প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইসির যত চ্যালেঞ্জ

আমাদের সময় : আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবারই প্রথম দলীয় সরকারের অধীনে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করা বিএনপি ইতোমধ্যেই নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে ক্ষমতাসীন দল ও পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাত আর হয়রানির বিস্তর অভিযোগ তুলে ধরেছে। এ ছাড়া ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত সব দলের নেতা খোদ ইসির বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের নানা অভিযোগ তুলে ধরেছে। গতকাল বৃহস্পতিবারও ঐক্যফ্রন্টের সেমিনারে

দলগুলোর নেতারা বলেছেন, ইভিএম ব্যবহার করা হলে সরকারের বিরুদ্ধেই শুধু নয়, ইসির বিরুদ্ধেও মামলা করা হবে। বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম বিভিন্ন দেশ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘও জানিয়েছে, একাদশ সংসদ নির্বাচন যেন সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, সে দিকে তারা দৃষ্টি রেখেছে। সব মিলিয়ে ব্যাপক চাপে আছে ইসি। এমন পরিস্থিতিতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান ইসির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময়ই বলে দেবে, ইসি কীভাবে চাপ মোকাবিলা করে এ চ্যালেঞ্জ উতরে যায়।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা গত ১৩ নভেম্বর রিটার্নিং কর্মকর্র্তাদের উদ্দেশে বলেন, ২০১৪ সালে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলেও সব দল অংশ নেয়নি। এর আগে কখনো রাষ্ট্রপতি শাসিত, কখনো সেনাবাহিনীর অধীনে, কখনো কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছে। এবার নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এবারই প্রথম দলীয় সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নির্বাচন যদি সফল হয়, তা হলে পরবর্তী সময়ে হয়তো সরকার ও সংসদ থেকেই নির্বাচন পরিচালিত হবে; স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হবে। আপনাদের মাধ্যমেই নতুন এ ইতিহাস তৈরি হবে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এ পর্যন্ত ইসিতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি অনেক অনেক অভিযোগ লিখিতভাবে দাখিল করেছে। তাদের দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক রাজনৈতিক মামলা, পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণ ও হয়রানি, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব করার অনেক অভিযোগ ইসির কাছে জমা পড়েছে।

গত ১৮ নভেম্বর তফসিল ঘোষণার পরও তাদের ৭৭৩ নেতাকর্মী গ্রেপ্তারের দাবি করে এর প্রতিকার চেয়ে সিইসির কাছে চিঠি দিয়েছে বিএনপি। দলটির বিরুদ্ধে করা মামলার তালিকা প্রসঙ্গে গতকাল সিইসি কেএম নূরুল হুদা বলেন, মামলার বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে শুরুতে ৪ থেকে ৫ হাজার জনের একটি তালিকা দেওয়া হয়। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সে সব মামলা ২০১৪ সালের নির্বাচনেরও আগের। আর এবারের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে করা মামলার পূর্ণাঙ্গ তথ্য বিএনপির তরফ থেকে পাওয়া যায়নি। তাই ব্যবস্থা নিতে পারছি না। গত ২০ নভেম্বর পৃথক পাঁচটি চিঠি সিইসি বরাবর জমা দেয় ঐক্যফ্রন্ট। এতে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সভা, জেলা প্রশাসনে নিয়োজিত ৪৫ উপদেষ্টাকে প্রত্যাহার করা, মনোনয়নবিষয়ক কর্মকা- চলাকালে বিএনপি অফিসের সামনে ড্রোন উড়িয়ে দলটির নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। দাবি জানানো হয়, প্রশাসনে যথাযথ রদবদলের মাধ্যমে নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি করার। এ প্রসঙ্গে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, ঢালাও রদবদল প্রস্তাব ইসি গ্রহণ করবে না। অভিযোগ সুনির্দিষ্ট হতে হবে। সে ক্ষেত্রে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সর্বশেষ, গতকাল পুলিশের ৭০ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে এবং প্রশাসনের ২২ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের দাবিসহ ১৩ দফা অভিযোগ দাখিল করে এসবের প্রতিকার চেয়েছে বিএনপি।

ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন বাংলাদেশে নতুন। এর আগের নির্বাচনে (দশম সংসদ নির্বাচন) সব দল অংশগ্রহণ করেনি। সেই নির্বাচন নিয়ে সব মহলে প্রশ্ন রয়েছে। এর মধ্যে দলীয় প্রতীকে চলতি বছর অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচন নিয়েও কমিশনকে অনেক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এবারের সংসদ নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ সৃষ্টি করা ইসির জন্য বড় চাপের। তবে কমিশন সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ইসি কর্মকর্তারা আরও জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নই সবচেয়ে বেশি পর্যবেক্ষক পাঠায়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে সহিংসতার কারণ দেখিয়ে সংস্থাটি প্রথম মুখ ফিরিয়ে নেয়। এর পর সংস্থাটির পথ ধরে অন্যরাও সে বছর নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসেনি। ২০০৮ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে এ সংস্থাটিই সর্বাধিক পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছিল।

জানা গেছে, ইইউ আসন্ন জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ইতোমধ্যেই অসম্মতি জানিয়েছে। ইসি এখন বিদেশি পর্যবেক্ষকদের নিয়ে আসার বিষয়ে জোর প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। যদিও বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সংস্থার স্বপ্রণোদনার ওপর নির্ভর করে এবং সংস্থাগুলোকেই স্বেচ্ছায় ইসির কাছে অনুমতিজনিত আবেদন করতে হয়। ইইউ মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পর উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক ডেকেছে ইসি। মূল উদ্দেশ্য, বিদেশি কোনো সংস্থা নির্বাচন পর্যবেক্ষণের আবেদন করলে যেন দ্রুত ইতিবাচক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। আগামী ২৫ নভেম্বর বৈঠকটি হওয়ার কথা রয়েছে।

এদিকে আসন্ন নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসির চাপে থাকা প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে ইসি এখন চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছে। তারা ‘হট সিটে’ বসে আছে। ইসি এ চাপ সহ্য করতে পারবে কিনা সেটাই দেখার বিষয়। তিনি মনে করেন, সততার সঙ্গে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করলে জাতিকে সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব। অর্পিত দায়িত্ব ইসি যথার্থভাবে পালন করতে পারে কিনা সময়ই তা বলে দেবে বলে মন্তব্য করেন বদিউল আলম মজুমদার।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ