প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে শুটিং কমেছে এফডিসিতে

মহিব আল হাসান : একটা সময় এফডিসির একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে কখন ঘন্টা পার হয়ে যেত তা কেউ টের পেত না। সেসময় এফডিসির কোনো আয়তন না থাকলেও শুটিংয়ের সেট ফেলে শুটিং হতো বেশ কটি সিনেমার। আবার শুটিং ফ্লোর গুলোতে শুটিং করার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করতে হতো পরিচালকদের। আয়তন কম হলেও এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার জন্য অপেক্ষার কারণ ছিল কখন ক্যামেরার শর্ট নেওয়া বন্ধ হবে। বর্তমানে এই অবস্থা ভিন্ন। পুরানো জৌলস হারিয়ে ফেলেছে এফডিসি। প্রযোজক-পরিচালকরা এফডিসিতে শুটিং করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। এর কারণ জানতে পরিচালক প্রযোজকদের সাথে কথা বলে জানা যায়।

নির্মাতারা জানান, ‘এফডিসিতে শুটিং করতে গেলে সরকারি বিভিন্ন ধরণের বাধ্যবাধকতা মেনে কাজ করতে হয়। এখানে শুটিং করতে গেলেই গুণতে হয় দ্বিগুণ টাকা। কারণ হিসেবে নির্মাতারা বলছেন এফডিসিতে শুটিং করতে হলে এফডিসি থেকে লাইট, লাইটম্যান, ক্যামেরা, ক্যামেরা পার্সন, থেকে শুরু করে শুটিংয়ের সব ধরণের সরঞ্জাম নিতে হবে। আর এ কারণে বাজেটের কারণে এখানে শুটিং করাটা বাজেটের বাহিরে চলে যায়। এ কারণে বর্তমান সময়ে এফডিসিতে শুটিং করা হয় না। বাইরের থেকে অনেক বেশি ভাড়া গুনতে হয় তাদের এফডিসিতে শুটিং করতে গেলে। শিফট হিসেবে অনেক টাকা দিতে হয়, আর শুটিংয়ে সময়সীমা অতিক্রম করলে সেটা নিয়েও পোহাতে হয় ঝক্কি।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির মহাসচিব বদিউল আলম খোকন বলেন, এফডিসি এখন আর আগের মতো সুবিধা দেওয়া হয় না। এফডিসিতে শুটিংয় করতে গেলে তিনগুণের অধিক টাকা দিতে হচ্ছে। কিছু বাধ্যবাধকতা তৈরি হচ্ছে শুটিং করতে গেলে। এফডিসি থেকে ক্যামেরা নিয়ে গেলে যাতযাতের যে সময়টা চলে যায় সেসময়টারও শিফট ধরা হয়। কিন্তু আমরা যখন আগে শুটিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিলে শুধু কাজের সময়টা ধরে শিফট নেওয়া হতো। বর্তমানে যাওয়া আসার দিন ধরেও এখন শিফটের টাকা নিচ্ছে এফডিসি কর্র্র্তৃপক্ষ।

নির্মাতা খোকন আরও বলেন, এফডিসির নিয়মেই আছে যন্ত্রপাতি জমা না দিয়ে যদি প্রযোজক ও পরিচালক নিজেদের কাছে রেখে দেন তাহলে দুই শিফটের ভাড়া দিতে হবে। আর ঢাকার বাইরে দূরে কিংবা বিদেশে শুটিং করতে গেলে যাওয়া-আসার মধ্যে একদিনের বিল রাখা হবে। কিন্তু এর বাইরে তারা তিনগুণ টাকা নিচ্ছে। বলতে গেলে এফডিসির কর্মকর্তারায় নিজেদের নিয়ম মানছে না। আমরা এফডিসির এমডি কাছে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়ে গেলেও তিনি আমাদের আশ্বাস দিলেও কোনও কাজ করেননি। খোকন অয়িাগ করে বলেন, বর্তমানে যিনি এফডিসির এমডি তিনি সিনেমার লোক নান। তার কোনও সিনেমার প্রতি প্রেম নেই। আমাকে এমনও বলেছেন, প্রয়োজন হলে তিনি চলচ্চিত্রের কাজে কোনো কিছু ভাড়া দেবেন না। বিজ্ঞাপন ও টিভির কাজে যন্ত্রপাতি ভাড়া দিলেই এফডিসি চলবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এফডিসি থেকে ক্যামেরা ভাড়া নিতে আলাদা আলাদা ভাড়া দিতে হয়। মূলত ভঅড়া শিফট প্রতি পড়ে প্রতি শিফট সাড়ে চার হাজার টাকা। ক্যামেরার মূল অংশ, লেন্স ও ট্রাইপডের জন্য আলাদা আলাদা হিসাবে ভাড়া ধরা হয়। এক শিফটে আলাদা আলাদা হিসেবে ভাড়া দাড়ায় সাড়ে চার হাজার টাকা। কিন্তু সব হিসাব মিলে দাড়ায় একদিনে দুই শিফটের ভাড়া ৯ হাজার টাকা।

এছাড়া রাত ১১টার পরে শুটিং করলে প্রতিঘণ্টার জন্য অতিরিক্ত টাকা গুনতে হয় প্রযোজকের। আর রাত ১১টার পর যদি তিন ঘণ্টা পেরিয়ে যায় তাহলে এক শিফটের ভাড়া সাড়ে চার হাজার টাকা বেশি দিতে হয়। কারো যদি পুরো দিন গড়িয়ে রাত দুটা পর্যšন্ত শুটিং চলে তাহলে তার ক্যামেরার ভাড়া পড়ে সাড়ে ১৩ হাজার টাকা। অথচ বাইরের যেকোনো প্রোডাকশন হাউজ থেকে ২৪ ঘণ্টার জন্য এই রেড স্কারলেট ক্যামেরা ভাড়া পাওয়া যায় সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকায়। এফডিসিতে ১৬ ঘণ্টাতেই দিতে হচ্ছে নয় হাজার টাকা। আর ১৯ ঘণ্টা ব্যবহারে খরচ পড়ছে সাড়ে ১৩ হাজার টাকা।

মশিউল আলম বলেন, ‘আমাদের নিয়ম অনুযায়ী যাওয়া-আসার মধ্যে একদিনের ভাড়া ধরা হয়। গতমাসের ১৫ তারিখে নির্মাতা ডায়মন্ড একটা ছবির শুটিংয়ে গিয়েছিলেন, ক্যামেরা জমা দিয়েছেন ২৬ তারিখ সকালে। আমাদরে অফিস সকাল আটটায় খুললে এরপর জমা নিতে পারি আর একারণে আরও একদিনের ভাড়া বেড়ে যায়। আমাদের রাত বারোটা থেকে হিসাব ধরা হয়।
ক্যামেরা ভাড়া এত বেশি কেনও জানতে চাইলে মশিউল আলম আমাদের সময় ডট কমকে বলেন, ‘একটা ক্যামেরার মূল্য প্রায় দুই কোটি। আর একটা ক্যামের দুই বছরের উপরের সাপোর্ট য়ে না। তাই হিসাব করে আমরা ভাড়া দেয়। এসব হিসাব করে টাকাটা নির্ধারণ করেছি? আমাদের একটি বোর্ড আছে, সেখানেই ভাড়াগুলো নির্ধারণ করা হয়। যে কারণে এখানে আমাদের কিছু করার নেই।’

বাইরের হাউজগুলো কীভাবে কম ভাড়ায় একই ক্যামেরা ভাড়া দিচ্ছে, এমন প্রশ্নের জবাবে মশিউল আলম বলেন, ‘আসলে বাইরে প্রোডাকশন হাউজগুলো ব্যক্তি মালিকের, এখানে তিনি চাইলে কাউকে টাকা ছাড়াও ক্যামেরা দিয়ে দিতে পারেন। তাদের সাথে আমাদের হিসাব মিলবে না।’

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত ক্যামেরাম্যান মাহফুজুর রহমান মনে করেন, এফডিসির উচিত ভালো ছবি তৈরিতে সাহায্য করা, অথচ তারা ব্যবসা করছে। শিফট প্রতি বেশি ভাড়া ও নানা রকম নিয়মের বাড়াবাড়ির কারণে অনেক নির্মাতাই এখন আর এফডিসি থেকে ক্যামেরা ভাড়া নিতে চান না। যখন বাইরের হাউজ থেকে সেটাপ নিয়ে শুটিং করি, তখন খরচ অর্ধেক হয়ে যায়। শুটিং করার সময় আমাদের মাথায় সময় থাকে না। শুটিং তো আর ৯টা ৫টা চাকরির মতো নয়। কিন্তু দেখুন এফডিসির সেটাপ নিয়ে শুটিং করার সময় মাথায় অনেক কিছু রাখতে হয়।

এফডিসির সমালোচনা করে মাহফুজুর রহমান আরও বলেন, ‘এফডিসিকে হতে হবে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এখানে বাইরের প্রতিষ্ঠান থেকেও কম মূল্যে সব কিছু পাওয়া যাবে। ক্যামেরা, লাইট, টেকনিক্যাল সাপোর্ট কি দেওয়া যায়? তাতে করে এফডিসির সবকিছু থেকে ছাড় দেওয়া উচিত। কিন্তু তা না করে দ্বিগুণ টাকায় আদায় করছে। এতে করে এফডিসিতে সিনেমার শুটিং অনেক কম হয়েছে। ‘এফডিসির অনিয়ম ভাড়া আদায়ে চলচ্চিত্রের শুটিং কমেছে এফডিসিতে’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ