প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মি-টু আন্দোলন এবং নারীর আবেগবিবর্জিত যুক্তিনির্ভর জীবন

মোসফেকা আলম ক্যামেলিয়া : Harvey Weinstein-এর বিরুদ্ধে আমেরিকান সমাজকর্মী Tarana Burke-২০০৬ সালে ঘটে যাওয়া এক যৌন হয়রানির  অভিযোগ অনলাইনভিত্তিক হ্যাশট্যাগ এ মি-টু নামকরণ করে আনে ২০১৭ সালের অক্টোবরে। এরপরেই  সরব হতে থাকে আমেরিকান বিভিন্ন নারীরা। ফ্যাশন হাউজ থেকে  চার্চসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা, বাণিজ্য, রাজনীতিÑ এমন কোনো জায়গা নেই যেখান থেকে অভিযোগ আসেনি। এমনকি পর্নো ইন্ডাস্ট্রি থেকেও অভিযোগের আঙুল তোলা হয়। মি-টু ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। বাংলাদেশেও আসে মি-টু র  ঝড়। শহরের নারীরা ইতিমধ্যেই বাচ্চাকে শেখাতে শুরু করেছেন গুড টাচ ব্যাড টাচ। কিন্তু তাতে সমগ্র নিপীড়ন কি কমবে? মানবাধিকারের অধিকার আদায়ে ভূমিকা আর তাতে নারীবাদী এক নারীর ছোট ইতিহাস বলি। ১৭৮৯ এর ফরাসী বিপ্লবের সময় পুরোনো সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নারীরা সক্রিয় হয়েছিলো। তাদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল রাজাকে প্রাসাদ ছেড়ে দিতে বাধ্য করেছিলো। এরপর সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র কি সমতাভিত্তিক সমাজ গঠন করেছিলো? ঙষুসঢ়ব ফব এড়ঁমবং নব সরকারের কাছে পুরুষের সমান অধিকার দাবি করলেন। ১৭৯৩ সালে তার গরদান নিয়ে নারীদের জন্য নিষিদ্ধ করলো সব ধরনের রাজনৈতিক করমকা-। এর মানেই হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নিজ প্রয়োজনে নারীদের ব্যবহার করে আবার নিজের মোড়কে তাকে ফেরাবার কৌশল অবলম্বন করে। এখন তবে  নারীদের নিপীড়ন কি কমবে না?

পুরুষতন্ত্র জন্ম কার হাত ধরে? পুঁজিবাদী ব্যবস্থার। এখানে এলিসন জাগার তার Feminist Politics and Human Nature গ্রন্থে মারকসীয় বিচ্ছিন্নতা তত্ত্বকে নারীবাদের বিশ্লেষণে যেভাবে প্রয়োগ করেছেন তা একটু বলি। একজন নারীকে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় নিজের মতোই সবকিছু করে। কিন্তু সে মূলত পুরুষের জন্য তৈরি হয়। সে অনেক সময় জানে না বা খুব কমই জানে, কখন কোথায় কীভাবে কার দ্বারা তার দেহ ব্যবহৃত হবে। এভাবে নারী ধীরে ধীরে তার দেহ থেকে বিচ্ছিন্নতা বোধ করে। তাদের বুদ্ধিবৃত্তিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। তাদের মতামত জনসমক্ষে প্রকাশ করতে ইতস্ত করে। নারী সবকিছু, সব মানুষ ও নিজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক একাকীত্ব নিয়ে সমাজে বাস করতে থাকে। আর নারীর বিচ্ছিন্নতা সম্পরকে সঠিক ধারণা নারী নিপীড়ন উচ্ছেদের প্রথম পদক্ষেপ। এবার ধরি, সমগ্র ব্যবস্থাপনার কথা। পুঁজিবাদী সমাজ উৎপাদন সম্পকে শ্রমিক শ্রেণিকে গোটা ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাদের ব্যবস্থাপনা টিকিয়ে রাখে। শুধু তা ই নয়,  তাদের অসন্তোষকে ভিন্ন পথে পরিচালিত করতে নানা ধরনের মুভমেন্টের জন্ম দেয়। পরিবেশ আন্দোলন, নদী আন্দোলন, সড়ক আন্দোলন, বৃক্ষ বাঁচাও আন্দোলন ইত্যাদি ইত্যাদি। ফলত প্রত্যেকের মাঝে জন্ম নেয় আলাদা বোধের। যা তাদের মাঝে প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করতে দেয় না। ফলে কিছুদিনের জন্য সরব হওয়া আন্দোলন দুইদিনেই পাংশু। মি-টু আন্দোলন মূলত পুঁজিবাদী দেশ থেকে আসা এমনই এক আন্দোলন। এরও দুইদিন পরেই অপমৃত্যু ঘটবে। আর এদেশে তো নারীবাদের যেকোনো প্রশ্নই নারীদের মাঝেই বহুধা বিভক্ত হয়ে যায়। তারাই নিজেদের বিচ্ছিন্ন করতে পারে না পুরুষতান্ত্রিক সুবিধাভোগের জায়গা থেকে। তবে যে কোনো মুভমেন্টই মনের মাঝে কিঞ্চিৎ বুদবুদ তুলে যায়। সেই বুদবুদ নতুন চিন্তাধারার জন্মও দেয়। আগে নারীরা নিপীড়িত হচ্ছে তাই হয়তো বুঝতো না। এখন অন্তত বুঝবে। আর এই বোধের জন্ম নেয়াও জীবনকে অন্যের নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাখার শক্তি অরজনে সাহসী হয়তো করবে। তবে সেখানে প্রয়োজন নারীর আবেগ বিবর্জিত যুক্তি নির্ভর জীবন যাপনের অভ্যস্ততা। আর তা কি নারী পারবে?

লেখক : প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত