প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বদ্ধ বেঁচে থাকা

মারুফ ইসলাম : সমাজের বায়ু বিষিয়ে উঠেছে। চারদিকে শুধু অসহিষ্ণুতার বিষবাষ্প। কী চায়ের দোকান, কী ড্রয়িংরুম, কী সোস্যাল মিডিয়া—-সর্বত্র শুধু হিংসার চাষাবাদ। এক একটা ঘটনা ঘটে আর পুরো জাতি দুই দলে ভাগ হয়ে ঝগড়ার উৎসবে মেতে ওঠে। এই ট্রেন্ডের সর্বশেষ উদাহরণ বোধকরি মাশরাফি বিন মর্তুজা আর হিরো আলম। জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মাশরাফি সম্প্রতি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। হিরো আলম কিনেছেন জাতীয় পার্টি থেকে। তাঁরা উভয়েই আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনে নিজ নিজ এলাকা থেকে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করতে আগ্রহী। ব্যাস! সমগ্র দেশ বিভক্ত হয়ে গেলো দুই দলে। মাশরাফি কেন রাজনীতিতে বনাম মাশরাফি কেন নয় রাজনীতিতে? একপক্ষ আরেক পক্ষকে অকথ্য ও অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেই যাচ্ছে। হিরো আলম প্রসঙ্গেও চলছে একই সার্কাস। এই সার্কাসে শুধু আপামর জনসাধারণই যোগ দেয়নি, যোগ দিয়েছেন কতিপয় সাংবাদিকও। সাংবাদিক বন্ধুরা আবার কয়েক কাঠি সরেস। তাঁরা হিরোকে লাইভ অনুষ্ঠানে ডেকে এনে সরাসরি ব্যক্তি আক্রমণ করছেন! বলা হচ্ছে, তিনি সংসদে গেলে সংসদের পবিত্রতা নষ্ট হবে। ইত্যাদি। ইত্যাদি।

এইসব বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ আমরা সমাজের প্রায় সর্বক্ষেত্রেই লক্ষ করছি। রোগীরা বিশ্বাস করেন না ডাক্তারকে, ডাক্তাররা পাত্তা দেন না রোগীকে। শিক্ষকরা নির্যাতন করেন ছাত্রীদের, শিক্ষার্থীরা সম্মান করেন না শিক্ষকদের। ব্যবসায়ীরা শ্রদ্ধা করেন না খদ্দেরদের, খদ্দেররা বিশ্বাস করেন না ব্যবসায়ীদের। এই-ই চলছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ শব্দটি প্রায় বিলুপ্ত হতে বসেছে।

যামানা বহুত খারাপ যাচ্ছে! সময়টা বড্ড বেহুদা। বুকারজয়ী ঔপন্যাসিক জর্জ স্যান্ডার্স যাকে বলছেন ‘উদ্ভট সময়’। এবছর বুকার পুরস্কার গ্রহণের অনুষ্ঠানে স্যান্ডার্স তাঁর বক্তৃতায় বলেন, ‘‘আমাদের এই ‘উদ্ভট সময়’-এর কেন্দ্রে নিহিত একটি সরল প্রশ্ন: আমরা কি এই সময়কে মোকাবিলা করব বর্জন, প্রত্যাখ্যান, নেতিবাচক আচরণ এবং হিংসা দিয়ে, না কি বিশ্বাসের পিঠে সওয়ার হয়ে প্রাণপণ চেষ্টা করব ভালোবাসা দিয়ে সমাধান করতে?’

পুরো দুনিয়া যেন স্যান্ডার্সের এই প্রশ্নের উত্তরে হিংসাকে বেছে নিতেই তৎপর। নির্বাচনের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে গিয়ে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে প্রাণ গেল কয়েকজনের। কেবল তারা অন্য গ্রুপের বলেই কি এই পরিমাণ ঘৃণা জন্মে গেল্?ো অন্য পাড়ার লোক এই পাড়ায় ঘুরঘুর করছে দেখেই কি তাকে লাঠিসোটা নিয়ে দাবড়িয়ে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে ফেলার যৌক্তিকতা একগুচ্ছ মানুষের হৃদয়ে ঢুকে পড়ল? বউয়ের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে বলে সন্দেহবশত বউয়ের চাচাতো ভাইকে কুপিয়ে খুন করতে হবে? প্রতিপক্ষের অন্যায় আচরণ নিয়ে ফেসবুকে লিখলেই তাকে চড়থাপ্পর দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে বের করে দিতে হবে? স্কুলের দুই সহপাঠীর ঝগড়াকে কেন্দ্র করে বাবা মাকেও কি মারামারিতে লিপ্ত হতে হবে? পরিবহন ধর্মঘটের সময় পরীক্ষা দিতে বের হয়েছে বলেই কি শিক্ষার্থীর মুখে পোড়া মবিল ঘষে দিতে হবে? কানধরে উঠবস করাতে হবে?

মানুষের আবহটি হয়ে উঠছে অবিশ্বাসের, আতঙ্কের, ঘৃণার। এই পরিবেশ গড়ে ওঠার পিছনে রাষ্ট্রেরও কি কোনো দায় নেই? নিশ্চয় আছে। রাষ্ট্র ধর্মীয় আগ্রাসন দিয়েছে ও সামাজিক নিরাপত্তা দিতে পারেনি। ফলে শিক্ষার্থীদের লাগাতার আত্মহত্যা, যুবসমাজের বেকারত্ব, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, নিরাপত্তহীনতা, ন্যায় বিচারপ্রাপ্তির অনিশ্চয়তা ইত্যাদি আমাদের সার্বিক বিপন্নতা বাড়িয়েই চলেছে। কিন্তু এই সবকিছুই কি হিং¯্রতার ব্যাখ্যাটিকে বৈধতা দেয়? এই বদ্ধ বেঁচে থাকা কি চলতেই থাকবে?

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ