প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

তারা কি সাক্ষী গোপাল হয়েই থাকবে?

মহিউদ্দিন খান মোহন : ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেসব সংস্থা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন, তাদেরকে নির্বিকার মূর্তির মতো ভোটকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। চোখের সামনে অনিয়ম হতে দেখলেও তারা কিছু বলতে পারবেন না। বললে তাদের চাকরি থাকবে না; অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট সংস্থাটির নিবন্ধন বাতিল করা হবে। নির্বাচন কমিশন গতকাল (২০ নভেম্বর) এ ফরমান জারি করেছে। ওইদিন সকালে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে নিবন্ধিত ১১৮টি পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে ব্রিফিংকালে নির্বাচন কমিশন সচিব হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আপনারা পর্যবেক্ষণের সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন না, ছবি তুলতে পারবেন না। কেন্দ্রে যত ঝামেলাই হোক, কোনো কমেন্ট করতে পারবেন না। গণমাধ্যমের কাছে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন না। তবে, পরে প্রতিবেদন দিতে পারবেন। কোনো সংস্থার দায়িত্ব পালনকারী সদস্য যদি এ ব্যাপারে গাফিলতি করে, তাহলে সে সংস্থার নিবন্ধন বাতিল করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন ইসি সচিব।

খবরটি গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সর্বত্র তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সবাই বলছেন যে, তাহলে নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা কি সাক্ষীগোপাল হয়ে থাকবেন? এ তো হাত-পা বেঁধে সাঁতার কাটতে বলা। এর আগেও তো দেশে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন হয়েছে। সেগুলোতে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকরা থেকেছেনও। তারা নির্বাচনে কোনো অনিয়ম-কারচুপি বা গ-গোল দেখলে নিজেরা যেমন নোট নিয়েছেন, তেমনি গণমাধ্যমের কাছে প্রতিক্রিয়াও দিয়েছেন। আবার নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে প্রিজাইডিং-পোলিং অফিসারদের সঙ্গে কথাও বলেছেন। কিন্তু এবার তা করতে দেবে না নির্বাচন মিশন। কমিশনের ভাষায় নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্যই নাকি তারা এ ব্যবস্থা করছেন। কিন্তু পর্যবেক্ষকদের ছবি তোলা, গণমাধ্যমে মন্তব্য করা বা প্রিজাইডিং অফিসারের সঙ্গে কথা বলার কারণে নির্বাচন ভ-ুল বা তাতে বিঘেœর সৃষ্টি হয়েছে এমন কোনো দৃষ্টান্ত কি আছে? বরং গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকদের অনুপস্থিতির সুযোগে নির্বাচনে জাল ভোট দেয়া, ব্যালট ছিনতাই করে গণহারে সিল মেরে বাক্স ভরা, প্রতিপক্ষের এজেন্টকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া ইত্যাদি ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হয় কি না, তা দেখার জন্যই নির্বাচন পর্যবেক্ষকগণ বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করে থাকেন। বিশ্বের সব দেশেই নির্বাচন পর্যবেক্ষণের এ ব্যবস্থা রয়েছে। বলা যায় নির্বাচন প্রক্রিয়ায় এটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। তবে এটা ঠিক, নির্বাচনে পর্যবেক্ষক রাখতেই হবে এমন কোনো বিধিবদ্ধ নিয়ম বা আইন নেই। নির্বাচন কমিশন ইচ্ছে করলে পর্যবেক্ষণ নিষিদ্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার বাস্তবতার কারণেই দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলোর ভোট পর্যবেক্ষণকে সবাই স্বাগত জানায়।

ইসি সচিব বলেছেন, কেন্দ্রে যত ঝামেলাই হোক, পর্যবেক্ষকরা ছবি তুলতে পারবেন না, কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না। এ কথার দ্বারা তিনি কিসের ইঙ্গিত দিতে চাচ্ছেন? দুর্বৃত্তরা যদি ভোটকেন্দ্রে সন্ত্রাস করে, ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে বিশেষ কোনো দলের প্রার্থীর মার্কায় সিল মারে, প্রতিপক্ষের এজেন্টদের বের করে দেয় এবং নির্বাচন কর্মকর্তারা কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে পর্যবেক্ষকরা কোনো কথা বলতে পারবেন না? তারা কি পাথুরে মূর্তির মতো ভোটকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখবেন? যদি এটাই নির্বাচন কমিশন চায়, তাহলে ওই নাম কা ওয়াস্তে পর্যবক্ষণ ব্যবস্থা রেখে কী লাভ?

আমাদের নির্বাচন কমিশন আসলে কী চায় সেটাই এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য কমিশনাররা বলছেন তারা একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য যা যা করা দরকার করবেন। কিন্তু বাস্তবে তাদের সেসব কথার প্রতিফলন কমই দেখা যাচ্ছে। বরং একই ঘটনায় দুই রকম ভূমিকা পালনের নজির তারা ইতোমধ্যেই স্থাপন করেছেন। মনোনয়ন আবেদন ফরম তোলার সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের শো ডাউনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের দুই দিকে দুই নজরে তাকানো সর্বমহলেই সমালোচিত হয়েছে। বিএনপি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে ইতোমধ্যেই আপত্তি তুলেছে। তারা এমনও বলেছে, এই নির্বাচন কমিশনের দ্বারা সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তারপরও তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকবে এমন আশ্বাসও দেয়া হয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষনেতা ড. কামাল বলেছেন, যত কিছুই ঘটুক তারা নির্বাচনী মাঠ ত্যাগ করবেন না। নির্বাচনের অন্যতম একটি পক্ষ যখন এমন ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করে, তখন সে নির্বাচনকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলাটা নির্বাচন কমিশনের জন্য অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ইসি সচিব হেলালউদ্দিনের বক্তব্য জনমনে সন্দেহের উদ্রেক করেছে সঙ্গত কারণেই। পর্যবেক্ষকদের ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে তারা কাদের জন্য, কী ধরণের সুযোগ তৈরি করে দিতে চাচ্ছেন এ প্রশ্নটিই এখন সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ