প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শুধু নিরপেক্ষ নির্বাচন নয়, জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে : ভারতীয় মিডিয়ার বিশ্লেষণ

রাশিদ রিয়াজ : ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক তপন মল্লিক চৌধুরী তার এক লেখায় বাংলাদেশের আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে শুধু নিরপেক্ষ নয়, জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি তার এক লেখায় এ আহবান জানিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অন্য সব নির্বাচনের থেকে আলাদা। জাতীয় সংসদ বহাল রেখে প্রায় সমস্ত দলের অংশগ্রহণে ৩০ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচন হতে চলেছে যা ভোটারদের কাছে, নির্বাচন কমিশনের কাছে এমনকি নির্বাচনকালীন দলীয় সরকারের কাছেও প্রথম।

তেমনই সরকার, নির্বাচন কমিশন, প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জও বটে। জাতীয় নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে যে পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন হয় তা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি বলে অভিযোগ। তাই এ প্রশ্নও সামনে আসছে যে একাদশ সংসদ নির্বাচনও কি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মতো হবে?

এবারের সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির স্লোগান সামনে আসবে নাকি গোঁড়ামি রাজনীতির বেপরোয়া মাতামাতি শুরু হবে সেই আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

২০০১-এর নির্বাচনের পর সন্ত্রাস, হিংসতা আর ধর্ষণের যে তাণ্ডব শুরু হয়েছিল সেই স্মৃতি এখনও তাড়া করে মানুষকে, বিশেষ করে সংখ্যালঘু জীবনকে। সরকার, কমিশন, পুলিশ প্রশাসন নির্বাচনে সন্ত্রাস কতটা সামাল দিতে পারবে সেটা জরুরি বিষয়। জিজ্ঞসাও একটাই, শেখ হাসিনার মহাজোট সরকার তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসবে নাকি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন বিএনপির ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দল ওই ক্ষমতা পাবে?

বিরাট সংখ্যক নতুন ভোটার

রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ভোটযুদ্ধের প্রস্তুতি, জনমনে আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক যত বাড়ছে, কোণায় কোণায় উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে ওই একই প্রশ্ন – নতুন সংসদে আওয়ামী লিগের আধিপত্য বজায় থাকবে নাকি ২০০১-এর পর নানা ঘটনায় খাদের কিনারে চলে যাওয়া বিএনপি-জামায়াত জোট স্বমহিমায় ফিরবে?

শেখ হাসিনার ১০ বছরের শাসনকালে বাংলাদেশের উন্নয়ন নানা ভাবে আলোচিত। দশকব্যাপী তাঁর প্রশাসন ঘিরে বহু প্রশ্ন বারবারই উচ্চারিত হয়েছে। বিএনপির সঙ্গে জামায়তের নিবিড় সম্পর্ক যেমন বড় জিজ্ঞাসা, তেমনি জিজ্ঞাস্য হয়ে উঠছে হেফাজতে ইসলামের মতো কট্টর ইসলামি গ্রুপের সঙ্গে আওয়ামি লিগের সখ্য।

এই নির্বাচনে এক বিরাট সংখ্যার নতুন ভোটার ভোট দেবে – তারা তরুণ প্রজন্ম। একটি সমীক্ষা বলছে, তরুণ প্রজন্মের ৫১.৩ শতাংশ চাইছে বর্তমান সরকার আবার ক্ষমতায় আসুক। তরুণদের ৬৮.৩ শতাংশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট। অন্যদিকে ১৮.৫ শতাংশ তরুণ এই সরকারের দুর্নীতি নিয়ে অসন্তুষ্ট। ৩০.২ শতাংশ তরুণ আসন্ন নির্বাচনে পরিবর্তন দেখতে চায় এবং ১৫.৭ শতাংশ নির্বাচন নিয়ে কিছু ভাবছে না। আর ১৬.৭৫ শতাংশ তরুণ চায় একটি দুর্নীতিমুক্ত সরকার, আর অধিকাংশ মানুষই চাইছেন শান্তিপূর্ণ ভোট এবং দুর্নীতিমুক্ত সরকার।

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন

অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট সম্ভব তখনই যখন সরকার নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য শুধু বিরোধী দলের কর্মী-প্রার্থীদের উপর নির্বাচনী আইন ও আচরণবিধি চাপিয়ে দিলেই হয় না, সেই আইন মানতে বাধ্য মন্ত্রী, সাংসদ, ক্ষমতাসীন দলের কর্মী, প্রার্থী, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাস খানেক কিন্তু নির্বাচনে যোগদানকারী দলগুলোর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি। ক্ষমতাসীন জোটের পুরোনো ও নতুন শরিকরা যেসব সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে, উলটোদিকে বিরোধীরা ততটাই প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছে।

নির্বাচনের দিন ঘোষণার আগে বিরোধী দমনে সরকারের যে ভূমিকা ছিল, এখন তা আরও ভয়ঙ্কর হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে। নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে নীরবতা পালনকেই যথাযথ বলে বিবেচনা করছে। কমিশনের ভূমিকায় মনে হচ্ছে, তারা যেনতেন প্রকারে নির্বাচন করতেই আগ্রহী। সুষ্ঠু নির্বাচন করতে কমিশন যে আগ্রহী, তাদের আচরণে সেটা মনে হচ্ছে না।

এবার পরিস্থিতি অন্যরকম

কয়েক মাস আগেও দেশের রাজনীতির যে পরিস্থিতি ছিল, এখন তা অনেকটাই পাল্টেছে। ক্ষমতাসীনদের একটি শক্তিশালী নির্বাচনী প্রতিপক্ষ তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লিগ এবং তার শরিকরা কিছুদিন আগেও ভাবত যে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি হয়তো নির্বাচনে যোগ দিতেই পারবে না, দাবিদাওয়া মেনে না নেওয়ার কারণে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না বর্জন—এই প্রশ্নে ভাগ হয়ে যাবে। অন্য জোট ও দলগুলোও সম্ভবত এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়বে। অর্থাৎ বিরোধীদের চাপের মধ্যে রেখেই তারা নির্বাচনী বৈতরণী পার হবে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়েছে। তাই ক্ষমতাসীনরা এখন চেষ্টা করছে যাতে ঐক্যফ্রন্ট সংখ্যা ও আকারে আর বড় না হয়।

প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির নেতা-কর্মীদের একটি বড় অংশ মামলার আসামি, অনেকে জেলে, যারা বাইরে তারাও ঘরে থাকতে পারছেন না। নির্বাচনের দিন ঘোষণার পরও বিএনপির নেতা-কর্মীদের নামে মামলা হচ্ছে। ৮ নভেম্বর জাতীয় নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পরও বিএনপির ৭৭৩ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলা প্রত্যাহার ও গ্রেফতার বন্ধে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে বিএনপির পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হলেও তার কোনও ফল হয়নি।

এ রকম পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের কার্যকলাপ আরও বেশি প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছে। একদিকে ক্ষমতাসীন দলের সাংসদরা নির্বাচনে লড়ার সুযোগ পাচ্ছেন। অন্যদিকে নির্বাচন ঘোষণার দু’সপ্তাহ পরেও প্রশাসন ও পুলিশে কোনো রদবদল আনার উদ্যোগ নেই। প্রশাসন ও পুলিশের দলীয়করণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। যে কোনও সরকারের বেলায় এই অভিযোগ ওঠে। কিন্তু গত ১০ বছরে তা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসন নির্বাচন কমিশনও

২০১৪ সালের নির্বাচনের পর বিভিন্ন ঘটনায় প্রশাসন বিশেষ করে পুলিশ আর সরকারি দল একাকার হয়ে গিয়েছে। অতীতে নির্বাচনের আগে স্থানীয় প্রশাসনে পরিবর্তন করার উদ্যোগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারই গ্রহণ করেছিল। নির্বাচন ঘোষিত হওয়ার পর এই দফায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার না থাকায় সে দায়িত্ব বর্তেছে কমিশনের উপর। ৯ নভেম্বর বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার ডেপুটি কমিশনার এবং দু’জন ডিভিশনাল কমিশনারকে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ৩১ জুলাই এবং ১৫ অক্টোবরের মধ্যে সরকার ৩৬টি জেলায় ডেপুটি কমিশনার নিয়োগ করেছে; নির্বাচনের দিন ঘোষণার আগের দিন ৭ নভেম্বর ২৩৫ জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারিনটেনডেন্টকে পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট করা হয়েছে।

নির্বাচনের দায়িত্বে যাঁরা থাকবেন, তাঁদের তালিকাও নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা গোপনে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন। নির্বাচনে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে যাঁরা দায়িত্ব পালন করবেন, তাঁদের প্যানেল তৈরি করা হয়েছে। তাঁদের রাজনৈতিক মনোভাব খতিয়ে দেখছে পুলিশ। উদ্দেশ্য একটাই নির্বাচন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা যাতে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক হন এবং বিরোধী পক্ষের কেউ দায়িত্বে আসতে না পারেন।

নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পর আওয়ামী লিগের মনোনয়নপত্র বিতরণ ঘিরে যানজট, দুর্ভোগ ও দু’জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও কমিশন সচিব বলছেন, উৎসবমুখর পরিবেশে একটি সীমিত এলাকায় জনসমাগম হচ্ছে। তাই এতে নির্বাচনের আচরণবিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে না।

কিন্তু বিএনপির মনোনয়ন ফরম বিতরণ ঘিরেও যখন লোকসমাগম শুরু হল তখন নির্বাচন কমিশনের মনে হল আচরণবিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে তারা পুলিশের মহাপরিদর্শককে চিঠি দেওয়ার পরদিনই নয়াপল্টনে পুলিশের সঙ্গে বিএনপির নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষ, নেতা-কর্মীদের নামে মামলা, গ্রেফতারি। নয়াপল্টনে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া, গাড়ি ভাঙচুর করার অভিযোগে বিএনপির ৪৮৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়, ৬৬ নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন এবং ৩৬ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেয় পুলিশ।

কিন্ত মোহম্মদপুরের আদাবরে আওয়ামী লিগের দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষে যে দু’টি তরুণ প্রাণ ঝরে গেল, কয়েকজন আহত হল, সেই ঘটনায় কারও বিরুদ্ধে পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নিল না কেন? ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে মোহম্মদপুর যুবলীগ নেতাকে তারা গ্রেপ্তার করলেও ১২ ঘণ্টা পর ছাড়া পান। তা’হলে দু’টি মানুষের জীবনের চেয়ে পুলিশের গাড়ির দাম বেশি?

হিংসা ও সন্ত্রাসের আগুন

এ সব ঘটনার প্রেক্ষাপটে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে দেশে সংশয় তৈরি হচ্ছে। এ কথা মনে করার কারণ নেই যে ভোটাররা এসব লক্ষ করছেন না। বাংলাদেশে টানা ১০ বছর শাসন করে আসছে মহাজোট সরকার। এই জোটে আওয়ামি লিগই সর্বেসর্বা। শরিক দলগুলো তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না এখানে।

গত ১০ বছরের শাসনে দেশে বেশ লক্ষণীয় উন্নয়ন ঘটেছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পদ্মা সেতু, সাগর বিজয়, মেট্রোরেল ও মহাসড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের মতো কাজগুলো বেশ প্রশংসার দাবিদার। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয়, কমিউনিটি ক্লিনিক ও অনলাইন খাতে ব্যাপক সংস্কার আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রশংসিত হয়েছে।

নির্বাচনে শেখ হাসিনার প্রাধান্য কিছুটা হলেও বজায় থাকবে এমন ইঙ্গিতই উঠে এসেছে প্রায় সব আলোচনায়। কিন্তু গত দশ বছরে সন্ত্রাস, রাজনৈতিক হিংসা কত ভয়ানক হতে পারে তার নজির দেখেছে মানুষ, যখন মাসের পর মাস দেশ পুড়েছে পেট্রোলবোমা নামের সন্ত্রাসের আগুন। যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরোধিতা থেকে জঙ্গি উত্থান, গুলশানের হলি আর্টিজান ক্যাফেতে হামলা, মুক্তমনা লেখকদের হত্যার পাশাপাশি বিদেশি নাগরিক হত্যা। একটি মানবাধিকার সংগঠন জানাচ্ছে , চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৪৩৭ জন নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের শিকার আর গুম করা হয়েছে ২৬ জনকে। ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত গুম, খুন, নির্বিচার হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু এবং অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জড়িত থাকার অভিযোগের ব্যাখ্যা চেয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যে চিঠি পাঠায় তার মধ্যে ১৫৪টি প্রশ্নের কোনও উত্তর মেলেনি। চলতি বছরের মাদকবিরোধী অভিযানে ১৫ মে থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ২৭৬ জন নিহত হয়েছেন।

উন্নয়নের পাশাপাশি দুর্নীতি

নির্বাচনে মানুষ রায় দেবে আওয়ামী লিগের নৌকা নাকি বিএনপির ধানের শিসে? অনেকের ধারণা, ২০০৮ সালের মতো না হলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার মহাজোটের আধিপত্য থাকবে। এই ধারণার পেছনে আছে গত দশ বছরের শাসনে তিনি দেশের সর্বস্তরে যে বিপুল উন্নয়ন ঘটিয়েছেন আর এই উন্নয়নের সুবাদে ব্যক্তি শেখ হাসিনা যে বিপুল জনসমর্থন পেয়েছেন এবং পেয়েই চলেছেন সেটাই নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে ভোটে।

উন্নয়ন কাজে দুর্নীতি প্রধান অন্তরায়। সড়ক নির্মাণে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় বাংলাদেশে। সুইটজারল্যান্ডে একটি রাস্তা নির্মাণে যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়, বাংলাদেশে হয় তার দ্বিগুণ। কিন্তু এত টাকা খরচ করেও বাংলাদেশের রাস্তা নির্মিত হয় অত্যন্ত নিচু মানের। বছর না ঘুরতেই রাস্তাগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। দেশের শিক্ষা খাত বেকার তৈরির কারখানা। উচ্চশিক্ষা শেষে একজন তরুণ একটি কাগজের শংসাপত্র ব্যতীত আর কিছুই পান না। কর্মজীবনেও একজন তরুণ হতাশ হয়ে পড়ে, যখন দেখে- তার শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের মধ্যে কোনও মিল নেই; তার শিক্ষা তাকে কর্ম দিতে সহযোগিতা করছে না। কর্মের জন্য তাকে আবার নতুন করে শিক্ষতে হতে হচ্ছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও তথৈবচ।

প্রশ্ন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের

আওয়ামী লিগের পক্ষে এই নির্বাচন জেতা অন্যবারের মতো সহজ নয়। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করতে হলে বর্তমান নির্বাচনকালীন দলীয় সরকারকেই নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকার–এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। অন্যথায় সব ব্যর্থতার দায় বর্তাবে নির্বাচনকালীন সরকারের ওপরই। নির্বাচনটি দলীয় সরকারের অধীনে হওয়ায় দেশের মানুষ, বিদেশের বন্ধু ও সুহৃদেরা এর ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখবে।

কয়েকদিন আগে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বাংলাদেশ-বিষয়ক বিতর্কে অংশ নিয়ে সদস্যদেশের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সঙ্কুচিত হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচনই শেষ সুযোগ, যেখানে নির্ধারিত হবে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারা ও আইনের শাসন অব্যাহত থাকবে নাকি পরিস্থিতি অরাজকতা আর বিশৃঙ্খলার দিকে ধাবিত হবে।

হাসিনার সামনে চ্যালেঞ্জ

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ নয় যে তারা কত বেশি দলকে জোটসঙ্গী করতে পারল, কত আসন পেয়ে সরকার গঠন করল অথবা বিরোধী দলের আসনে বসল; তাদের জন্য সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হবে নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও অবাধ হবে কি না। তাদের চ্যালেঞ্জ হলো মানুষ নির্ভয়ে ভোট দিতে যেতে পারবে কি না।

প্রতিটি ভোটকেন্দ্র ও বুথে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্টরা উপস্থিত থাকতে পারবেন কি না। নির্বাচন নিয়ে এখন সর্বত্র আলোচনা, গুঞ্জন। সবার জিজ্ঞাসা, নির্বাচনটি ঠিকঠাকমতো হবে তো?  বাংলাদেশে যতগুলো একতরফা নির্বাচন (১৯৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি ও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি-সহ) হয়েছে, তার জন্য নির্বাচন বয়কটকারীরা যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী নির্বাচন আয়োজনকারীরা।

২০০৭ সালে বিএনপি সংবিধানসম্মত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে দলীয় ভাবে ব্যবহার করতে গিয়ে নির্বাচনটিকেই ভণ্ডুল করেনি, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকেও ধ্বংস করেছিল। এবার আওয়ামী লিগ একই সঙ্গে নির্বাচনে অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী এবং নির্বাচন পরিচালনাকারীর ভূমিকায়। নির্বাচন পরিচালনাকারী হিসেবে তাকে শুধু নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করলেই হবে না, সেটি জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হবে। নির্বাচনটি অবাধ ও সুষ্ঠু হলে, জনগণ আওয়ামী লীগকে টুপি খুলে অভিনন্দন জানাবে। কিন্তু নির্বাচনটি সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ না হলে সবকিছু ওলটপালট হয়ে যেতে পারে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ