প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

তবুও সময় হলে শেষ

সেলিম জাহান : প্রকৃতির সবকিছুই যে সব সময়ে নিয়ম মেনে চলে, এমন কথা কিন্তু কেউ বলতে পারেনা, এ রকম করেই প্রয়াত বিমল কর শুরু করেছিলেন তার স্মৃতিমূলক গ্রন্থ ‘আমি ও আমার তরুণ লেখক বন্ধুরা’। তার সপক্ষে তিনি যুক্তি দেখিয়েছিলেন এই বলে যে, ‘গাছের সবচেয়ে পুরোনো ডালেই সবসময় প্রথম ফুল আসে না, প্রথম সে ফুল ফুটতে পারে, গাছের পঞ্চম ডালেও’। সেটি পড়তে পড়তে মনে হয়, শ্রীযুক্ত করের যুক্তিটি উল্টোদিকেও তো বহাল হতে পারে- আগে যে ফুলটি গাছে ফুটেছে, তাকেই যে আগে ঝরে যেতে হবে, তেমন তো কোন কথা নেই। যে ফুল পরে ফুটেছে, সেও তো আগে ঝরে যেতে পারে। সদ্যফোটা ফুলও তো ঝরে পড়ে অকালেই!

কথাগুলো সম্প্রতি মনে হয়েছে যখন চারদিকে দেখেছি, কত তরুণ মানুষ অকালে আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে। মেধায়, প্রতিভায়, সম্ভাবনায় অমিত ভরপুর এক একটা মুখ। কত সম্ভাবনা তাদের ছিলো। জীবন, জগত ও মানুষকে কতোকিছু তারা দিতে পারতেন। তাদের অকাল প্রস্থান সব সুযোগের দ্বার রুদ্ধ করে দিলো। বারবার মনে হয়, তাদের তো যাওয়ার কথা ছিলো না, কিছুতেই চাইনি তারা চলে যাক। ‘তবুও সময় হলো শেষ, তবু হায় যেতে দিতে হলো’।

আমি প্রতিভাবান লোক নই – নিতান্তই ঘষা-মাজার লোক। কিন্তু প্রতিভাবান লোক সম্পর্কে অন্তত দু’টো কথা বলতে পারি- এক সারা জীবনে বহু প্রতিভাবান মানুষের সংস্পর্শে আমি এসেছি। দুই, প্রতিভা চিহ্নিত করার চোখ আমার আছে। প্রতিভার দ্যুতি, মেধার সৃষ্টিশীলতা, মননের অস্থিরতা আমি দেখেছি নানান ভাবে, নানান সময়ে, নানান মানুষের মধ্যে।

তিনটে কথা আমার সবসময়ে মনে হয়েছে। প্রথমত; প্রতিভার ক্ষেত্রে আমি দু’টো জিনিসের মধ্যে বিভাজন করি- প্রথাগত মেধা আর ব্যতিক্রমী প্রতিভা। প্রথাগত মেধার প্রতিফলন আমরা পরীক্ষার ফলাফলে, কর্ম-বলয়ে,চিন্তা-চেতনায়, শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গনে প্রচুর দেখি। এ সব আমাদের ম্গ্ধু করে, কিন্তু আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয় না। এদের কর্মকা- আমাদের চমৎকৃত করে, কিন্তু চমকিত করে না। প্রথাগত মেধা দেয় সীমারেখার মধ্যে উৎকর্ষতা নিশ্চিত করে, ব্যতিক্রমী প্রতিভা সে সীমারেখাকেই ভেঙ্গে নতুন দিগন্তের জন্ম দেয়। প্রথাগত মেধা দেখে আমরা বুঝি যে এরা সাধারণের চেয়ে আলাদা, ব্যতিক্রমী প্রতিভা আমাদের বুঝিয়ে দেয়, যে এরা সময়ের আগে জন্মগ্রহন করেছেন।

দ্বিতীয়ত; সৃষ্টিশীলতা ও সৃজনশীলতা ব্যতিক্রমী প্রতিভার একটি বড় দিক। একই সঙ্গে সব সৃষ্টিশীলতা আর সৃজনশীলতার পেছনে থাকে একটি স্বপ্নদৃষ্টি এবং একটি অস্থিরতা। সৃষ্টিশীলতা ও সৃজনশীলতার জন্যে একটি স্বপ্নের দরকার আছে। ব্যতিক্রমী প্রতিভার সর্বদাই একটি স্বপ্নদৃষ্টি থাকে। কখনও কখনও সে দৃষ্টি সময়ের আগে চলে আসে – সাধারণ মানুষ না পারে সেটা ধরতে, না পারে সেটা বুঝতে, না পারে তার কদর করতে। তখন সে প্রতিভাকে আমরা ভুল বুঝি, তার সম্পর্কে আমরা সন্দেহ পোষণ করি, তার মূল্যায়ন করতে আমরা ব্যর্থ হই। অনেক সময়ে তার মস্তিস্কের সুস্থতা সম্পর্কে আমরা প্রশ্ন তুলি।আসলে ব্যতিক্রমী প্রতিভার উন্মত্ততা আর উন্মাদের উন্মত্ততার মধ্যে ভেদরেখা কখনো কখনো খুব সূক্ষ্ম।

সৃষ্টিশীলতা ও সৃজনশীলতার জন্যে প্রয়োজন আছে একটি অস্থিরতার। সন্তুষ্টি কখনও সৃষ্টিশীলতাকে তার তুঙ্গে নিয়ে যেতে পারে না। এই অস্থিরতা, এই অতৃপ্তি থেকেই ব্যতিক্রমী প্রতিভা তৈরি করেছেন এমন সব সাহিত্য ও শিল্পকর্ম, যা দেখে সাধারণ মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে, যুগ থেকে যুগান্তরে প্রশ্ন তুলেছে, ‘এও কি সম্ভব? মানুষ এমনটা সৃষ্টি করতে পারে’?

ব্যতিক্রমী প্রতিভার স্বপ্নদৃষ্টি এবং তার অস্থিরতার দু’টো বিপদ আছে। এক সে স্বপ্নদৃষ্টি যদি শুধু স্বপ্নই থেকে যায় এবং সেটা যদি ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ উল্লসিত হয়ে কোনো কিছু সৃষ্টি না করে, তাহলে দৃষ্টি আর সৃষ্টির মাঝে ফারাকের কারণে সে স্বপ্নদৃষ্টি এবং তার দ্রষ্টা বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। দুই, সৃষ্টিশীল অস্থিরতা যদি গঠনমূলক পথে চালিত না হয়, তাহলে তা ব্যতিক্রমী প্রতিভাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এটা জানা কথা, সৃষ্টিশীল ব্যতিক্রমী প্রতিভা নতুন কিছু গড়তে গেলে পুরোনোকে ভাঙবেই খোল-নলচে পাল্টাবেই সে। তা সেটা সাহিত্যের হোক, কিংবা শিল্পকলারই হোক। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যে, অনেক সময় ভাঙ্গার প্রমত্ত আনন্দে বহু ব্যতিক্রমী প্রতিভা তার জীবন পথে ভেঙ্গেই যায় শুধু, গড়ার কথা তার মনেই হয় না, কিংবা গড়ার সময়ও সে পায় না।

তৃতীয়ত; ব্যতিক্রমী প্রতিভাবান মাত্রেই সাধারণ মানুষকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে। পতঙ্গ যেমন আকর্ষিত হয় আলোর দ্বারা এবং তারা সর্ব অর্থেই গ্রাস করে নেন আকর্ষিত ব্যক্তিটিকে। মাকড়সা যেমন গ্রাস করে পোকা-মাকড়কে। অনেক সময়েই বহু ব্যতিক্রমী প্রতিভা তার চোখ ধাঁধানো ব্যক্তিত্বের কারণে আকর্ষিত ব্যক্তিটির জন্যে একটি নতুন কৃত্রিম বাস্তবতার জন্ম দেন- যার সঙ্গে আসল বাস্তবতার কোনো যোগাযোগ নেই। ফলে, আকর্ষিত ব্যক্তিটি স্বাভাবিক চিন্তা-চেতনা হারিয়ে প্রতিভাটির প্রভাব-বলয়ের শিকার হয়ে পড়েন। বহু ক্ষেত্রেই এর ফল শুভ হয় না। কারন আকর্ষিত ব্যক্তিটি যখন সত্যিকারের বাস্তবতার সন্মুখীন হন, কিংবা একটি অচিন্তনীয় দুর্ঘটনা যখন তাকে আঘাত করে, তখন অনেক সময়েই তার পক্ষে মন ও জীবনের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হয় না। তিনিও ধ্বংস হয়ে যান। উল্কা বা ধূমকেতু নিজে যেমন পুড়ে শেষ হয়ে যায়, তেমনি পৃথিবীর যেখানে পড়ে, সে জায়গাটাও জ্বালিয়ে দেয়।

‘যে যায়, সে যায়’ – অনেক সময়েই কোনো জানান না দিয়ে এবং সময়ের রীতি-নীতি না মেনেই- ঐ বিমল করের পর্যবেক্ষণের মতোই। কিন্তু আমরা যারা পেছনে পড়ে থাকি, তাদের ঐ চলে যাওয়া মেনে নিতে বড় কষ্ট হয়। মনে হয়, কেমন করে বলবো ‘যেতে নাহি দিবো’? হায়, সেই নিশ্চিত শক্তি কি আমাদের আছে? বরং এইটুকুই বলা যাক্,

‘ব্যথিত হৃদয় হতে বহু ভয়ে, বহু লাজে

মর্মের প্রার্থনা শুধু ব্যক্ত করা সাজে,

এ জগতে, শুধু বলে রাখা,

‘যেতে দিতে ইচ্ছা নাহি’।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ