প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সুবিধাভোগীদের এবার দেওয়ার পালা

নঈম নিজাম : চট্টগ্রামের সীমান্ত তালুকদার সাহসী এক রাজনৈতিক কর্মী। নব্বইয়ের দশকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। গভীরভাবে রাজনীতি করতেন চট্টগ্রামের রাজনৈতিক নেতা আ জ ম নাছিরের সঙ্গে। নাছির ভাই তারুণ্যের কাছে তখন অন্যরকম উচ্চতায়। ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দলীয় কোন্দলে ঢাকায় আটক হলেন আ জ ম নাছির উদ্দিন। তখন সাংগঠনিক কোনো পদ ছিল না তার। কিন্তু ছিল বিশাল কর্মী সমর্থন। তার অনুসারীর সংখ্যা ছিল বিশাল। সীমান্ত তাদের একজন। আ জ ম নাছিরের আটকের বিষয়টি তার বিশাল কর্মী ছাত্রলীগ-যুবলীগ সমর্থকরা ভালোভাবে নেননি। তারা প্রতিবাদের সিদ্ধান্ত নেন। শাহজাদা মহিউদ্দিন আমার বাসায় ফোন করে জানালেন, নাছির ভাই রমনা থানায়। আমাকে জানাতে বলেছেন। যুবলীগ নেতা লিয়াকত হোসেনকে নিয়ে গেলাম রমনা থানায়। ওসির রুমে নাছির ভাই বসে আছেন। ছাত্রলীগের প্রথম সারির নেতা শাহজাদা মহিউদ্দিনও বসে আছেন। আমি গিয়ে তার পাশে বসলাম।

 

খাবার আনতে নির্দেশ দিলেন লিয়াকত ভাই। এর মাঝে মহিউদ্দিন আমাকে ফোনে মিলিয়ে দিলেন সীমান্তকে। ঝরঝর করে কাঁদছেন আবেগে আপ্লুত সীমান্ত। আমি তাকে বললাম, কান্নার কিছু নেই। সীমান্ত বললেন, শুধু অশ্রু নয়, আমরা প্রতিবাদ করব। পাশে দাঁড়ানো মহিউদ্দিন। তারও একই মত। সীমান্তের সাংগঠনিক দক্ষতার প্রমাণ দেখলাম। আ জ ম নাছিরের গ্রেফতারের প্রতিবাদে চট্টগ্রামে তীব্র প্রতিবাদ হয়। আর সীমান্ত মহিউদ্দিন চৌধুরীর সামনে গিয়েও শোডাউন করেন। ২০০১ সালের পর সীমান্তের সঙ্গে মাঝে মাঝে কথা হতো। তারপর অনেক দিন যোগাযোগ নেই। আমি ব্যস্ত পেশাগত কাজে। মাঝে একদিন ফোনে কথা বললেন। জানতে চাইলাম, নাছির ভাইয়ের সঙ্গে তার গ্যাপ কেন হলো? সীমান্ত বললেন, দাদা একদিন ঢাকায় এসে আপনার সঙ্গে বসব। বলব অনেক কথা। সীমান্ত আর আসেননি। দুই দিন আগে ফেসবুকে সীমান্তের লেখা একটি স্ট্যাটাস আমার নজর কেড়েছে। ফেসবুকে সীমান্ত লিখেছেন, ‘সত্যিকারের ত্যাগী কর্মী কখনো নিজের অপ্রাপ্তির বেদনায় দলের বিরোধিতা করে না। দলের যারা অবমূল্যায়নের বেদনায় কাতর, তারা প্রাপ্তির হিসাবটা মিলিয়ে নিন। জনক হত্যার বিচার পেয়েছি, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দেখেছি, উন্নত স্বদেশের পথে হাঁটছি। আদর্শের সৈনিকরা এসব পাওয়ার জন্যই তো রাজনীতি করেছে। পদ-পদবি নাই বা পেলাম, দল বেচে নাই বা খেলাম।

 

নিজের যোগ্যতায় জীবনযাপনের গর্বটাও তো প্রাপ্তি। আদর্শিক কর্মী লুটেরাদের হিংসে করে না, ঘৃণা করে।’ ভাই সীমান্ত তোমার সঙ্গে একমত। তবে এটুকুই বলছি, যারা শুধু নিয়েছেন, পেয়েছেন, ভোগ-উপভোগ করেছেন তাদেরও হিসাব দেওয়ার পালা আগামী দুই মাস। ত্যাগী কর্মীরা সবসময় দলের জন্য অবিচল থাকে। কিন্তু গত ১০ বছর অনেক দেখেছি। সামাজিক অনুষ্ঠানে বাহারি মুজিবকোটের ঢল দেখেছি। পাঁচ বোতাম আর ছয় বোতামের বিষয়টিও তারা জানে না। টকশোতে নিত্যনতুন আজগুবি কথা শুনেছি। ২০১৪ সালে নিত্যনতুনদের হঠাৎ অভিভাবক সাজার প্রবণতা দেখেছি। হঠাৎ বিশাল অর্থবিত্তের মালিক বনতে দেখেছি। এমপি সেজে দলীয় কর্মীদের ওপর হামলা, মামলার উৎসব দেখেছি। আগামী দিনগুলো শুধু বঞ্চিতদের নয়, চাওয়া-পাওয়ার রেকর্ড সৃষ্টিকারীদের জন্যও পরীক্ষার। যারা শুধু নিয়েছেন তাদেরও এখন দেওয়ার সময়। ভোটের লড়াইয়ে সারা জীবন শুধু সীমান্তরা লড়াই করবেন না। সীমান্তদের পাশে ভোগবাদীদেরও দেখতে চাই। কড়ায় গন্ডায় হিসাব দিতে হবে তাদেরও।

প্রিয় সীমান্ত! আদর্শের রাজনীতি নিয়ে এখন কেউ ভাবে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এখন অনেকের মুখের বুলি। এই রাজনীতি আমরা চাই না। আমরা রাজনীতির স্বচ্ছতা দেখতে চাই। জাতির জনকের আদর্শিক চিন্তার সত্যিকারের বাস্তবায়ন চাই। মাঠে-ময়দানে আগামীতে ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন চাই। ভোটারদের মনের ভাষা বুঝতে পারে তাদের দেখতে চাই। এ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহচর তাজউদ্দীন আহমদের একটি কথা রয়েছে রাজনীতির স্বচ্ছতা নিয়ে। তিনি বলেছেন, ‘আমি এটাই দেখতে চাই যে, একজন সৎ রাজনৈতিক কর্মী কোনোরকম অন্যায় বা কোনোরকম দুর্নীতি বা কোনোরকম স্বজনপ্রীতি, তোষণবাদ এগুলো না করে শুধু নিজের কাজ, নিজের চরিত্র এবং নিজের জনসংযোগের মাধ্যমে রাজনীতিতে সার্থক হতে পারে আমি এ জিনিসটা দেখতে চাই। নির্বাচন বা রাজনীতির পদ দখল করতে আমার টাকাপয়সা খরচ করার কোনো প্রয়োজন নেই। আর আমার সেই প্রবৃত্তিও নেই। আমি নিজের দেশের লোকের জন্য নিজের হয়ে খেটে, নিজের চারিত্রিক সততা দিয়ে, নিজের জনসংযোগবলে নির্বাচিত হয়ে আসতে পারি কিনা এটাই আমি দেখতে চাই এবং নিজের কাছে সেটা প্রমাণ করতে চাই।’ তাজউদ্দীনের এ বক্তব্য এখন কেউ পড়েন কিনা জানি না।

 

ইতিহাসের অনেক কিছুই এখন হারিয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীরও মূল্য এখন অনেকের কাছে নেই। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী পড়লে আওয়ামী লীগের সত্যিকারের কর্মী হতে আর কিছু লাগে না। স্বচ্ছতা তখনই চলে আসে। কিন্তু এখন কে কার কথা শুনবে? নেতা-কর্মীদের বিবাদ-বিরোধ না মেটাতে পারলে গভীর সংকট তৈরি হবে পদে পদে। কেন এত বিরোধ? আদর্শিক নয়, এ বিরোধ ক্ষমতার, ব্যবসার, পরস্পরকে ঠেকানোর। এ নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমাদের বাঙালিদের মধ্যে দুটো দিক আছে। একটা হলো আমরা মুসলমান, আর একটা হলো আমরা বাঙালি। পরশ্রীকাতরতা আর বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে। বোধহয় দুনিয়ার কোনো ভাষায়ই এ কথাটা পাওয়া যাবে না, “পরশ্রীকাতরতা”। পরের শ্রী দেখে যে কাতর হয় তাকে “পরশ্রীকাতর” বলে। ঈর্ষা, দ্বেষ সব ভাষায়ই পাবেন, সব জাতির মধ্যেই কিছু কিছু আছে, কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে আছে পরশ্রীকাতরতা। ভাই ভাইয়ের উন্নতি দেখলে খুশি হয় না। এই জন্যই বাঙালি জাতির সব রকম গুণ থাকা সত্ত্বেও জীবনভর অন্যের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে।’

আগামী দুই মাস অনেক কিছু দেখার মাস। অনেকের চেহারা বেরিয়ে আসবে। সীমান্তদের নিয়ে সমস্যা নেই। সমস্যা তাদের নিয়ে যারা শুধুই দল ও সরকারে সুবিধা নিয়েছেন। এখন তারা ভাব বুঝে কাজ করবেন। নিজের খারাপটা কেউই দেখেন না। ভোটের সময় সবকিছু বেরিয়ে আসে। অন্য সময় নিজের খারাপটা কেউই দেখেন না। দেখলে নিজের দলের কর্মীকে শিবির সাজিয়ে কারাগারে দিতে পারেন না। এ নিয়ে আবরাহাম লিঙ্কন বলেছেন, ‘কোনো মানুষের পক্ষে নিজের বিষয় লিখতে যাওয়া যেমন সুখকর, তেমনি কঠিন। নিজের কোনো অকীর্তির কথা বলতে গেলে বুকে যেমন বাজে, তেমনি আত্মপ্রশংসাও কর্ণপীড়াদায়ক।’ আমাদের এখানে সবাই শুধু নিজের প্রশংসা শুনতে চায়। নিজের ব্যর্থতা কারও সামনে আসে না। সেদিন এক অনুষ্ঠানে এক সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমানের এমপির সঙ্গে দেখা। আরও অনেকে ছিলেন।

 

দেখলাম, অনেক বড় বড় কথা বলছেন। এই এমপি দলে ঠাঁই দিয়েছেন জামায়াতকে। শুধু তাই নয়, তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। এ নিয়ে খবর প্রকাশের কারণে আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন অনেক। আগে দেখা হলে কথা বলতেন না। এবার বললেন। তাই আমিও বললাম, ভাই! আমার বিরুদ্ধে মামলাগুলো আর কত দিন চালাবেন? জবাবে তিনি শুধুই হাসলেন। এই হাসি রহস্যময়। আমি আবার বললাম, সংবাদ করলাম আপনার বিরুদ্ধে। মানহানির মামলার বাদী আরেকজন। মামলাটা নিজেও করতে পারতেন। একসঙ্গে আদালতে যেতাম। সমস্যা কী? এমপি সাহেব বললেন, ভোটের পর কথা হবে। এই হচ্ছে রাজনীতি।

কুমিল্লা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান মিঠুকে ফোনে জানতে চাইলাম, লাকসাম ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমানে যুবলীগের যে নেতা এমপির রোষানলে পড়ে এখন কারাগারে তার কি মুক্তির কিছু হলো? মিঠু জানাল, না। আমারও বলার কিছু নেই। একজন রাজনৈতিক কর্মী মর্যাদার জন্য রাজনীতি করে। তাকে শিবির বানিয়ে দল ও পরিবারের কাছে ছোট করা হলো। এর প্রভাব কি ভোটে পড়বে না? ভোটের সময় এসব কাজ কেউ করে? শুধু লাকসাম নয়, অনেক আসনেও এখনো অনেক কান্ডা চলছে। যার কোনো আগামাথা নেই। এহছানুল হক মিলনকে আদালতে হাজিরা দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে নাটকীয় কায়দায় আটক করে অধিক প্রচারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। মিলনের সঙ্গে যা করা হলো, তাতে ভোটারের কাছে ভুল বার্তা যাওয়াটাই স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বলছি, ভোটারদের কাছে যান। আপনাদের ইমেজ নয়, নেত্রীর গত ১০ বছরের বিশাল অর্জন সামনে নিয়ে আসুন। জাতির জনকের আদর্শ ও শেখ হাসিনার বিশাল সাফল্য তুলে ধরুন তারুণ্যের কাছে। শেখ হাসিনা ১০ বছরে অনেক করেছেন এ দেশের মানুষের জন্য। বাস্তবতায় থেকে ভোটারদের কাছে তা জানান। চাটুকারদের পাল্লায় পড়ে হিংসার পথে এখন গেলে সমস্যা তৈরি হবে। চামচিকাদের পাল্লায় পড়লে সর্বনাশ হবে। সবকিছু ২০১৪ সালের মতো বিবেচনায় নিলে চলবে না। কারচুপি করতে হলেও কর্মী-সমর্থক দরকার। চাটুকারদের পাল্লায় পড়ে নিজের দলের ত্যাগীদের ভুলে যাবেন না। চাটুকার আর চামচিকা দুটি শব্দ থেকে দূরে থাকতে পারলে মানুষের জীবন স্বাভাবিক থাকে।

চামচিকা নিয়ে জওহরলাল নেহেরুর আত্মজীবনীর কিছু কথা মনে পড়ছে। কলকাতা কারাগারে থাকার সময় অনেক সমস্যার মাঝে আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ না খাওয়াতে পারার কথাও রয়েছে তার আত্মজীবনীতে। তবে চামচিকার উপদ্রবে পড়েন দেরাদুন কারাগারে থাকার সয়য়। সেই সমস্যা নিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘চামচিকা আমি পছন্দ করতাম না, কিন্তু আমাকে তাদের সহ্য করতে হতো। সন্ধ্যাকাশে তারা নিঃশব্দে উড়ত এবং প্রায়ান্ধকার আকাশে তাদের ছায়ার মতো দেখা যেত। কী ভীতি-উদ্দীপক প্রাণী, দেখলে আমার গা ছমছম করে। মনে হয় যেন ওরা আমার মুখ ছুঁয়ে উড়ে গেল, আঘাত করবে, ভয়ে আমি শিউরে উঠি। বহুদূর ঊর্ধ্বে বড় বড় বাদুড় উড়ে যেত।’ আমাদের রাজনীতিতে চামচিকারা সবসময় ওড়ে। বিশেষ করে গত ১০ বছরে তাদের বাড়াবাড়ি ছিল অনেক। এখনো আমি চামচিকাদের আনাগোনা আর দাপটই বেশি দেখি। আদর্শের কথা বলে সবাই সামনে আসে। কথার ফুলঝুরির বন্যা বইয়ে দেয়। কিন্তু সমস্যায় পড়লে এই চামচিকাদের আর দেখা যায় না। তলে তলে সর্বনাশ করে তারা কেটে পড়ে। এ সর্বনাশ সামাল দিতে পরে কঠিন অবস্থা তৈরি হয়। ভোটের আগে সবকিছুর থাকে এক চিত্র। ভোট এলে জটিলতা নিয়েই সামনে যেতে হয়। তখন বোঝা যায় কে আপন কে পর।

এই পরিবেশ সামাল দিতে পারেন সত্যিকারের রাজনীতিবিদরা। যারা মানুষের হৃদয়ের কথা জেনে নেন। পড়ে ফেলেন সবকিছু। প্রিয় সীমান্ত! অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালন করে বঙ্গবন্ধুর স্বাপ্নিক বাংলাদেশের পথে আমাদের হাঁটতে হবে। আশার আলোকে জিইয়ে রাখতে হবে সুন্দর আগামীর জন্য। হিসাব-নিকাশ কখনই মেলেনি, মিলবে না। তবু আদর্শকে বুকে লালন করে বার বার পরীক্ষা দিতে হবে। সত্যিকারের রাজনৈতিক কর্মীরা তাই করে। তারা আদর্শকে বদলায় না। নিজে পুড়ে যায় তুষের অনলের মতো। তবু আত্মসম্মানবোধ ধরে রাখে। চাওয়া-পাওয়ার হিসাব একপর্যায়ে গিয়ে আর মেলায় না। হৃদয় থেকে গজিয়ে ওঠা লুটেরাদের ঘৃণা করে। কিন্তু ব্যক্তিগত চাওয়ার বাইরে গিয়ে লড়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধরে রাখার জন্য। রাষ্ট্রের সমৃদ্ধিকে সামনে রাখে। আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার তো কোনো বিকল্প থাকতে পারে না।

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত