প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কোন্দলকে ভয় আওয়ামী লীগের, নীরব ভোটের আশা বিএনপির

অনলাইন ডেস্ক : একাদশ সংসদ নির্বাচন আসন্ন। ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলতে যা বোঝায়, সেটা মূলত নৌকা ও ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। গত সংসদ নির্বাচন বর্জন করলেও এবার বিএনপি নির্বাচন করছে। ফলে এবার ভোটের মাঠ সরগরম।

রাজধানীর মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের প্রবেশ ফটকের সামনেই শাকিলের চায়ের দোকান। সেখানে বসে কথা হয় স্থানীয় কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে। এই এলাকাটি ঢাকা-১৪ আসনের অন্তর্ভুক্ত।

খালেক মিয়া ঢাকা উত্তর সিটির ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার। এলাকার নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নৌকার প্রার্থী বলেন আর ভোটার বলেন, তাদের প্রকাশ্যেই দেখা যায়। কিন্তু ধানের শীষের কোনো প্রার্থীকে আজও দেখিনি। আওয়ামী লীগের আসলাম-তুহিনসহ অনেকেই মনোনয়নের জন্য দৌড়ান, কিন্তু ধানের শীষের কোনো লোক নাই।’ তাঁর পাশেই বসে থাকা একই ওয়ার্ডের ন্যাংড়াপট্টির ভোটার মো. সেলিম মিয়া বলেন, ‘নৌকার প্রার্থী আর নেতা দেখা গেলেও ধানের শীষের নেতারা এখনো প্রকাশ্যে মাঠে নামেননি। কিন্তু ভোটাররা ঘাপটি মেরে বসে আছে। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ঠিকই ওরা ওদের প্রার্থীকে ভোট দেবে।’ ট্রাক ড্রাইভার আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ভোট বেশি, সঙ্গে দলাদলিও বেশি। কোন্দলের কারণেই আওয়ামী লীগ বিপদে পড়তে পারে।’

রূপনগর পানির ট্যাংকির সামনে কথা হয় আলাউদ্দিন ও সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে। দুজনই আসলামুল হক ও তুহিনের প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, আওয়ামী লীগের আসলামকে দিলে তুহিনের নেতাকর্মীরা মাঠে থাকবে না। আবার তুহিনকে দিলে আসলামের নেতাকর্মীরা মাঠে সক্রিয় হবে না। ঐক্যবদ্ধ থাকলে এই আসন আওয়ামী লীগের ঘরেই যাবে, তা না হলে বিএনপির ঘরে যাবে।

গত বুধবার সরেজমিনে গিয়ে এমন চিত্রই পাওয়া গেল।

ঢাকা-১৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আসলামুল হক আসলাম। ২০০৮ সালে বিএনপির প্রার্থী এস এ খালেককে পরাজিত করে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দ্বিতীয়বারের মতো আসলাম সংসদ সদস্য নির্বাচত হন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসলামুল হকের জন্য সহজ হবে না। কারণ নিজের দলের মধ্যেই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে পড়েছেন তিনি। সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তর যুব মহিলা লীগের সভাপতি সাবিনা আক্তার তুহিন, দারুস সালাম থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মাজাহারুল হক মাজাহার ও দারুস সালাম থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী ফরিদুল হক হ্যাপিও নৌকার টিকিট পেতে সমানতালে তৎপর। চলচ্চিত্র অভিনেতা মনোয়ার হোসেন ডিপজলও আওয়ামী লীগের টিকিট পেতে দলীয় মনোনয়ন ফরম কিনেছেন।

অন্যদিকে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য এস এ খালেক বার্ধক্যজনিত কারণে অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। তাঁর ছেলে এস এ সিদ্দিক সাজু দলীয় মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। বিএনপি থেকে মনোনয়নের শক্ত দাবিদার ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বজলুল বাসিত আঞ্জুও।

স্থানীয় ভোটাররা বলছে, বর্তমান সংসদ সদস্য আসলামুল হক আসলাম মনোনয়নের জন্য শক্ত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। সংবাদমাধ্যমে আসলামুল হক আবার নৌকার প্রার্থী হচ্ছেন—এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এতে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের একটি অংশ ক্ষুব্ধ। আসলামের বিষয়ে তারা হতাশা প্রকাশ করে।

দারুসসালাম থানা আওয়ামী লীগের একজন প্রবীণ নেতা ক্ষুব্ধ কণ্ঠে আসলামের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘আসলামুল হক নিজ দলের নেতাকর্মীদের খুব বেশি মূল্যায়ন করেননি। আমরা প্রত্যাশা করছি আওয়ামী লীগের জন্য এবং দলের সাধারণ নেতাকর্মী ও ভোটারদের কাছে জনপ্রিয় এমন নেতাকেই মনোনয়ন দেবেন নেত্রী।’

মিরপুর লালকুঠি এলাকার বাসিন্দা আসলাম সমর্থকরা দাবি করে, ঢাকা-১৪ আসনে তাঁর বিকল্প কোনো প্রার্থী নেই। তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হলে জয় পেতে কোনো বেগ পেতে হবে না। না পেলে এই আসনে বিজয় দলের কঠিন হবে।

আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছে, নানা কারণে বিতর্কিত বর্তমান সংসদ সদস্য আসলামুল হকের কারণে বিভক্ত হয়ে আছে ঢাকা-১৪ আসনের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তারা মনে করছে, বিএনপির প্রার্থীর চেয়ে বড় ভয় আওয়ামী লীগের কোন্দলকে।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য আসলামুল হকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়; কিন্তু তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর বড় ভাই জাতীয় পার্টির (মঞ্জুর) প্রেসিডিয়াম মেম্বার মফিজুল হক বেবু বলেন, ‘আসলামই মনোনয়ন পাচ্ছে, পেলে বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে।’ অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এমন অভিযোগ কিছু মানুষ করবেই। ভোটের আগে এসব কিছুকে পাত্তা দেওয়া যাবে না। সাধারণ ভোটাররা ঠিকই ভোট দিয়ে বিজয়ী করবে আসলামকে।’

সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য সাবিনা আক্তার তুহিন বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। নৌকার টিকিট পেতে দলীয় উচ্চপর‌্যায়ে জোর লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। আসলামুল হকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মিটিং-মিছিলসহ দলীয় কর্মসূচি পালন করেছেন।

তুহিনের কর্মী-সমর্থকরা বলছে, নেত্রীর দুঃসময়ে তুহিনের ভূমিকা কী ছিল সেটা দেশের মানুষ দেখেছে। বিগত ১০ বছর তৃণমূলের নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন তিনি। তুহিনই এবার দলের মনোনয়ন পাবেন। তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া না হলে আওয়ামী লীগের বিজয় কঠিন হবে।

সাবিনা আক্তার তুহিনের সঙ্গেও মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর ছোট বোন ঢাকা জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মামণি ভূঁইয়া মণি বলেন, ‘সাবিনা আপা তৃণমূলের রাজনীতি করেই এ পর্যন্ত এসেছেন। এলাকার উন্নয়নের জন্য তিনি রাত-দিন পরিশ্রম করেছেন। তিনি এলাকায় বেশ জনপ্রিয়। ওনাকে মনোনয়ন না দিলে দল ভুল করবে।’

দলীয় মনোনয়নের বিষয়ে আশাবাদী দারুস সালাম থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মাজহারুল হক মাজহার। তিনি বলেন, ‘দেখুন ১৯৮১ সাল থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতি দিয়ে আমার শুরু। ছিলাম সরকারি বাঙলা কলেজের ছাত্রলীগের সভাপতি, একই কলেজের ছাত্রসংসদের নির্বাচিত জিএস (সাধারণ সম্পাদক) ছিলাম। সংগঠনটির ঢাকা উত্তর শাখার সভাপতি ছিলাম এবং কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদের দায়িত্বও পালন করেছি। সেই দুঃসময়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে এসেই এখন দলের মনোনয়ন চাইছি। আশা করছি নেত্রী আমাকে মনোনয়ন দেবেন।’

অন্য প্রার্থী দারুস সালাম থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী ফরিদুল হক হ্যাপি বলেন, ‘আমরা এখন নেত্রীর দিকে তাকিয়ে আছি। নেত্রী যাঁকে মনোনয়ন দেবেন তাঁর পক্ষেই কাজ করব। আমাদের নেত্রী বিচক্ষণ নেত্রী, বিশ্বনেত্রী, তিনি আমাদের আসনে যোগ্য প্রার্থী মনোনয়ন দিতে ভুল করবেন না।’

চলচ্চিত্র অভিনেতা ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার মনোয়ার হোসেন ডিপজলও মনোনয়ন পেতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন এবং বিএনপির টিকিটে দুই মেয়াদে ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের (গাবতলী) কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। তবে ২০১৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দেন তিনি।

ডিপজলের সমর্থকরা জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের রাজনীতিতে অনুপ্রাণিত হয়েই আওয়ামী লীগে যোগ দেন ডিপজল। মনোনয়ন পেলে তিনি নির্বাচিত হবেন।

আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের প্রকাশ্যে দেখা গেলেও বিএনপির কোনো সম্ভাব্য প্রার্থীকেই প্রকাশ্যে ভোটের মাঠে দেখা যাচ্ছে না এখনো। দলটির নেতাকর্মীরা জানায়, একের পর এক মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে পালিয়ে থাকায় বিএনপির সম্ভাব্য কোনো প্রার্থীকেই কাছে পায়নি ভোটাররা।

নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন এস এ খালেক। এর আগে এ এলাকায় তিনি পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আগামী নির্বাচনে এখানে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তাঁর ছেলে এস এ সিদ্দিক সাজু মনোনয়ন পেতে চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাঁর সমর্থক বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী জানায়, নেতা দেখা না গেলেও ভোটাররা ঠিকই ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে ভুল করবে না। নীরব ভোটারেই বিএনপি প্রার্থী বিপুল ভোটে জয়ী হবেন। সূত্র: কালের কন্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ