প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কারণ, শেখ হাসিনা বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমতি

দীপক চৌধুরী : তখন সকাল সাড়ে ১০টা। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে দলীয় মনোনীত প্রার্থীদের চিঠি দেওয়া শুরু করে দলটি। চারদিকে হৈ-হুল্লা, উৎসব। তিল ধারণের ঠাঁই নেই। দাঁড়াবার জায়গা নেই। দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এই চিঠি বিতরণ করছিলেন। নিচতলায় এসে বসবার জায়গা পেয়েছি। একজন সাংবাদিকের চড়া কণ্ঠ, কে পাচ্ছেন কে না তা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা যাচ্ছ না। তিনি বললেন বিরক্তভরা কণ্ঠে। একটু লক্ষ্য করতেই শুনছিলাম একজন প্রবীণ মানুষের কথা।

‘শেখ হাসিনা বুদ্ধিমতি। তিনি খুবই বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী।’ মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। দ্বিতীয়বারও এমন কথা উচ্চারণ। কেন তার কণ্ঠে এমন মন্তব্য প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে তা বুঝতে কষ্ট হয় না। তার কণ্ঠে উচ্চারণের হেতু কী জানতে চই। এটা তো সত্যি? নির্বাচনকে ঘিরে কঠিন অবস্থা শুরু হয়েছিল। খুন-হত্যা- পেট্রলবোমা-অবরোধ চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল।

সবকিছু কাটিয়ে গণভবনে সংলাপ হলো, আমরা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দিকে ধাবিত হচ্ছি। এটা কম কীসের? এগিয়ে উপযাচকের মতো কথা শুরুর পর জানতে পারি, দলের একজন কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে ওই প্রবীণসহ কয়েকজন এসেছেন চূড়ান্ত ঘোষণা নিজ কানে শুনতে। আগেই জেনে গেছেন, তাদের কাক্সিক্ষত নেতাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। তবুও আসা। তিনি এসেছেন মুন্সীগঞ্জ থেকে। কাপড়ের ব্যবসা পেশা তার। কথায় কথায় আরও জানালেন, নৌকার বিজয় তাকে আনন্দ দেয়।

১৯৭১-এ মুক্তিযোদ্ধা বাবাকে হারিয়েছেন। ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনেছেন। এটা তার গর্ব, অহঙ্কার। তার কণ্ঠে চিরজীবনের গল্প এটি। একটু থেমে মন খারাপ করা ’৭৫-এর অগাস্টের কাহিনীও শোনালেন নিচু কণ্ঠে। চোখমুখে ঘৃণা ঝিলিক দিয়ে উঠলো তার। এরপর ২১ অগাস্ট, ২০০৪-এর নৃশংসতা।

‘ওরায় মানুষ? বঙ্গবন্ধুকে মারলো, ওরা তো মানুষ না পশু ছিল, জানোয়ারের কাজ করলো।’ এবার লোকটি মাথা নিচু করে বললেন, ‘কিছু পাইতে আওয়ামী লীগ করি না, আমার বাপ-দাদা করে গেছে, আমিও করি। দলটাকে আমরা ভালবাসি।’

আওয়ামী লীগের এটাই বড় শক্তি। কিছু পাওয়ার জন্য নয়, যুগের পর যুগ, বছরের পর বছর আওয়ামী লীগকে ভালোবেসে গেছে এই শ্রেণিটা। টানা দশ বছর ক্ষমতায় থাকা দল আওয়ামী লীগ। নেতাকর্মীর উচ্ছাস দেখা গেছে মনোনয়ন সংগ্রহের তিনচারদিন। ৪হাজার ২৩টি মনোনয়ন বিক্রি হয়েছে। এখন আওয়ামী লীগ অনড়। দলের সাধারণ সম্পাদকের কড়া হুঁশিয়ারি। একটি আসনে একজনকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে। নির্দেশ, মানতে হবে না হলে কঠিন ব্যবস্থা। এটাই বাস্তবতা।

১৪ নভেম্বর গণভবনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের উদ্দেশে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আবেগপূর্ণ ভাষণ হয়ে উঠেছিল, দলের আগামীদিনের দিকনির্দেশনা। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, কান্ট্রি ইন ট্রানজিশন। একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে বাংলাদেশ। আমরা আরও দেখলাম, ‘গণতন্ত্র মানে সমঝোতা’- এটা ঐক্যফ্রন্টকে জানিয়ে দিয়েছেন শেখ হাসিনা। এদেশে সংলাপ ইস্যু নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা শুনেছি। সংলাপ অনুষ্ঠিত হলো গণভবনে।

গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, বিকল্পধারার একিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, আসম আব্দুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না, মোহাম্মদ সুলতান মনসুরসহ প্রায় তিনশ’ নেতার সঙ্গে শেখ হাসিনা কথা বলেছেন। সুদীর্ঘ সময় দিয়েছেন সংলাপে। মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনেছেন। প্রকৃতপক্ষেই যেনো বাংলাদেশের উজ্জ্বল রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করেছেন শেখ হাসিনা।

এখন কে না বলবে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। বাস্তব এবং সত্য যে, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাঠে আমরা। কিন্তু আমরা কী ভয়ঙ্কর অতীত অতিক্রম করে আসিনি? অনেকের হয়তো মনে আছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি জোটের কড়া হুঁশিয়ারি, ‘নির্বাচন বাতিল করতে হবে।’ এর কিছুদিন পর তারা জোরালো কণ্ঠে বললেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন ছাড়া কোনো উপায় নেই।

জনগণ মধ্যবর্তী নির্বাচন চায়।’ এর কিছুদিন পর অর্থাৎ ২০১৬ সালে অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ২০ দলীয় জোট থেকে দাবি উঠলো,‘ ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই নির্বাচন দিতে বাধ্য করা হবে সরকারকে। মধ্যবর্তী নির্বাচন ছাড়া সরকারের সামনে কোনো পথ খোলা নেই।’ ২০১৭ সালে এসে বিএনপিজোটের একমাত্র দাবি তীব্র আকার ধারণ করে উঠলো, ‘অবৈধ সরকারকে হটাতে হলে অবাধ নির্বাচন দরকার। এটা করতে হলে, তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া বিকল্প কিছুই নেই।’ ২০১৮ সালের মার্চে এসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের একমাত্র দাবি, ‘খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া কোনো নির্বাচন নয়।’

কিন্তু এই নভেম্বরে? খালেদা জিয়া কী মুক্ত? না, তিনি কারান্তরে। একারণেই সম্ভবত মাঝেমধ্যে প্রশ্ন ওঠে, ‘রাজনীতির শেষ কথা কী?’ যদি কেউ প্রশ্ন করে বা জানতে চায়, ‘ সংলাপ নিয়ে এতো যে কথা, লাভটা কার হলো? এর উত্তর সংক্ষেপে দেওয়া না গেলেও সংক্ষেপে বলা যায়, বিএনপি কী কিছু না পেয়েই খুশি থাকে? তাহলে দলটির বৈশিষ্ট্য কী?
ধারণা করা হয়েছিল, ২৩০ আসনের মনোনয়ন ঘোষণার পর আওয়ামী লীগে সহিংসতা শুরু হবে। তা মিথ্যা প্রমাণিত হলো। বাস্তবে এর বিপরীত অবস্থা দেখে অনেকেই নাকি বিস্মিত। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, দেশের সামনে সুন্দর ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। তবে বিচারের ফল আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধরতে হবে সবাইকে। কারণ, বিচার ভার তো জনগণের হাতে!

লেখক : উপ-সম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, কলামিস্ট ও ঔপন্যাসিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত