প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আবুর খুনি কারা

অনলাইন ডেস্ক : যশোরের বিএনপি নেতা আবু বকর আবু নিখোঁজের পর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কারা মুক্তিপণ হিসেবে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা নিয়েছিল তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। মোবাইল ফোন নম্বরগুলো সংগ্রহ করে তা প্রযুক্তির সহায়তায় অনুসন্ধানও শুরু করা হয়েছে। আবুকে কারা হত্যা করল, কেন করল, তা এখনও বের করতে পারেনি পুলিশ। তবে স্বজনরা দাবি করছেন, এটা পরিকল্পিত হত্যা। কিন্তু তারাও বলতে পারছেন না যে কেন, কারা তাকে হত্যা করল। পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার আগে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পেতে ঢাকায় এসে লাশ হলেন যশোরের বিএনপি নেতা আবু বকর আবু। ১৯ নভেম্বর বুড়িগঙ্গা নদী থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। বৃহস্পতিবার লাশের পরিচয় মেলে।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে কেশবপুর উপজেলা বিএনপি দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পৃথক দুটি কার্যালয়ে দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। শহরের ওয়াপদা সংলগ্ন কার্যালয়টি পরিচালিত হতো এবারের সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশী আবু বকর আবুর নেতৃত্বে। এ ছাড়া থানার মোড়ে প্রধান সড়ক সংলগ্ন নির্মিত কার্যালয়টি পরিচালিত হতো অপর মনোনয়নপ্রত্যাশী কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য ও কেশবপুর থানা বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেন আজাদের নেতৃত্বে।

এদিকে আবুর লাশ উদ্ধারের পর রাজনৈতিক নেতারা পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আবু বকর আবু খুনের পেছনে বিএনপির অন্তর্কোন্দল থাকতে পারে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর অভিযোগ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আবু বকরকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তাকে হত্যার পর লাশ বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দেয় হত্যাকারীরা। তবে ঘটনার তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেবেন বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)

কে এম নূরুল হুদা।

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান বলেন, লাশে কোনো প্রকারের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তাই এটি হত্যা নাকি অন্য কোনো কারণে তার মৃত্যু হয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আবু বকর আবু অপহরণের পর তার স্বজনের কাছ থেকে মুক্তিপণ হিসেবে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বিকাশের মাধ্যমে। সেসব নম্বরগুলোর বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ শাহ জামান বলেন, সোমবার লাশ উদ্ধারের ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছিল। তবে লাশ শনাক্তের পর আবু বকরের পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ মামলা করতে থানায় আসেননি।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আবু বকর আবু যশোর জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও কেশবপুর উপজেলার মজিদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চারবার চেয়ারম্যান ছিলেন। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-৬ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন তিনি। বিএনপির মনোনয়ন ফরম জমা দিয়ে গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ১৯ নভেম্বর তার সাক্ষাৎকার দেওয়ার কথা ছিল। সেজন্য ১২ নভেম্বর তিনি ঢাকায় আসেন। পল্টন এলাকার মেট্রোপলিটন হোটেলের চতুর্থ তলায় ৪১৩ নম্বর রুমে অবস্থান করছিলেন তিনি। ১৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় তিনি পল্টন থেকে হোটেলে ফেরেন। এরপর রাত সাড়ে ৮টার দিকে হোটেল থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হন।

আবু বকর আবুর ভাতিজা হুমায়ন কবির সমকালকে বলেন, ‘১৮ নভেম্বর রাত ৮টা ৪৩ মিনিটে চাচা আমাকে ফোন করে বলেন- তিনি রমনা পার্কের কাছাকাছি রিকশায় আছেন। কারা তাকে মেরে ফেলবে বলে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।’ কবির জানান, ঘণ্টা খানেক পর তার চাচার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। রাত সাড়ে ১২টায় অজ্ঞাত মোবাইল নম্বর থেকে আবু বকরের ভাগ্নে মেহেদি হাসান জাহিদকে ফোন দিয়ে দেড় লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরে আরও ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। অজ্ঞাত ব্যক্তি জাহিদকে বলে, টাকা দিলেই আবু বকরকে ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে জাহিদ তার মামার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে দেওয়া হয়নি। ১৯ নভেম্বর সকাল ৭-৮টার মধ্যে ৮-১০টি বিকাশ নম্বরে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা মুক্তিপণ হিসেবে দেওয়া হয়। কিন্তু টাকা নেওয়ার পরও আবু বকরের সঙ্গে স্বজনদের কথা বলতে দেয়নি অজ্ঞাত ব্যক্তিরা। কবিরের অভিযোগ, তার চাচাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তবে কারা, কেন এ হত্যা করেছে তা ধারণা করতে পারছেন না। মুক্তিপণ দেওয়ার পরও থানায় মামলা বা অভিযোগ করেননি কেন জানতে চাইলে কবির বলেন, ২০ নভেম্বর তারা পল্টন থানায় জিডি করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে তা নেওয়া হয়নি। পরে একইদিন শাহবাগ থানায় মৌখিক অভিযোগ করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে শাহবাগ থানা পুলিশ মেট্রোপলিটন হোটেলে যায় এবং সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে। হোটেলটির সিসি ক্যামেরার ফুটেজে রাত সাড়ে ৮টার দিকে আবু বকরকে ব্যাগ হাতে বের হতে দেখা যায়।

১৯ নভেম্বর বুড়িগঙ্গা নদীর ‘বেবি সাহেবের ডক ইয়ার্ড’ এলাকায় ভাসমান অবস্থায় আবু বকরের লাশ উদ্ধার করে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার এসআই আক্কেল আলী। তিনি সমকালকে বলেন, লাশটি নদীতে ভাসমান ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, লাশটি কামরাঙ্গীরচর এলাকা থেকে ভাসতে ভাসতে এসেছে। পরিচয় না পাওয়ায় অজ্ঞাত হিসেবে লাশ স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) মর্গে রাখা হয়। থানা পুলিশের ফেসবুক পেজে মৃত ব্যক্তির ছবি দিয়ে পরিচয় জানতে চাওয়া হয়। বৃহস্পতিবার রাতে আবু বকরের স্বজনরা মিটফোর্ড মর্গে গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন। গতকাল শুক্রবার সকালে তারা লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ি যশোরের উদ্দেশে রওনা হন।

দুপুরে কেশবপুরের নিজ গ্রাম বাগদহে লাশ পৌঁছায়। রাজনৈতিক সহকর্মীসহ দলমত নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ আবু বকরের লাশ দেখার জন্য ভিড় করেন। দুপুর সাড়ে ১২টার পর প্রথমে লাশ নেওয়া হয় মজিদপুর ইউনিয়ন পরিষদে। এরপর নিজ বাড়িতে নেওয়ার পর তার আত্মীয়স্বজন ও দলীয় নেতাকর্মীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি হয় সেখানে। মজিদপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতা মনোজ তরফদার বলেন, আবু বকর আবু চেয়ারম্যান অসাম্প্রদায়িক চেতনার একজন মানুষ ছিলেন।

কেশবপুর শহরে পাবলিক ময়দানে বিকেল সাড়ে ৩টায় হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে জানাজার আগে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ আবু বকর আবুর খুনিদের বিচারের দাবি জানান। তার কফিনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ছাড়াও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্বাহী কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওসি শাহিন পুষ্পার্পণ করেন। এ সময় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতারা ছাড়াও বক্তব্য দেন নির্বাহী কর্মকর্তা মিজানুর রহমান। এরপর বাগদহ গ্রামের মাদ্রাসা মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে মাদ্রাসা সংলগ্ন পারিবারিক কবরস্থানে মা-বাবার কবরের পাশে তার লাশ দাফন করা হয়। সূত্র : সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ