প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘ছোট আত্মার দেশে বড় আত্মার মানুষের কথা বলছি’

কামরুল হাসান মামুন: ছোট আত্মার দেশে জন্ম নেওয়া বড় আত্মার এক বিশাল মানুষের কথা বলব:

আজ ২১-শে নভেম্বর। আজকের এই দিনে পদার্থবিজ্ঞানে একমাত্র মুসলমান নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর আব্দুস সালামের মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৯সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সংবাদ পেয়ে প্রথম রিঅ্যাকশনে বলেছিলেন “I am the first Muslim who has got this prize for science”! বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবস্থান কোথায় তা প্রফেসর সালামের এই এক বাক্যেই ব্যক্ত হয়েছে। নিজের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তে নিজেকে মুসলিম হিসাবে দাবি করে সমগ্র মুসলিম জাতিকে সম্মানিত করতে চেয়েছিলেন। বেঁচে থাকাকালীন প্রতিটা মুহূর্ত নিজেকে পাকিস্তানী বলে দাবি করে গেছেন। কিন্তু পাকিস্তান তাকে মুসলিম হিসাবেও মেনে নেয়নি, আবার পাকিস্তানী হিসাবেও তাকে পাকিস্তানে থাকতে দেয়নি। প্রফেসর সালাম নিজেকে মুসলিম এবং নিজেকে পাকিস্তানী হিসাবে দাবি করলেও অন্য ধর্মের মানুষ কিংবা অন্য দেশের মানুষদের তিনি কখনো ছোট করে দেখেননি, অসম্মান করেননি। তিনি আচরণে ছিলেন একজন সেক্যুলার মানুষ।

প্রফেসর সালামের জন্ম পাকিস্তানের পাঞ্জাবে। ১৪ বছর বয়সে প্রফেসর সালাম পাঞ্জাবের মধ্যে ইতিহাসের সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে সরকারি বৃত্তি পান। সে যখন সাইকেল চালিয়ে কলেজে যেত মানুষ তখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখত। বাবার প্রচন্ড ইচ্ছে ছিল ছেলে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে চাকুরী করবে। সেখানে চাকুরী পাওয়ার জন্য তখন একটি শর্ত ছিল। প্রার্থীকে ব্রিটিশ কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রী পেতে হবে। তারই ধারাবাহিকতায় সালাম কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে দরখাস্ত করে এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট জোন্স কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। তখন স্থল জাহাজে করে পাকিস্তান থেকে ১৫ দিনের জলভ্রমণ করে ইংল্যান্ডে যান। কেমব্রিজ হলো পৃথিবীর সবচেয়ে পুরাতন এবং সবচেয়ে বিখ্যাত ইউনিভার্সিটির মধ্যে অন্যতম। সালাম ক্যামব্রিজে গণিত শাস্ত্রে পড়তে যান। ওখানে পড়তে গিয়ে তখনকার সেরা পদার্থবিদ পল ডিরাকের ক্লাস করার সুযোগ আসে।

পল ডিরাক মাত্র ২৮ বছর বয়সে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুল প্রফেসর। পল ডিরাকের ক্লাস করে ধীরে ধীরে পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা জন্মাতে থাকে এবং ডিরাকের সাথে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু ডিরাক কোন ছাত্র নেন না। তারপরও প্রফেসর সালাম ঠিক করলেন তিনি তত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের উপর কাজ করবেন। সেই সময় তার এডভাইজর পরামর্শ দেন যে ভালো পদার্থবিদ হতে হলে ভালো গণিত জানতে সেটা যেমন সত্য তাকে ভালো এক্সপেরিমেন্টাল ফিজিক্সও জানতে হবে সেটাও সত্য। তাই তার পরামর্শে সে তখন বিখ্যাত ক্যাভিনডিশ ভর্তি হন। সেই সময় গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট হিসাবে তিনি আমেরিকায় যাওয়ার সুযোগ পান। সেখানে পল মেথেউস, ওপেনহেইমার, ফাইনম্যান এমনকি আইনস্টাইনের সাথেও দেখা হয়। পদার্থবিজ্ঞানের সেসময়কার নায়কদের সাথে দেখা হওয়া কথা হওয়ার মাধ্যমে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার বাসনা পাকাপোক্ত হয়। ফলে সিভিল সার্ভিসে চাকুরী করার ইচ্ছের বিলুপ্তি ঘটতে থাকে।

ক্যামব্রিজের অভিজ্ঞতা এবং শেষে প্রিন্সটনে স্বল্প সময়ের অভিজ্ঞতা ছিল এক্সসাইটিং। কিন্তু তার কাছে পাকিস্তানে ফিরে যাওয়াও ছিল সমভাবে এক্সসাইটিং। ১৯৫১ সালে তিনি পাকিস্তানে ফিরে আসেন এবং লাহোর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তার কাছে এটাও এক্সসাইটিং ছিল! ইচ্ছে ছিল যে তার ক্যামব্রিজের শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা ছাত্রছাত্রীদের সাথে শেয়ার করে সেখানকার ছাত্রছাত্রীদের তিনি মডার্ন ফিজিক্স, কোয়ান্টাম ফিজিক্স শেখাবেন। কিন্তু লাহোর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাকে ফুটবল দলের কোচ নিয়োগ করেন। অথচ জীবনে সবচেয়ে স্পোর্টি thing তিনি যেটা করেছিলেন সেটা হলো সাইকেল চালানো। এইটা তাকে খুবই frustrated করে। তখনকার প্রশাসন এবং সহকর্মীরা বুঝতেই পারেনি সালাম ইতিমধ্যে কত বড় একজন মানুষ হয়ে উঠেছেন। তারা বুঝতেই পারেননি সে ছাত্রছাত্রীদের কত কিছু দিতে পারেন। প্রব্লেম হলো তারা তাকে সম্মান দেননি। তারা তাকে সবচেয়ে জুনিয়র লেভেলের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ দিত। যেটি আমাদের এখানেও ঘটে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েও কাকে দিয়ে কি কাজ করানো উচিত সেই জ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপদে যারা থাকেন তাদের নেই বললেই চলে। প্রফেসর সালাম তখন তার বাবাকে জানালো তার frustration-এর কথা। বাবাকে বললেন এখানকার সিস্টেম আমাকে দিয়ে আমার সময়ের অপচয় করাচ্ছে। আমার এখন কি করা উচিত? তার frustration-এর কথা পল মেথেউসের সাথে শেয়ার করেন এবং ১৯৫২ সালে আবার ইংল্যান্ডে ফিরে যান। সেখানে বিখ্যাত পদার্থবিদ Rudolf Peierls-এর সাথে দেখা করেন। Rudolf Peierls তাকে প্রশ্ন করেন আচ্ছা বল ফোটনের ভর শূন্য ঠিক আছে কেন নিউট্রিনোর ভর শূন্য হতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর তখন খুবই চ্যালেঞ্জিং ছিল। সে চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করত।

এইদিকে ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানে ধর্মীয় দাঙ্গা শুরু হয় যেখানে সালামের আহমদিয়া সেই দাঙ্গার টার্গেট ছিল। সালাম বুঝতে পারছিল সে এবং তার পরিবারের সদস্যরা পাকিস্তানে safe না। তার পরিবারের সদস্যদের তখন লুকিয়ে থেকে জীবন বাঁচাতে হয়েছে। এইরকম অবস্থায় একটি মানুষ কিভাবে গবেষণা চালিয়ে যেতে পারে? সম্ভবত তখনই সালাম ঠিক করলেন তাকে চিরতরে পাকিস্তান ছাড়তে হবে এবং তিনি ঠিক তাই করলেন। এরপর পদার্থবিদ হিসাবে প্রফেসর আব্দুস সালামের খ্যাতি দ্রুত ছড়িয়ে যেতে থাকে। ওই সময়েই পৃথিবীর বড় বড় দেশের নেতাসহ জাতিসংঘকে তিনি বোঝাতে সক্ষম যে তৃতীয় বিশ্বের ছাত্রছাত্রীদের জন্য উন্নত দেশে একটি সেন্টার করা যাতে ওরা কিছুদিনের জন্য এসে উন্নতবিশ্বের বিজ্ঞানীদের সাথে মিশে গ্যাপটা কিছুটা ঘুচাতে পারে। তাদের বুঝিয়ে ICTP -র মত একটা সেন্টার তৈরির সহায়তার জন্য রাজি করাতে সে পেরেছিল। সে ইতালির সরকারকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছ বলেই তারা তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহায়তা করেছে। তার উদ্দেশ্য ছিল তৃতীয় বিশ্বের, বিশেষ করে দক্ষিন এশিয়ার, দেশগুলোর বিজ্ঞানীরা যেন প্রথম বিশ্বের বিজ্ঞানীদের সাথে কাজ করে বিজ্ঞান শিক্ষায় এগুতে পারে। প্রফেসর সালামের জিবদ্দসায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান আর ভারতের বিজ্ঞানীরা ICTP-তে যেতে বিশেষ কৃপা পেত। আমাদের জন্য একটা সুন্দর স্থান নির্বাচনের জন্য গোটা ইতালি ঘুড়ে ত্রিয়েস্তেকে তিনি শেষমেশ নির্বাচন করলে। অপূর্ব একটি শহর।

১৯৯১-এর সেপ্টেম্বরে আমি প্রফেসর সালামের সেন্টারের স্কলারশিপ নিয়ে condensed matter physics-এ ডিপ্লোমা করতে যাই। সেই যাওয়াটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বাঁক আনে। আমি আর আমি থাকিনি। সম্পূর্ণ নতুন মানুষ হওয়ার সুযোগ প্রফেসর সালামই করে দিয়েছিল । আমার চিন্তা, চেতনা, আমার খাবার অভ্যাস থেকে শুরু করে সব কিছুতেই পরিবর্তন ঘটেছে। আর এইসব কিছুর জন্যই ওই মানুষটার credit সবচেয়ে বেশি। ওখানে যাওয়ার তৃতীয় দিনেই প্রফেসর সালাম অসুস্থ শরীর নিয়ে আমাদের (ডিপ্লোমা ছাত্রদের) দেখতে এসেছিলেন। প্রায় দুই ঘন্টার অধিক সময় ধরে আমাদেরকে উনার জীবনের নানা ঘটনা শেয়ার করেছিলেন, নানা উপদেশ দিয়েছিলেন। কি mesmerizing কথা। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনেছিলাম।

যেই পাকিস্তান তাকে এত অবহেলা আর অনাদর করেছে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই পাকিস্তানকেই সে ভালোবেসে গেছ। তার কবর যেন পাকিস্তানেই হয় সেই ইচ্ছেও জানিয়ে গিয়েছিলেন। সেই কবরে লেখা ছিল “প্রথম মুসলিম নোবেল বিজয়ী”! সেখান থেকে মুসলিম কথাটি কেটে দেওয়া হয়। প্রফেসর সালাম বুঝিয়ে গিয়েছেন যে যেই দেশেরই হোক, আমাদের সকলের দেশপ্রেম unconditional এবং universal। তাই বলে বাংলাদেশ ভারতের মানুষকে তুমি একটুও কম ভালোবাসেননি। সত্যি বলতে কি, গোটা বিশ্বের অগনিত মানুষের জীবন তিনি বদলে দিয়েছেন। শুধু আমার ক্লাসেই ছিল ২০ জন ছাত্রছাত্রী। কেউ ছিল মঙ্গোলিয়ার, কেউ চিলির, নাইজেরিয়ার, দক্ষিন কোরিয়ার, মিশরের, ইরানের। আর ভারত, পাকিস্তান বাংলাদেশেরতো ছিলই। প্রতি বছরইতো কতজনে নোবেল পুরস্কার পায়। কয়জন পেরেছে এমন একটি সেন্টার গড়তে। শুধু বড় বিজ্ঞানী হলেই হয় না। সাথে থাকতে হয় আরো অনেক গুন আর অনেক বড় আত্মা। প্রফেসর সালাম ছিলেন সেইরকম বড় আত্মার বিশাল মানুষ।

আমরাও কি আমাদের বড় গুণীদের কদর করতে পেরেছি বা পারি?

লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ফেসবুক)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ