প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভোটের মাঠে বাহারি প্রচার

ডেস্ক রিপোর্ট : মাইক যখন সুলভ ছিল না তখন নির্বাচন এবং রাজনৈতিক প্রচারে টিনের চোঙার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একবার একান্ত আলাপচারিতায় যুবলীগের কয়েকজন কর্মীকে বলেছিলেন, ‘আমি মারা গেলে আমার কবরে একটা টিনের চোঙ্গা রেখে দিস, লোকে জানবে এই একটা লোক একটা টিনের চোঙ্গা হাতে নিয়ে রাজনীতিতে এসেছিল এবং সারা জীবন সেই টিনের চোঙ্গায়—বাঙ্গালি, বাঙ্গালি চিৎকার করেই মারা গেল।’ আরো অনেকের মতো আওয়ামী লীগ নেতা লিয়াকত শিকদার এই উদ্ধৃতি তাঁর ফেসবুক ওয়ালে রেখে দিয়েছেন।

একসময় টিনের চোঙার দিন শেষ হয়ে আসে মাইকের ব্যাপক ব্যবহারে। ১৯৭১ সালে ঢাকার রেসকোর্সের জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচারে ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে মাইক কম্পানি কলরেডি। এরপর জিয়াউর রহমানের আমলে ঢাকায় ‘তাহের মাইক’ পরিচিতি লাভ করে। হাবিব মাইকও প্রতিযোগিতায় নামে। ঢাকার বাইরেও মাইকের ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। নির্বাচনী প্রচারণা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ এবং রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর জন্য আচরণবিধিমালায় মাইক ব্যবহার সংক্রান্ত বিধি-নিষেধ আরোপ হয়। বর্তমানেও এ বিধি-নিষেধ রয়েছে। মাইকের বাইরেও দেয়াল লিখন, পোস্টার, হ্যান্ডবিল, লিফলেট, গেট বা তোরণ নির্মাণ, প্যান্ডেল বা ক্যাম্প স্থাপন ও আলোকসজ্জা—এসব মাধ্যমেও নির্বাচনী প্রচারে বিধি-নিষেধ রয়েছে। জনসভা কোথায়, কখন করা যাবে তাও বলা হয়েছে আচারণবিধিমালায়। কিন্তু প্রযুক্তিগত ব্যাপক উন্নয়নের পথ ধরে ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক মাধ্যমে যে ব্যাপক প্রচার এবং অপপ্রচার তা নিয়ন্ত্রণে নির্বাচন কমিশনের কোনো আইন বা নীতিমালা নেই।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বেআইনি প্রচারসামগ্রী অপসারণে যখন নির্বাচন কমিশন হিমশিম খাচ্ছে, তখন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ফেসবুক, টুইটার, ভাইবার, স্কাইপসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা তুঙ্গে। উসকানিমূলক বক্তব্য, প্রতিদ্বন্দ্বী সম্ভাব্য প্রার্থী বা প্রতিপক্ষ দলের চরিত্র হরণও চলছে। গত বৃহস্পতিবার নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সভায় এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় ফেসবুকে যেভাবে গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর অপচেষ্টা হয়েছিল, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে এবারের নির্বাচনে তেমন ঘটনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। জবাবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকারের সাইবার ক্রাইম ইউনিট এ নিয়ে কাজ করছে।

যে ধরনের প্রচার চলছে : ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অনলাইন যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক আগে থেকেই সক্রিয়। ‘নৌকায় ভোট দিন’ বা ‘আমার মার্কা নৌকা’ শিরোনামে শতাধিক ফেসবুক পেজে দলটির নির্বাচনী প্রচারণা চালু রয়েছে। নির্বাচনে দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের অসংখ্য ফেসবুক পেজে শোভা পাচ্ছে পোস্টারের ছবি, স্লোগান ও প্রচারণামূলক ভিডিও।

বিএনপিও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। ‘ধানের শীষে ভোট দিন’, ‘…ভাইয়ের সালাম নিন, ধানের শীষে ভোট দিন’—এ রকম স্লোগান নিয়ে দলটির দেশি-বিদেশি শাখার নামে ফেসবুক, টুইটারে সক্রিয় এ দলের নেতা, কর্মী ও সমর্থকরা। ‘লাঙ্গলে ভোট দিন’—এ রকম পেজেও প্রচার চলছে। বাজছে নির্বাচনী গান। বিকল্পধারা বাংলাদেশের একটি পেজে ‘কাম অ্যান্ড জয়েন আস টু ডে’ আহ্বান জানিয়ে বলা হচ্ছে, ‘লেটস চেঞ্জেস টুগেদার’। ১৪ দল, ২০ দল, মহাজোট, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট—এদের নামে পেজও সক্রিয়। নির্বাচনী প্রচারের সঙ্গে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, গালাগালিতেও কোনো পক্ষই পিছিয়ে নেই।

এই পরিস্থিতে সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগামী ২৬ নভেম্বর এ বিষয়ে আমরা সব মোবাইল ফোন অপারেটরসহ বিটিআরসি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে বসব। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে কেউ যাতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা না চালাতে পারে তার জন্য কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হবে।’

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার এ বিষয়ে বলেন, ‘নির্বাচনসংক্রান্ত প্রচার-প্রচারণা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচনের সময় কমিশন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা দিলে আমরা তা পালনের চেষ্টা করব।‘ এ বিষয়ে সক্ষমতা সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, ‘দেশের ভেতরে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আমাদের রয়েছে।’ তবে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জহুরুল হক তা মনে করেন না। তিনি বলেন, ‘ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো আমরা সেভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। ফেসবুক, গুগল—এরা বিটিআরসির অনুরোধ রাখতে বাধ্য নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো কন্ট্রাক্টও তাদের নেই। তবে বিটিআরসি অনুরোধ করলে তারা তাদের পলিসির মধ্যে থেকে কিছু অনুরোধ রক্ষা করে। বাংলাদেশে ফেসবুকের গ্রাহক তিন কোটির মতো। গ্রাকদের স্বার্থই ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে বেশি প্রাধান্য পায়।’

প্রচারে নিষেধাজ্ঞা ও বাস্তবতা : ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রণীত রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণবিধিমালায় নির্বাচনপূর্ব সময়ের ব্যাখ্যায় বলা ছিল, ‘সাধারণ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংসদের মেয়াদ উত্তীর্ণ কিংবা সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর থেকে পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেট প্রকাশের তারিখ পর্যন্ত সময়।’ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচনের জন্য এই সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় সংসদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের বিধান ছিল এবং ওই ৯০ দিন ‘নির্বাচনপূর্ব সময়’। এ সময়সীমায় রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য নির্বাচন কমিশন আচরণবিধিমালার বিধান প্রয়োগ করতে পারে এবং বিধিমালার কোনো বিধির লঙ্ঘন শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। ভোটগ্রহণের নির্ধারিত তিন সপ্তাহের আগে কোনো প্রকার নির্বাচনী প্রচার চালানোও ছিল দণ্ডনীয় অপরাধ।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে কারো কারো ধারণা, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুসরণ করেও ৯০ দিনের নির্বাচনপূর্ব সময় নির্ধারণ করা যেত। সংসদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পরের ৯০ দিনের পরিবর্তে আগের ৯০ দিনকে নির্বাচনপূর্ব সময়ের আওতায় আনাতে কোনো অসুবিধা ছিল না। কিন্তু দশম সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কাজী রকিবের নির্বাচন কমিশন এই সময় কমিয়ে আনে। আচরণবিধিমালায় নির্বাচনপূর্ব সময়ের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়, ‘নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনী ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রকাশের তারিখ পর্যন্ত সময়।’ এ বাস্তবতায় নির্বাচনপূর্ব সময় ৯০ দিন থেকে কমে ৪৫-৫০ দিনে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণার জন্য নির্ধারিত সময় আগের মতোই মাত্র ২১ দিন। আবার এই ২১ দিনের মধ্যে ভোটগ্রহণের দিন এবং এর আগের ৩৮ ঘণ্টা জনসভা, মিছিল, শোভাযাত্রা করা যাবে না। ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রের চৌহদ্দির মধ্যে কারো জন্য ভোট চাওয়া যাবে না বা ভোট না দেওয়ার জন্য কাউকে প্ররোচিত করা যাবে না। এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার জন্য অর্থদণ্ডসহ ছয় মাস থেকে তিন বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনে কালো টাকা ও পেশিশক্তির ব্যবহার রোধ করে সবার জন্য সমান ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্যই এসব বিধি-বিধান। কিন্তু বাস্তবে অনুমোদিত ওই ২১ দিন নয়, অনেক আগে থেকেই প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়ে যাচ্ছে। সারা দেশে ভোট চেয়ে ব্যানার, বিলবোর্ড, পোস্টার, ফেস্টুন গেট বা তোরণের ছড়াছড়ি দেখা গেছে তফসিল ঘোষণার অনেক আগে থেকে। নির্বাচনপূর্ব সময় শুরু না হওয়ার কারণে অগ্রিম এ প্রচারের ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থাও নিতে পারছে না নির্বাচন কমিশন। আবার তফসিল ঘোষণার পরও কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে এ ধরনের প্রচারসামগ্রী অপসারণের জন্য নির্বাচন কমিশন সময় দিচ্ছে। দশম সংসদ নির্বাচনের আগে এ বিষয়ে সময় দেওয়া হয়েছিল তফসিল ঘোষণার পর চার দিন। আর এবার তফসিল ঘোষণার পর প্রথমে সাত দিন এবং পরে আরো তিন দিন। কিন্তু এসব ব্যানার, বিলবোর্ড, পোস্টার ও ফেস্টুনের বাইরে অনলাইনভিত্তিক প্রচার থেমে নেই।

ইসির নিষ্ফল উদ্যোগ : নির্বাচন কমিশনের আইন ও বিধিমালা সংস্কার কমিটির একজন সদস্য এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘গত জুন মাসে অনুষ্ঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে আমাদের কমিটি অনলাইনভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণায় নিয়ন্ত্রণ আরোপের চিন্তাভাবনা করেছিল। সে সময় শুধু সিটি করপোরশন নির্বাচন নয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ফেসবুক, টুইটার, ভাইবারসহ সামাজিক যোগাযো গমাধ্যমে কোনো প্রার্থী বা সমর্থক বা রাজনৈতিক দল কোনো প্রচারণা চালাতে পারবে মর্মে একটি বিধান নির্বাচনী আচরণবিধিমালায় সংযোজন করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হয়। ওই সময় মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে কমিটির বৈঠকও হয়। কিন্তু কিভাবে এটি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, কোন প্রতিষ্ঠান করবে, দেশের বাইরে থেকে প্রচার-প্রচারণা চালানো হলে কিভাবে তা বন্ধ করা সম্ভব হবে—এসব বিষয়ে ইতিবাচক কোনো সিদ্ধান্তে আসা যায়নি। এ ছাড়া কেউ ছদ্মনামে এ ধরনের প্রচার বা অপপ্রচার চালালে তাকে চিহ্নিত করার মতো কারিগরি সামর্থ্য কিভাবে অর্জন সম্ভব হবে, তা নিয়েও প্রশ্নও ওঠে। ফলে ওই চিন্তাভাবনা বাদ দেওয়া হয়। এর আগে ২০১৩ সালে দশম সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের একই ধরনের চিন্তাভাবনা সফলতা পায়নি। সূত্র: কালের কন্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ