে ঐক্যফ্রন্ট, ২০ দলীয় ঐক্যজোট এবং বিএনপি জামায়াতের ভূমিকা ও আচরণ কী হতে যাচ্ছে?

লেখক : অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, বাউবি

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ