প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মানুষ সবই বোঝে, তবে…

বিভুরঞ্জন সরকার : নির্বাচন নিয়ে মানুষ কি ভাবছে, কোন রাজনৈতিক দলের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থনের পাল্লা ভারী সেটা বোঝার জন্য ঢাকার বাইরে এসে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে কোনো স্পষ্ট ধারণা না পেলেও এটা আন্দাজ করা যাচ্ছে যে, নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা জমে না উঠলেও মানুষ কমবেশি জানে যে একটা ভোট আসছে। যারা মোটামুটি খবরাখবর রাখেন, খবরের কাগজ পড়েন, টিভি দেখেন, টকশো শোনেন, মোবাইল ব্যবহার করেন তাদের ভাবনা-চিন্তা এবং যারা এসবের বাইরে তাদের ভাবনা-চিন্তার মধ্যে পার্থক্য আছে, অমিল আছে।

বরিশাল প্রেসক্লাবে বসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে যে রকম তথ্য পাওয়া যায়, সাধারণ জটলায় অংশ নেওয়া মানুষের সঙ্গে কথা বললে শোনা যায় ভিন্ন কন্ঠস্বর। সাংবাদিকরা সবাই যে এক রকম কথা বলেন, এক রকম তথ্য দেন তা নয়। তারা রাজনৈতিকভাবে তুলনামূলক সচেতন, তাদের কাছে কিছু তথ্য আছে, কাজেই তাদের কথায় একটা বুদ্ধিদীপ্ত ভাব থাকে। আবার পথের ধারে কিছু একটা দেখে যারা জটলা করছেন তাদের কথাও হেলাফেলা করার নয়। কারণ তারাই সংখ্যায় বেশি। ভোটের সময় তাদেরই কদর বেশি।

ঢাকায় আমরা যেমন শুনি, রাজনৈতিক বিশ্লেকরা যেমন বিশ্লেষণ করেন তৃণমূল পর্যায়ে কথা বলে তার সঙ্গে অমিলই বেশি লক্ষ করা যায়। বরিশাল শহরে বিএনপির প্রভাব আগাগোড়া বেশি। ১৯৯১ সাল থেকে শুরু করে সব নির্বাচনেই এখানে বিএনপির প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ব্যতিক্রম ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি, কারণ বিএনপি ওই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। চরমোনাইয়ের পীরের কারণে বরিশাল শহরে ‘ইসলামি’ ভোটও একেবারে কম নেই। বিশ/পঁচিশ হাজার ভোট তারা পায়। কিন্তু শহরে আওয়ামী লীগের ভোট বাড়ছে, বেড়েছে, এটা এখন অনেকেই স্বীকার করেন। এখন আর চোখ বন্ধ করে এটা বলা যাবে না যে, বিএনপি বরিশাল শহরে জিতবেই। আওয়ামী লীগের ব্যাপারে নেতিবাচক প্রচারণা যেগুলো ছিলো, যেসব প্রচারণা মানুষকে বিভ্রান্ত করতো, সেসব এখন অনেকটাই দূর হয়েছে। যেমন আওয়ামী লীগ ধর্ম মানে না বা আওয়ামী লীগ ইসলামবিরোধী দল এসব আজগুবি কথা এখন গ্রামের মানুষও বিশ্বাস করে না। আওয়ামী লীগের টানা দশ বছরের শাসন মানুষের মন থেকে অনেক বিভ্রান্তি দূর করেছে বলে অনেকেই মনে করেন।

ইসলামি ভাবধারার দলগুলোর সঙ্গে কিংবা হেফাজতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ‘সমঝোতা’কে ভালো চোখে দেখছেন না এমন মানুষ যেমন আছেন, তেমনি এটা করায় ভোটের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ভালো করবে বলেও অনেকেই মনে করেন। গ্রামের মানুষ, যারা আগে আওয়ামী লীগের নাম শুনলে একটু মুখ বেজার করতো তারাও এখন মনে করতে শুরু করেছেন যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে সত্যি তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন এসেছে। তীব্র অভাব নেই। একেবারে খেতে না পাওয়া মানুষ এখন পাওয়া যায় না। তবে, আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে নিষ্ক্রিয় হওয়ায় অথবা নিজেরা নিজেদের মধ্যে কলহ-বিবাদে মেতে থাকায় সরকারের ইতিবাচক কাজের পক্ষে তেমন প্রচার নেই। মাঠ পর্যায়ে দল সক্রিয় হলে ভোটের ফলাফলও প্রভাবিত হবে।

সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপি জিতবে বলে রাজধানীতে যে ঢালাও প্রচারণা আমরা শুনি তারও সত্যতা বরিশালে খুব পাওয়া গেলো না। বিএনপি এবং জামায়াত সমর্থকরা এ ধরনের প্রচারণা চালায়। কেউ কেউ সেটা হয়তো বিশ্বাসও করে। তবে এ ধরনের ঢালাও মন্তব্য যুক্তি দিয়ে খন্ডন করার লোকও অনেক আছেন। যারা বলেন, কেন আমরা বিএনপিকে ভোট দেবো? মানুষের জন্য বিএনপি কি করেছে? বিএনপি কি সাধারণ মানুষের পক্ষে কোনো অবস্থান নিয়েছে? খালেদা জিয়া-তারেক জিয়ার স্বার্থ রক্ষার আন্দোলন ছাড়া বিএনপিকে জনগণের ইস্যু নিয়ে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি কি নিতে দেখা গেছে? দেশে ব্যাংক লুটপাটের ঘটনার প্রতিবাদে বিএনপি একদিন হরতাল দিলো না কেন? কারণ বিএনপিও লুটপাটেরই দল। আজ এরা লুটপাট করছে, কাল ওরা ক্ষমতায় যেতে পারলে এর চেয়ে বেশি লুটপাট করবে। তার অপেক্ষায়ই তো বিএনপি আছে, নাকি?

বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী সাদেক আব্দুল্লাহ বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন। অনেকে মনে করেন, ওটা কোনো ভোট হয়নি। একেবারেই একতরফা ভোট হয়েছে। সাদেক আব্দুল্লাহ নিজেও হয়তো লক্ষাধিক ভোটে জেতার কথা ভাবেননি। পরিস্থিতি ওই তাকে সেখানে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু বরিশাল সিটি করপোরেশনে খারাপ ভোট হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ বা সরকারকে ঢালাওভাবে দোষারোপ করা হচ্ছে তাও নয়। বরং বলা হচ্ছে, বিএনপি প্রার্থী মাঠ ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। বিএনপি মাঠে থাকলে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতো বলে অনেকেই মনে করছেন। তবে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন যদি ভালো হতো তাহলেও আওয়ামী লীগ প্রার্থীরই জয়ের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখছিলেন অনেকে। ভোটের ব্যবধান হয়তো কমতো, তারপরও সাদেক আব্দুল্লাহর দিকেই ঝুঁকে থাকতো পাল্লা। কারণ নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে তার একটি আলাদা পরিচিতি গড়ে উঠেছে। তার পারিবারিক পরিচিতি তার জন্য কতোটুকু ইতিবাচক তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তার ব্যক্তিগত অবস্থান হিসেবে না নিয়ে পারছেন না কেউ।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যদি একজন ভালো প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারে এবং আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংকট যদি তাকে পেছনে টানতে না থাকে তাহলে বিএনপি প্রার্থীর জন্য ‘চোখ বন্ধ করে জয়’ সম্ভব হবে না। মানুষ এখন সব কিছুই বোঝে। কার উদ্দেশ্য কী, সেটাও তাদের জানা। কাজেই বারবার ভুল বুঝিয়ে, চালাকি করে, এক রকম সাফল্য অর্জন কারো জন্যই সম্ভব নয়। বরিশালে আওয়ামী লীগ এগিয়েছে, তা নিয়ে কেউ সংশয় প্রকাশ করছেন না কিন্তু বিএনপি কতোটুকু পিছিয়িছে তা নিয়ে বিতর্ক আছে। চূড়ান্ত কথা বলার সময় এখনও হয়নি।

লেখক : গ্রুপ যুগ্ম-সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত