প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খাসোগজি হত্যা, ইয়েমেনে গণহত্যা ও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’

মোহাম্মদ আলী বোখারী, টরন্টো থেকে: মঙ্গলবার গোয়েন্দা সংস্থা ‘সিআইএ’ রিপোর্টের ভিত্তিতে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে টুইট বার্তাটি বিশ্বকে পাঠিয়েছেন, তারই প্রতিক্রিয়ায় ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার বৈশ্বিক মতামত কলামের সম্পাদক ক্যারেন আতিয়া তার হৃদয়স্পর্শী অভিমত কলামের শিরোনাম দিয়েছেন ‘ট্রাম্প’স ডিফেন্স অব খাসোগজি’স সৌদি মার্ডারার্স উইল স্টেইন হিম (অ্যান্ড আমেরিকা) ফরেভার’। অর্থাৎ খাসোগজি হত্যায় সৌদি আততায়ীদের রক্ষায় ট্রাম্প নিজেকে (এবং আমেরিকাকে) চিরতরে কালিমাযুক্ত করবেন। এতে লেখকের সূচনা বক্তব্যটি হচ্ছে, ‘গত শুক্রবার দ্বিপ্রহরে আমি এই পত্রিকার কয়েক গলি দূরে বেলজিয়ান রেস্টুরেন্ট ‘ব্রাসারি বেক’-এ গিয়েছিলাম। এখানেই আমি পত্রিকাটির কলামিস্ট ও আমার বন্ধু জামাল খাসোগজির সঙ্গে শেষ মধ্যাহ্ন ভোজ করেছি। আমি আমার অশ্রু ধরে রাখতে পারিনি। সেদিন বিকেলেই সিআইএ-কে উদ্ধৃত করে ‘হাই কনফিডেন্স’ বা উচ্চ আত্মবিশ্বাসে ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে যে, ২ অক্টোবর তুরস্কে সৌদি দূতাবাসে জামালের হত্যায় সৌদি রাজপুত্র মোহাম্মদ বিন সালমানের (এমবিএস) নির্দেশ ছিল। রাজপুত্রের যোগসূত্র নিয়ে পর্বতসম প্রমাণ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার ভাষ্যানুযায়ী খাসোগজিকে তার ভার্জিনিয়ার বাড়ী থেকে তুলে নিয়ে সৌদিতে আটক রাখার চক্রান্তটি রাজপুত্র প্রলুব্ধ করেছেন। ওই হত্যাকাণ্ডে রাজপুত্রের ঘনিষ্ট উপদেষ্টা, সরাসরি কুখ্যাত সৌদ আল-কাহতানির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বিশ্বের বিশ্লেষকদের ধারণা, এমন কাজ রাজপুত্রের সম্মতিহীন হতে পারে না। পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেছেন খাসোগজি হত্যায় রাজপুত্র ‘এমবিএস’-এর ‘ব্লাইন্ডিংলি অভিয়াস’ বা নির্ঘাতভাবেই নির্দেশ ছিল। তা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমবিএসের অস্বীকৃতিকে তুলে ধরেছেন। সপ্তাহান্তে তিনি বলেছেন, সিআইএ রিপোর্ট ‘প্রিম্যাচুউর’ বা অপরিপক্ক। ট্রাম্প নিজে খাসোগজি হত্যার অডিও টেপ শোনার বিষয়টি অস্বীকার করলেও স্বীকার করেছেন টেপটি ‘ভিষিয়াস’ বা অসুদদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

নিঃসন্দেহে এখন সেই সামগ্রিক অনুভূতির তীব্রতাটি বিশ্বময় প্রতিফলিত ও আলোড়িত। কেননা জন্মসূত্রে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগজি মধ্যপ্রাচ্যের একজন শক্তিমান লেখক হিসেবে যেমন চিত্রিত, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রে ওয়াশিংটন পোস্টে সৌদি সরকার বিরোধী কলাম লেখক হিসেবে প্রতিপন্ন; অথচ নির্মমভাবে খুন ও অদৃশ্য হন তুরস্কে সৌদি কনস্যুলেটে। তাতে মানবাধিকারের দাবিতে খাসোগজি হত্যার বিষয়টি ত্রিদেশীয় হলেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সর্বশেষ টুইটটি পরোক্ষভাবে ইয়েমেনে অব্যাহত সৌদি গণহত্যাকে বিশ্বে জাগ্রত করেছে। দেখা যাচ্ছে, সৌদি সামরিক জোট ‘আরব বসন্তে’ জেগে ওঠা হুতি বিদ্রোহী দমনে ইয়েমেনে নির্বিচারে বোমা হামলা চালিয়ে গণহত্যা করছে, যারা সরকারি নিষ্পেষনের বিরোধী। গত আগস্ট মাসে ওই সামরিক জোট ৫০০ পাউন্ডের লেজার চালিত আমেরিকার লকহিড মার্টিন নির্মিত এমকে ৮২ বোমা ইয়েমেনের দাহিয়ানে এক বাজারে ফেললে ৫১ জন মারা যায়, যার ৪০ জনই ছিল শিশু। সেই বোমা গত বছর সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র চুক্তির ভিত্তিতে অর্জিত। একই ধরনের বোমা ২০১৬ সালে রাজধানী সানা’য় ফেললে এক জানাজায় শরিক হওয়া ১৫৫ জন মারা যায়। গত ১৩ অক্টোবর হুদেদায় আকাশ থেকে বোমা বর্ষণের ফলে ১৯ জন বাসযাত্রী নিহত ও ৩০ জন গুরুতর আহত হয়। ওই সামরিক জোট একমাত্র ২০১৮ সালেই পঞ্চাশের অধিক আকাশ থেকে সাধারণের গাড়ীর উপর গোলা বর্ষণ করেছে। এই সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক হত্যাযজ্ঞকে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তদন্তকারীদের উদ্ধৃতি দিয়ে নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ‘গণহত্যা’ হিসেবে প্রতিপন্ন করেছেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালও একটি ‘ক্লাসিফাইড মেমো’র উদ্ধৃতিতে লিখেছে, ‘ডিউ টু লেক অব প্রোগ্রেস অন মিটিগেটিং সিভিলিয়ান ক্যাজুয়ালিটিস’, অর্থাৎ কোনো ধরনের অগ্রগতি না হওয়ায় সাধারণ মানুষ হতাহত হচ্ছে।

বোধ করি, ইয়েমেনে বিদ্যমান এই যুদ্ধ পরিস্থিতিটি কলামিস্ট ক্যারেন আতিয়ার অজানা নয় এবং অজানা নয় বলেই লিখেছেন, ‘ইট ওয়াজ এ স্কুল বাস ফুল অব ইয়েমেনী চিলড্রেন’; পাশাপাশি ইয়েমেন প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট’। এছাড়া সৌদির কাতারের বিরুদ্ধে অবরোধ, লেবাননের প্রধানমন্ত্রী অপহরণ এবং কানাডার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদটিও উল্লেখ করেছেন। শেষে লিখেছেন, ‘কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একজন সাংবাদিকের কসাইপণা হত্যার বিষয়ে দৃষ্টি অন্যত্র ফেরানোটা চার্লটভিলে শ্বেতাঙ্গ উগ্রপন্থীদের হাতে শ্লীনতাহানির শিকারের প্রতি ট্রাম্পের উপহাসের চাইতেও হবে নিচুপ্রকৃতির। সে জন্য কংগ্রেসের উচিত এগিয়ে আসা, যাতে ইয়েমেনে রক্তপাতপূর্ণ নিষ্পেষণ ও শান্তির পক্ষের সমালোচকদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের ভয়ঙ্কর আচরণটি রুখে দেয়া যায়। তা না হলে খাসোগজির মৃত্যুর রক্তের দাগ আমেরিকার বিবেকের গায়ে জড়িয়ে থাকবে, যা সময় কিংবা সৌদির দাপটে অর্থ মুছে দিতে পারবে না।’ বিষয়টি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রণোদিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির জন্য ভাবনারই বটে! ই-মেইল : [email protected] সম্পাদনা : আলমগীর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ