প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফিরে এসো সন্তানেরা, ‘নক্ষত্রের রূপালি আগুনভরা রাতে!’

অসীম সাহা : ব্যক্তিগত জীবনে মান-অভিমান মানুষের অন্তর্গত অনুভূতি থেকে জাগ্রত এক ধরনের প্রক্রিয়া, যা কখনো সামান্যতেই অপসৃত হয়, কখনো আবার তা এমন রূপ ধারণ করে যে, তা চিরকালীন বিচ্ছিন্নতায় পরিণত হয়। বিশেষত প্রেমিক-প্রেমিকার ক্ষেত্রে কখনো কখনো তা আত্মহননের পথ বেছে নিতেও প্ররোচিত করে। কিন্তু রাজনীতিতে এই মান-অভিমান যখন চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে, তখন তা এমনকি প্রতিহিংসায়ও পরিণত হয়। তখন বাবা, মা, ভাই, বোন অথবা প্রেমিক-প্রেমিকাও তুচ্ছ হয়ে যায়। প্রতিহিংসার আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে অন্তরমহল। সে-এক অসহনীয় জ্বালা। আর তা যদি হয় উপেক্ষা থেকে উত্থিত, তা হলে প্রতিশোধ না নিতে পারা পর্যন্ত ভেতরের আগুন কিছুতেই নির্বাপিত হয় না।

কথাগুলো বললাম, আওয়ামী লীগ থেকে চলে যাওয়া অথবা বিতাড়িত হয়ে যাওয়া নেতানেত্রীদের সম্পর্কে। যারা বিতাড়িত হয়েছেন, তাদের মধ্যে যাদের অনেককেই আওয়ামী লীগের জন্য ক্ষতিকর বিবেচনা করা হয়েছে, তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কিছু আছেন, যারা বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে খুন করার পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। তাই ১৫ আগস্টের পর তারা খুনিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আওয়ামী লীগের জাহাজ থেকে এক লাফে রক্তের জাহাজে উঠে পড়ে খুনি মোশতাক ও তাদের হত্যাকারীদের সঙ্গে আলিঙ্গন করে উল্লাসে ফেটে পড়েছেন। তাদের বিতাড়িত করতে হয়নি, তারা রক্ততাড়িত হয়ে খুনের নেশায় আওয়ামী লীগ থেকে চলে গেছেন। অতএব তাদের দায় আওয়ামী লীগের নয়।

কিন্তু যারা ১৫ আগস্টের পরও আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছিলেন, বঙ্গবন্ধুহত্যার প্রতিশোধ নিতে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন; কিংবা নিদেনপক্ষে বিশ্বাসঘাতকতা করে অন্য দলে গিয়ে ভেড়েননি অথবা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে একেবারে দূরে সরে যাননি, তারা কেন এখনো দলের বাইরে? সব ঘটনার অন্তরালের অনেক ঘটনা হয়তো আমাদের জানা নেই। কিন্তু যা প্রকাশ্য, তা নিয়ে আমাদের মনে যদি কোনো প্রশ্নের উদয় হয়, তা হলে কি তাকে খুব অকারণ বলে উড়িয়ে দেয়া যাবে?

আমি জানি না, এই ব্যাপারটা নিয়ে আওয়ামী লীগ কখনো পুনর্মূল্যায়নের চিন্তা করেছিলো কিনা? আমার জানামতে, ১৯৭৫ সালে ‘বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠিত হবার পর অনেকে দল ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাকশাল বিলুপ্ত হলে মহিউদ্দিন আহমেদকে সভাপতি ও আবদুর রাজ্জাককে সাধারণ সম্পাদক করে পুনর্গঠিত বাকশাল বেশকিছুদিন কার্যক্রম পরিচালনার পরেও আবদুর রাজ্জাককে ফিরিয়ে এনে তাঁকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও দেয়া হয়েছিলো। আরো অনেককেই খুব সক্রিয় না রাখলেও তারা জায়গা পেয়েছিলেন দলে। যদি তাই হয়, তা হলে পরবর্তীকালে খুব গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত না হলে তাদের কেন পুনরায় দলে ফিরিয়ে নেয়া হয়নি? এতে কি আওয়ামী লীগের খুব লাভ হয়েছে? আমার কিন্তু আজো তা মনে হয় না। বরং এরা থাকলে দল শক্তিশালী হতো! আওয়ামী লীগ যদি ভাবে, এরা জীর্ণ মলিন, এরা অকেজো; তা হলে হঠাৎ করে এতোদিন পর তারা হুশ করে অতল জলের নিচ থেকে ভেসে উঠে সক্রিয়ভাবে জাতীয় যুক্তফ্রন্টে যোগ দিয়ে বিএনপির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধলেন কী করে? আওয়ামী লীগকে মনে রাখতে হবে, পচা পিনে পা কাটলেও কখনো কখনো তা থেকে গ্র্যাংগ্রিন হতে পারে! অতএব এদেরকে খুব ছোট করে দেখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে মনে করি না। যারা অন্যকিছুতে পারে না, তারা কিন্তু ষড়যন্ত্রে অত্যন্ত পটু হয়। অনেক সময় প্রতিহিংসা থেকেও কেউ কেউ খুনি হয়ে ওঠে। এরা যাতে সে-ধরনের কাজে লিপ্ত হতে না পারে, আওয়ামী লীগকে সেদিকে খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে হবে।

আর যারা নানা কারণে আওয়ামী লীগ ছেড়ে চলে গেছেন, যারা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে নৌকার মাঝি কিংবা যাত্রী হয়েছিলেন, যারা বঙ্গবন্ধুর একটি ইশারাতেই তাঁর জন্যে জীবন দিতে পর্যন্ত প্রস্তুত ছিলেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলি, আপনারা কেন নৌকা ফেলে, বঙ্গবন্ধুকে ফেলে অন্য ফেরির যাত্রী হয়েছেন বা হবেন? আপনারা কেন ভুলে যাবেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শরীরে বঙ্গবন্ধুর রক্তই প্রবাহিত হচ্ছে? আপনারা কি আর একটি ১৫ আগস্ট কিংবা ২১ আগস্টকে সমর্থন করেন? আপনারা চান বিএনপির রোষানলে পড়ে শেখ হাসিনার জীবনদীপ নিভে যাক? আপনারা কি সত্যি ভাবেন, আপনাদের নেপথ্যের চাণক্যরা গণতন্ত্রের কথা বলে আপনাদের সঙ্গে ঐক্য করলেও সত্যিকার গণতন্ত্র এদেশে প্রতিষ্ঠিত করবে? বিএনপির গণতন্ত্রের নমুনা কি শেখ হাসিনার গণতন্ত্রের চেয়েও অনেক মসৃণ ছিলো? যারা চলে গেছেন, বঙ্গবন্ধুর সেইসব সৈনিকের প্রতি আমার আহ্বান, আপনারা তো বঙ্গবন্ধুর সন্তান। যে কোনো কারণেই হোক, নিজ ঘর থেকে মুখ ফিরিয়ে দূরে সরে গেলেও এখনো আপনারা আপনাদের বুকে বঙ্গবন্ধুকেই লালন করেন। তাই অভিমান করে আত্মঘাতী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে জাতির সমূহ সর্বনাশ ডেকে আনবেন না। আওয়ামী লীগ কিংবা ‘শেখ হাসিনা-বিরোধী’ ফ্রন্টের কোনো নেতারই ‘ইগো’ দেখানোর সময় এটা নয়। তাই আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা এবং শেখ হাসিনা-বিরোধী আওয়ামী লীগের সাবেক নেতাদের কাছে অনুরোধ, উভয়েই ‘ইগো’ ঝেড়ে ফেলে আবার একত্রিত হোন। কোনো এক ‘নক্ষত্রের রূপালি আগুন ভরা রাতে’ ফিরে এসে সকলে মিলে একাত্তরের চেতনায় জাগ্রত হয়ে দেশটাকে হায়েনার হাত থেকে রক্ষা করুন।

লেখক : কবি ও সংযুক্ত সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়