প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চা-চাটা পাবলিককে দিয়েও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না!

চিররঞ্জন সরকার : রসিকজনরা বলছেন, এবারের নির্বাচনে একটি ভোটের ‘দাম’ মাত্র ১০ টাকা! এটা সরকার নির্ধারিত রেট। কোনো এলাকায় যদি ১০ জন প্রার্থী থাকেন তাহলে এ মৌসুমে একজন ভোটারের সর্বোচ্চ আয় হতে পারে ১০০ টাকা। আবার কোনো এলাকায় যদি আড়াই লাখের বেশি ভোটার থাকেন, তাহলে আবার ইনকাম কমে যাবে। কেননা কোনো প্রার্থীই তার আসনে ২৫ লাখ টাকার বেশি ব্যয় করতে পারবেন না, তা ভোটার সংখ্যা যতোই হোক না কেন। বাংলাদেশে সবচেয়ে কম ভোটার ঝালকাঠি-১ আসনে- মাত্র ১ লাখ ৭৮ হাজার ৭৮৫ জন। আর সবচেয়ে বেশি ভোটারের আসন ঢাকা-১৯ এ ভোটার সংখ্যা ৭ লাখ ৪৭ হাজার ৩০১ জন। ফলে আপনি যদি ঢাকা- ১৯ আসনের ভোটার হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার ভোটের ‘দাম’ মাত্র ৩.৩৫ টাকা! আর ঝালকাঠি-১ আসনে ভোটের দাম ১৪ টাকা। অনেকেই নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করছেন প্রার্থীদের নির্বাচন ব্যয় ২৫ লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার। কিন্তু সত্যিই কি ২৫ লাখ টাকা খুব কম? আসুন, একটু হিসেব করে দেখি।

যদি সত্যি সত্যি ভোটার ও কর্মীদের ‘নগদ টাকা বিলানো’ ছাড়া নির্বাচন হয় তাহলে কিন্তু পাঁচ লাখ টাকার বেশি খরচ হওয়ার কথা নয়। খরচের মূল খাত কী? এক. পোস্টার ও লিফলেট। এগুলোর জন্য ৩০ হাজার টাকার বেশি লাগা উচিত নয়; দুই. প্রার্থীর রাহা খরচ, সময় একমাস, এর জন্য প্রার্থীর দিনে ১ হাজার টাকার বেশি খরচ হওয়া উচিত নয়, মোট খরচ ৩০ হাজার টাকা; তিন. গড়ে ১৫ ইউনিয়ন, প্রতি ইউনিয়নে ১ জন সার্বক্ষণিক প্রচারক, প্রত্যেকের দিনে ৫০০ টাকা ভাতা, মোট দুই লাখ ২৫ হাজার টাকা; চার. ভোটের দিন ১৩৫ (১৫ গুণ ৯) জন এজেন্ট, জনে ৫০০ টাকা করে মোট ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা। পাঁচ. নমিনেশন ফরম (জামানত) বাবদ ৩০ হাজার টাকা। তাহলে মোট ব্যয় তিন লাখ ৮২ হাজার পাঁচশ টাকা। ভোটার-ভজা খাতে (ইউনিয়ন সদরে পথসভা প্রভৃতি) আরো কিছু ধরে সর্বমোট পাঁচ লাখ টাকার বেশি খরচ হওয়ার কথা নয়। বাকি টাকা কার পিছে খরচ হবে? এজেন্ট? পাবলিককে চা খাওয়ানো? এলাকার মাগুর-বাবদ খরচ? এত্ত! তাই যদি হয় তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন কস্মিনকালেও হবে না। চা-চাটা পাবলিককে দিয়ে, দাঁও মারা এজেন্ট দিয়ে তেলতেলা মাগুর দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। এসব নিয়ে ভাবতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল নির্বাচন কমিশন আর প্রশাসনের ব্যাপার নয়, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, কর্মী, ভোটার সবারই ব্যাপার! সবার ‘মানসিকতা বদলানোর’ ব্যাপার।

নির্বাচন নিয়ে কাজ করেন, এমন একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে, সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে একটি ভোট কিনতে প্রার্থীরা এক হাজার টাকা ব্যয় করেছেন? সিটি করপোরেশন নির্বাচনে গড়ে একটি ভোটারের পেছনে প্রার্থীরা ৫ হাজার টাকা ব্যয় করেছেন। তবে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয়েছে জেলা পরিষদ নির্বাচনের ভোটা। সেটা অবশ্য ছিলো পরোক্ষ ভোট। বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বাররা ভোট দিয়ে জেলা-পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচন করেছিলেন। সেখানে একজন ভোটারের পেছনে ন্যূনতম ১০ হাজার এবং সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করা হয়েছে!

এই ধারায় যদি সংসদ নির্বাচন হয়, তাহলে একজন প্রার্থীর ন্যূনতম ব্যয় হওয়ার কথা অন্তত পাঁচ কোটি টাকা। হয়তো হবেও তাই। কারণ আমাদের দেশের নির্বাচনি-সংস্কৃতি বদলে গেছে। এখন রাজনৈতিক দলের কর্মীরাও টাকা ছাড়া নড়ে না। ভোটাররাও নগদ ছাড়া কথা বলে না। চতুর ভোটাররা রীতিমতো দরকষাকষি করে প্রার্থীদের কাছে টাকা আদায় করেন! তাও এক প্রার্থীর কাছে নয়, একাধিক প্রার্থীর কাছে!

এসব দেখে শুনে আমার এক বন্ধু প্রস্তাব করেছেন : ব্যালটে নির্বাচনের কী দরকার? নিলামে নির্বাচন হলেই তো হয়। নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত দিনে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় নিলাম অনুষ্ঠান হবে, সর্বোচ্চ দরদাতা নির্বাচিত ঘোষিত হবেন। দরের অর্ধেক আসনের জনগণকে মেজবান খাওয়ানোর জন্য এবং বাকি অর্ধেক রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা হবে। সবারই পোয়াবারো অবস্থা। নতুবা গোটা নির্বাচনী সংস্কৃতি বদলাতে হবে। তা না হলে একজন প্রার্থীর সর্বোচ্চ নির্বাচনি ব্যয় ২৫ লাখ কেন, ২৫ কোটি করেও কোনো লাভ হবে না!

লেখক : কলামিস্ট

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত