প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ধরাছোঁয়ার উর্দ্ধে নৌকা, ধানের শীষকে লড়তে হবে লাঙ্গলের সঙ্গে

মতিনুজ্জামান মিটু: বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তর রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রক্রিয়ায় আসাতে রাজনীতির মাঠে আপাতত ইতিবাচক সুবাতাস বইলেও শংকা কাটেনি। এমনকি দেশের জটিল রাজনৈতিক অংকের সমিকরণ কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা নিয়েও অনেকেই উৎকন্ঠিত রয়েছেন। এমনই প্রতিয়মান হচ্ছে পরিস্থিতি প্রেক্ষাপট পর্যবেক্ষণ করে।

পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা, সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ঠান্ডা লড়াই এর অবসান ঘটতে পারে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি পারস্পারিক সমঝোতামূলক ছাড় দেয়ার মনোভাবের ওপর। এরকম যদি ঘটে তাহলে রাজনৈতিক অঙ্গনের সুস্থ্যতা আরো ভালভাবে ফিরে আসবে। পর্যবেক্ষক মহল আরো মনে করেন, আমাদের যে সংবিধান রয়েছে তাতে নির্বাচন অনুষ্ঠান সংক্রান্ত যে বিধিমালা আছে তার আওতায় সুষ্ঠ, স্বচ্ছ নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব। এজন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা অন্য কোনো সরকার গঠনের প্রয়োজন নেই।

কিন্তু ১৯৭২ সালের রচিত সংবিধানের নির্বাচন অনুষ্ঠান সংক্রান্ত বিধিবিধান যথাযথভাবে অনসরণের দায়দায়িত্ব কমবেশি সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের ওপর বর্তায়। এব্যাপারে যদি সরকার এবং নির্বাচন কমিশন যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহন না করতে পারেন তাহলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশংকা থেকে যায়। পর্যবেক্ষক মহল বলছেন, প্রত্যাশা করা হচ্ছে নির্বাচন কমিশন অবাধ সুষ্ঠ নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে সংবিধানের সুনির্দিষ্ট বিধিবিধানগুলো প্রয়োগের পদক্ষেপ গ্রহন করবেন।

প্রচলিত নির্বাচন পদ্ধতির সঙ্গে এবার নতুন করে যুক্ত হচ্ছে ইভিএম ( ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) পদ্ধতি। এ ব্যাপারে বিএনপি, ২০ দলীয় জোট, ঐক্যফ্রন্টসহ অনেক সংগঠন আপত্তি উঠালেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ কে এম নূরুল হুদা কোনো অবস্থাতেই ইভিএম ব্যবস্থা থেকে সরে আসবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। এ বিষয়ে আরো জানা গেছে পরীক্ষামূলক ৩০০ আসনের বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে মাত্র ১৪৯ টি ইভিএম ব্যবহারের লক্ষ্য থাকলেও এর অনেক বেশি মেশিন ব্যবহারের প্রস্তাবনা রয়েছে। তবে উল্লেখিত মেশিনগুলো কোন কোন কেন্দ্রে ব্যবহৃত হবে তা জানা যায়নি। এ নিয়ে বিরোধী শিবিরে আপত্তি অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে দেশের বিভিন্ন জেলায় ৪৩ জন বিশেষ কর্মকর্তা পাঠান হয়েছে। যারা নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে এরকম আপত্তি তুলে বিরোধী দলের অনকেই তাদেরকে প্রত্যাহার করে নেয়ার দাবী উঠিয়েছেন। কিন্তু বিষয়টি নির্বাচন কমিশন এড়িয়ে চলছে।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী। ওই নির্বাচন দেশের প্রধানতম বিরোধী দল বিএনপিসহ অনেকেই বর্জন করেছিল। এমনকি প্রগতিশীল অনেক সংগঠনই এই নির্বাচনে অংশ গ্রহন থেকে বিরত ছিল। ওই নির্বাচন বর্জনের ফলে কার কতটুকু লাভ হয়েছিল সেই খতিয়ানে না যেয়ে বলা যায় বিএনপি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। সেই ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেয়া এবং দলের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই এই দলটি সমমনাদের সঙ্গে নিয়ে একাদশতম নির্বাচনে অংশ গ্রহনের সিদ্ধান্ত নেয়। উল্লেখ্য নির্বাচন কমিশনের রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের বিধিমালায় বলা হচ্ছে কোনো দল বা সংগঠন যদি পরপর ২ টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে তাহলে তাদের নিবন্ধন বাতিল বলে গণ্য হবে।

তবে বর্জন না করে একাদশ নির্বাচনে অংশ গ্রহনের সিদ্ধান্তের লাভ লোকসান কার কতটুকু হবে তা কেউ মিলাতে পারছে না। এমনকি নির্বাচনের ফলাফল বিরোধী পক্ষের কতটুকু অনুকুলে যাবে সে সব বিষয়ও ধোয়াশার মধ্যে রয়েছে।
পর্যবেক্ষক মহল বলছেন পূর্বাপর সার্বিক পরিস্থিতি প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে যা পাওয়া যায় তাতে দেখা যাচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জোট সরকার গঠনের পথে অগ্রসর হয়ে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপি বা তাদের জোট শরীকরা সরকার গঠনের লড়াইয়ে এগিয়ে যাওয়াতো দূরের থাক হয়তো তাদের জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের বিষয়টিও শংকার মধ্যে থেকে যাচ্ছে। এ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মোহম্মদ এরশাদের একটি বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তা হলো তিনি প্রায়শ বলছেন, তার দল জাতীয় পার্টি জেগে উঠেছে এবং মাঠে শুধু নৌকা আর লাঙ্গল ছাড়া কোনো প্রতিক নেই। অতএব ধানের শীষকে এখন লাঙ্গলের সঙ্গেই লড়তে হবে, নৌকার সঙ্গে নয়।

এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীরের একটি বক্তব্য প্রণিধানযোগ্যও বটে তা হলো; এবারের নির্বাচন তার দলের জন্য বাঁচা মরার লড়াই। তবে এটাও ঠিক – পর্যবেক্ষক মহল বলছেন, সরকার পক্ষের জন্যেও এবারের নির্বাচন অগ্নি পরীক্ষার লড়াই। কোনো কারণে কিঞ্চিত পিছলে পড়লে অস্তিত্ব নিয়ে টানাহেচড়া শুরু হয়ে যাবে। এমনকি সার্বিক প্রেক্ষাপট উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। যা থেকে সংঘর্ষেরও রুপ নিতে পারে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সুত্র বলছে, আজ কালের মধ্যে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনে তাদের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা দিতে পারে। আর ১৪ দলীয় জোট এবং সংশ্লিষ্ট মহাজোটের প্রার্থী তালিকা আরা এক সপ্তাহের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে ঘোষণা দিতে পারে। এদিকে দেশের বৃহত্তম বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি এক সপ্তাহের মধ্যে ৩০০ আসনে তাদের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করবে। তবে তাদের সহযোগী দল নিবন্ধন বঞ্চিত জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশসহ সাত দলীয় তথা ২০ দলীয় জোট এবং ঐক্যফ্রন্টভুক্ত দলগুলোর মধ্যে পারস্পারিক আসন বন্টনের ঘোষণা মনোয়নপত্র দাখিলের শেষ দিনের আগেই তারা দিয়ে দিতে পারে।

অন্যদিকে নিবিড়তা নিয়ে কথা না উঠলেও কে হবেন তাদের প্রধান মন্ত্রী? এ নিয়ে রয়েছে অস্পষ্টতা। ফ্রন্টের প্রধান ড. কামাল হোসেনকে সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম জিয়াউর রহমানের বগুড়ার গাবতলীর আসন থেকে নির্বাচনে জিতিয়ে আনার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি পাকা হয়েছে। হয়তো তিনিই হবেন ঐক্য ফ্রন্টের সংসদীয় নেতা।

এদিকে গতানুগতিক ধারণায় নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করার ব্যাপারে দেশে বিদেশে একটি তাগিদ রয়েছে। প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনাও নাকি জাতিপুঞ্জে এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছেন। এব্যপারে দায়বদ্ধতাও আছে তাঁর। বাংলাদেশে নিরপেক্ষ নির্বাচন হোক এটা চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দুনিয়ার অনেকে। প্রতিবেশী ভারত রয়েছে মাঝামাঝি অবস্থানে। এমনই ধারণা ঐক্যফ্রন্টভূক্ত এবং আশপাশের দলগুলোর নেতা কর্মীদের।

সম্প্রতি ভারতীয় এক কুটনীতিক বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচনের ফলফলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারে থাকবে কিনা সেব্যাপারে ইঙ্গিত পূর্ণ কথা বলেছিলেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের করুণ পরিণতির কথাও তুলে ধরেছিলেন তিনি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া জাতীয় নির্বাচন নয়-এই তত্ত্বকে কি জানি কি কারণে পাশে রেখে নির্বাচনের ময়দানে কুশলি খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন বিভিন্ন নামের ফ্রন্ট বা জোট যাই বলুন তাদের কুশিলবরা। হয়তো তারা এই ভেবে দু’পা পিছিয়েছে যে, ‘এটি করলে ভবিষ্যতের পথ চলা সহজ হবে’। না একথা নয় যে, মাঠের সবাই একই ভাবনায় নির্বাচনী লড়াই এ সামিল হয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে তৎপর হয়ে উঠেছে রাজনীতির ব্যবসায়ীরা। পান বিড়ি চা ছোলা বাদম বিক্রি বৃদ্ধির পাশাপাশি আড়ালে আবডালে লেনদেন হচ্ছে নাকি অনেক কিছুই।

এদিকে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দন্ডপ্রাপ্ত বিদেশে অবস্থানরত পলাতক আসামী স্কাইপির মাধ্যমে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার গ্রহন অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার পর থেকে ঐক্য ফ্রন্টের প্রধান নেতা ড. কামাল হোসেনকে রাজনৈতিক অঙ্গনে আগের মতো দৃশ্যমান দেখা যাচ্ছে না। এই সঙ্গে সাম্প্রতিক কয়েক দিনে ঐক্য ফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদেরও সরব হতে দেখা যাচ্ছে না। শোনা যাচ্ছে তারেক রহমানের দ্বারা ঐক্যফ্রন্ট নেতৃত্ব বিএনপি নিজের হাতে রাখতে চাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে ফৌজদারী আইনে দন্ডপ্রাপ্ত একজন ব্যাক্তি কোনো দলের নেতৃত্বে থাকা অবস্থায় ওই দলটি জাতীয় নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সুযোগ পায় কি ? এ বিষয়টি ১৯৭২ সালের রচিত সংবিধানের নির্বাচন অনুষ্ঠান সংক্রান্ত ধারা সমুহের সাথে সাংঘর্ষিক কিনা তাও জরুরী ভিত্তিতে খতিয়ে দেখার প্রয়োজন পড়েছে। দন্ডপ্রাপ্তদের দলের নেতৃত্বে রেখে নির্বাচনে অংশগ্রহন আইনত সিদ্ধ কিনা ? এ প্রশ্নও উঠেছে। এবিষয়ে নির্বাচন কমিশনের দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া দরকার বলে দাবী তুলেছে তারা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত