প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আ. লীগ-বিএনপিতে সমান কোন্দল

কালের কন্ঠ : ঢাকা-৫ আসনে আওয়ামী লীগ-বিএনপিতে কোন্দল সমানতালে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়নপত্র কিনেছেন ছয়জন। বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীও ছয়জন। আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি প্রবীণ নেতা হাবিবুর রহমান মোল্লা আসন্ন সংসদ নির্বাচনে আবারও নৌকার মাঝি হচ্ছেন—এমন কথা এলাকায় চাউর থাকলেও বিএনপির ক্ষেত্রে শোনা যাচ্ছে ভিন্ন কথা। গুজব রয়েছে, এ আসনে বিএনপির কেউ মনোনয়ন পাচ্ছেন না। আসনটি ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে গণফোরামকে। আবার আওয়ামী লীগের গৃহবিবাদ পুঁজি করে এরশাদ আসনটি পেতে সামনে তুলে ধরছেন জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা মীর আবদুস সবুর আসুদের নাম।

ডেমরা এলাকার বিএনপির সমর্থক কবির আহমেদ মনে করেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হলে নীরব ভোটে জয় পাবে বিএনপি। তিনি বলেন, ‘এলাকায় এখনো বিএনপির কর্মীরা ছিন্নভিন্ন হয়ে আছে। সংগঠিত হয়ে কিভাবে নির্বাচনী মাঠে নামবে—এটি চিন্তার বিষয়।’

অন্যদিকে মাতুয়াইলের আওয়ামী লীগ কর্মী সরোয়ার হোসেন জানান, আওয়ামী লীগের বড় পুঁজি শেখ হাসিনার উন্নয়ন, দেশের অগ্রগতি। তিনি মনে করেন, প্রার্থিতা ঘোষণার পর আওয়ামী লীগে কোনো বিভক্তি থাকবে না। তবে তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে যাত্রাবাড়ীর আওয়ামী লীগ কর্মী আবুল হোসেন বলেন, ‘গত ১০ বছরে দলের বঞ্চিত নেতাকর্মীদের নির্বাচনী মাঠে নামানো চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।’

রাজধানীর ডেমরা, যাত্রাবাড়ী থানা ও কদমতলী থানার তিনটি ওয়ার্ড নিয়ে ঢাকা-৫ আসন। এই আসনে মোট ভোটার চার লাখ ৫০ হাজার ৭২৫ জন। ২০০৮ সালে এ আসনে মহাজোটের প্রার্থী ছিলেন জাতীয় পার্টির সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা। তিনি লড়েছিলেন লাঙল প্রতীক নিয়ে। আওয়ামী লীগের ঘোষিত দলীয় প্রার্থী ছিলেন হাবিবুর রহমান মোল্লা। নির্বাচনে তিনি জয়লাভ করেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন হাবিবুর রহমান মোল্লা।

কিন্তু এলাকায় হাইব্রিডদের লালন, ছেলেদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড, দলে নতুন মুখদের বেপরোয়া চাঁদাবাজি—এমন নানা কারণে এলাকায় বিতর্কিত হয়ে পড়েন হাবিবুর রহমান মোল্লা। ২০০৮ সালে তিনি কারাগার থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা হারুনার রশিদ মুন্না, রফিকুল ইসলাম মাসুদ, কাজী মনিরুল ইসলাম মনুসহ সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা এক কাতারে এসে হাবিবুর রহমান মোল্লাকে জয়ী করেন। নির্বাচিত হওয়ার পর এসব নেতাকর্মীর সঙ্গে হাবিবুর রহমান মোল্লার দূরত্ব বাড়তে থাকে। একসময় হাবিবুর রহমান মোল্লার ঘনিষ্ঠজনরাই তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে দলীয় প্রার্থী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়নপত্র কিনেছেন বর্তমান এমপি হাবিবুর রহমান মোল্লা, যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি হারুনার রশিদ মুন্না, ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম মাসুদ, ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান মোল্লার বড় ছেলে মশিউর রহমান মোল্লা সজল, যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী মনিরুল ইসলাম মনু ও এশিয়ান টিভির মালিক হারুনার রশিদ।

হাবিবুর রহমান মোল্লা বয়েসের ভারে ন্যুব্জ। অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরা সবাই একসময় তাঁর ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এলাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাবিবুর রহমান মোল্লা ছাড়াও এ আসনে তিনজন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছেন হারুনার রশিদ মুন্না, রফিকুল ইসলাম মাসুদ ও মোল্লার ছেলে মশিউর রহমান সজল। হাবিবুর রহমান মোল্লা এলাকায় এঁদের সবার মুরব্বি হিসেবে পরিচিত।

হাবিবুর রহমান মোল্লাকে মনোনয়ন দেওয়া হলে অন্যদের সহজে নিবৃত্ত করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন এলাকায় নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগ সমর্থক একজন অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক।

হারুনার রশিদ মুন্নার সমর্থক যাত্রাবাড়ীর আওয়ামী লীগ কর্মী ফরহাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মুন্না আওয়ামী লীগের একজন নিবেদিত প্রাণ নেতা। বিএনপি আমলে বেশির ভাগ সময় তাঁকে কারাগারে থাকতে হয়েছে। একজন দক্ষ সংগঠক তিনি। এলাকায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হলে নিশ্চিতভাবে আসনটি আওয়ামী লীগ পাবে।’

অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম মাসুদের সমর্থক সারুলিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা, শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রফিকুল ইসলাম মাসুদের চাচা হেদায়েতুল ইসলাম ১৯৭০ সালে এ আসনের এমপি ছিলেন। মাসুদ এলাকায় ক্লিন ইমেজের নেতা। তিনি প্রার্থী হলে দলমত নির্বিশেষে মানুষ তাঁকে ভোট দেবে। এলাকায় তিনি পরোপকারী মানুষ হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া এলাকার তরুণ সমাজের ভোট আদায় করা একমাত্র মাসুদের পক্ষেই সম্ভব।’

মশিউর রহমান মোল্লা সজল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হাবিবুর রহমান মোল্লার জয়লাভে কোনো সমস্যা হবে না। তিনি এলাকার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মুরব্বি। নির্বাচনী এলাকার আদি বাসিন্দা হিসেবে এলাকায় বংশের ও নিকট আত্মীয়দের একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটব্যাংক আছে। এ ছাড়া এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নকাজ হয়েছে। অবাধ, সুষ্ঠু ভোট হলে তিনি জয় পাবেন। এদিকে বিএনপির দলীয় মনোনয়নপত্র কিনেছেন সাবেক এমপি সালাউদ্দিন আহমেদ, যাত্রাবাড়ী থানা বিএনপির সভাপতি নবী উল্লাহ নবী, যাত্রাবাড়ী থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর বাদল সরদার, দনিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জুম্মন, মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন ও বিএনপি ঢাকা দক্ষিণের যুগ্ম সম্পাদক আতিকুল ইসলাম নান্টু।

সাবেক এমপি সালাউদ্দিন ও নবী উল্লাহ নবীর দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। দুজনের সম্পর্ক সাপে-নেউলে। একজন আরেকজনের প্রকাশ্য সমালোচক।

নবী উল্লাহ নবীর সমর্থক ডেমরা এলাকার বিএনপি কর্মী ফজলুল হক বলেন, ‘নবী উল্লাহ নবীকে বারবার বঞ্চিত করা হয়েছে। এবার জয় পেতে হলে তাঁকেই বিএনপির মনোনয়ন দেওয়া উচিত।’ সালাউদ্দিন আহমেদের সমর্থক শ্যামপুর এলাকার বিএনপি কর্মী নুরে আলম বলেন, ‘এ আসনে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও ভোটে জিতে আসার মতো একমাত্র প্রার্থী সালাউদ্দিন।’

বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী যাত্রাবাড়ী থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বাদল সরদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ আসনে বিএনপি থেকে জয় পাওয়ার মতো প্রার্থী আমি একাই। আমি এলাকার আদি বাসিন্দা। এখন কাউন্সিলর আছি। আগেও কাউন্সিলর ছিলাম। এলাকায় আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।’

একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির প্রার্থী বাদ দিয়ে এ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি আডভোকেট সুব্রত চৌধুরীকে। সূত্রটি জানায়, সুব্রত চৌধুরীর বাড়ি এবং অলি আহমদের বাড়ি চট্টগ্রামের একই আসনে। সুব্রত চৌধুরী নিজেই চট্টগ্রামের আসন ছেড়ে ঢাকা-৫ আসনে নির্বাচন করার কথা বিএনপি নেতাদের জানিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত আসনটি সুব্রত চৌধুরীকে দেওয়া হতে পারে।

আবার আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধ কাজে লাগিয়ে এরশাদ আসনটি দাবি করছেন জাতীয় পার্টি ঢাকা দক্ষিণের সভাপতি মীর আবদুস সবুর আসুদের জন্য।

সরেজমিনে এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিএনপির অধিকাংশ নেতা এলাকার বাইরে। অনেকের নামে মামলা। নতুন মামলা ও গ্রেপ্তার আতঙ্কে ভুগছেন নেতারা। বেশির ভাগ নেতাকর্মী মোবাইলে নতুন নম্বর ব্যবহার করছে। অনেকের মোবাইলও বন্ধ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ