প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বহুমুখী সার্কাস পার্টি : নানা রঙের খেলা!

অসীম সাহা : নির্বাচন যতোই ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক দলগুলোর খেলা ততোই জমে উঠছে। খেলা মানে আওয়ামী লীগ বনাম জাতীয় যুক্তফ্রন্ট অর্থাৎ আসলে বিএনপি। বিএনপি এখন মৃদুমন্দ বাতাসের মতো চলাচল করছে। যেন তাদের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনই সব। তিনি যা বলবেন, তাই তারা বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নেবেন। যেন সীতানাথ বসাকের আদর্শলিপির স্মরণীয় পংক্তি ‘ঋষিবাক্য শিরোধার্য’তে তাদের সুমতি হয়েছে। কিন্তু বিএনপি যদি সত্যি তাই হতো, তা হলে কি দেশের জনগণকে এতো হুজ্জতি পোহাতে হতো? অবশ্য হুজ্জতি করা ছাড়া বিএনপির এখন উপায় নেই। গত নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ভুলে তাদের অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। আর প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি নির্বাচনে না আসায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এতে বোঝা গেছে, বিএনপি ছাড়া আওয়ামী লীগের খেলা জমবে না! তাই এবার আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই তৎপর, যাতে উভয়েই নির্বাচন করতে পারে। তবে বিএনপি ছাড়া ড. কামাল আর বাকি সব সার্কাস পার্টি মিললেও যে আওয়ামী লীগ বা ১৪ দলের সঙ্গে তারা যুদ্ধে জিততে পারবেন না, এটা কি ড. কামালের জানা নেই? তেমনি বিএনপিও জানে, তারা নানা কারণে ইতিহাসের কলঙ্কের দায় এড়াতে পারবেন না। ফলে দল হিসেবেও একা তারা নির্বাচনে জিততে পারবেন না! তাই ড. কামালের মতো একজন শিখণ্ডি তাদের দরকার ছিলো। কিন্তু বিস্ময়ের হলো এই যে, এই পড়ন্ত বেলায় এসে বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হয়েও ড. কামাল হোসেনের শিখণ্ডি হওয়ার দায়িত্ব নেয়া! কোন্ মিশন নিয়ে বা কী পাবার আশায় তিনি এটা করলেন, একমাত্র তিনিই বলতে পারবেন! অবশ্য এটা ঠিক, ড. কামাল হোসেন এটা জানেন, যে উদ্দেশ্য তিনি বাস্তাবায়ন করতে চান, তা তাঁর একার পক্ষে কিংবা তাঁর সঙ্গের সবগুলো সার্কাস পার্টি নিয়েও তা কোনোদিন করা সম্ভব নয়। তাই তিনিও বিএনপির সঙ্গে হাত মেলাতে কুণ্ঠাবোধ করেননি।

এটা তো ঠিক, বিএনপিকে যতোই অবহেলা করা হোক, তাদের রয়েছে এক বিশাল ভোটব্যাংক। আর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ২৪ দলের ২৩ দল ও ১৪ দলের ১৩ দল বা সার্কাস পার্টির সবগুলো মিলেও তার সিকিভাগের একভাগও নেই। তাদের না আছে অস্তিত্ব, না আছে লোকজন, না আছে ভোট, না আছে নমিনেশন পাওয়া বা দেয়ার যোগ্যতা। দুই নেত্রীর কাঁধে ভর দিয়ে তাদের সার্কাসের খেলা দেখাতে হয়। একটি সার্কাস পার্টিতে যতো লোক থাকে, এই সব নামসর্বস্ব দলে তাও নেই। অথচ কী বিশাল ২৪ দলের ঐক্য! একই কথা বলা যায় ১৪ দল সম্পর্কেও! যাদের বাপ-দাদা-চৌদ্দ গোষ্ঠীরও নাম-ঠিকানা কিছুই নেই, তারাও দলের হয়ে বা ফ্রন্টের হয়ে প্রতিপক্ষকে হুমকি দেন! এরচেয়ে কৌতুকপ্রদ খেলা জাতীয় কোনো সার্কাস পার্টিও দেখাতে পারবে না! বিএনপিতে খালেদা জিয়া আর আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনা ছাড়া বাকি সকলেই যে এক একটি সার্কাস পার্টির কিম্ভূতকিমাকার ক্লাউন, সেটা উভয় ফ্রণ্টই জানে। তাই খেলাটা মূলত হবে আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি দলের মধ্যে। আর বাকি যারা, তারা ছাগলের ৩নং বাচ্চার মতো শুধু লাফানো ছাড়া আর কিছুই করতে পারবেন না। তা হলে প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, দু’দলের দুই প্রধানই যদি নিয়ামকশক্তি হন তা হলে বাকিদের দরকার কী? আসলে কোনো দরকারই নেই। এরা জাহাজের খালাসিদের মতো। মালামাল ওঠানো-নামানো ছাড়া এদের কোনো কাজ নেই। কিন্তু বড় জাহাজের খালাসি হওয়ার গৌরবও তো কম নয়! তাই ন্যূনতম আত্মসম্মানবোধ থাকলে তারা পার্টির নাম করে সুবিধা নেয়ার বা ধান্ধাবাজির কাজ ছেড়ে আপন কাজে মন দিতেন। কিন্তু তারা তা করেন না কেন? তাদের এই প্রশ্ন করুন। দেখবেন, ফ্রন্টে বা দলে তাদের অনিবার্যতা সম্পর্কে আপনাকে একটা আস্ত মহাভারতে শুনিয়ে দেবে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো এই যে, আপনারা জানেন কিনা জানি না, তবে ২৪ দলের দু/তিনটে দল ছাড়া আর কারো নাম আমার জানা নেই। আমি নিশ্চিত, বেশির ভাগ মানুষেরই আমার মতো অবস্থা। ১৪ দলের ক্ষেত্রেও তাই। তা হলে এরা আছে কেন? এর উত্তরে একটা কথাই বলা যায়, কিছু আছে পরিযায়ী পাখির মতো। নির্বাচন হলেই সাইবেরিয়ার চেয়েও আরো দূরদেশ থেকে এরা খাবারের সন্ধানে চলে আসে। একটি করে দলের নাম রেখে অবৈধ টাকায় সাইনবোর্ড লাগিয়ে বিভিন্ন দলের মনোনয়ন চায় টাকার ও ট্যাকের জোর আছে বলে অনেক মনোনয়ন পেয়েও যায়। দু’দলেই পাল্লা দিয়ে একই ধরনের প্রক্রিয়া চলতে থাকে। তাতে আয়-রোজগার ভালোই হয়। মাত্র ২/৩ দিনে ৪/৫ কোটি টাকার মনোনয়নপত্র বিক্রি করার এমন লাভজনক ব্যবসা আর কিসে আছে?

আসলে জেনেশুনেই দুই বড় দল ক্লাউনদের নিয়ে খেলে। আর খেলা শেষ হলে তাদের অস্তিত্ব হয়তো বছরে টুকটাক মিছিল হলে টের পাওয়া যায়। আর কিছু থাকে ‘বিশেষ কোটা’। সেটার দিকেও কারো কারোর শকুনের মতো নজর থাকে। যদি ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনা কিংবা খালেদা জিয়া যিনিই হোন, তাঁদের নেকনজরে থাকেন, তা হলে ‘টেকনোক্রাট’ কোটার শিকে ছিঁড়লে নিরাপদে দায়হীন মন্ত্রিত্ব চালানোর মধুর মওকাও মেলে। অতএব ‘যতো নির্বাচন, ততোই মধুসেবন’-এর আদর্শই তাদের আদর্শ। নেত্রী বিপদে পড়লে মৌসুমী পাখিদের পাওয়া যাবে? খালেদা জিয়া জেলে। দেশে তার মুক্তির জন্যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে? না ওঠেনি। কারণ? একটাই, নির্বাচন। ড. কামালের কাঁধে ভর করে নির্বাচনে জিতে যদি সরকার গঠন করতে পারে, তা হলে খালেদাও মুক্তি পাবেন, তারেকও সসম্মানে দেশে ফিরে আসবেন। সরকার গঠনের প্রথম দিকে হয়তো ড. কামাল হোসেন রাষ্ট্রপতি হবেন। তারপর নিশ্চিত মতভেদ, পরে ছাত্রদলের দাবড়ানি এবং রেল লাইন ধরে ‘বদরু স্টাইলে’ দৌড়াতে না পেরে ড. কামালের মুখ থুবড়ে পড়া! দৃশ্যটা নিখুঁত জীবনশিল্পীর নিজ হাতে আঁকা! তবু ড. কামাল ঝুঁকি নিলেন। কারণ শেখ হাসিনার গণতন্ত্রে চলছে না, চাই বিএনপির গণতন্ত্র। আর তার জন্যে অনেকগুলো সার্কাস পার্টির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুর কৃপাধন্য কামাল হোসেন এখন বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকারকেই উপড়ে ফেলতে চাইছেন! আহা রাজনীতি, আহা পতিতবৃত্তি!

লেখক :কবি ও সংযুক্ত সময়, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ