Skip to main content

নারীর অবমাননা : ক্ষমতার কাছে পরাজিত

কেট ম্যাটবী : হ্যাশট্যাগ মি টু আন্দোলনটা গতবছর যখন ওয়েস্টমিনিস্টারকে স্পর্শ করলো, তখনও অনেকে হয়তো ভাবেনি এই হইচই শেষ পর্যন্ত কোথায় যেয়ে দাঁড়াবে। যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সময় আমাদের মধ্যে যারা তালিকায় নাম লিখিয়েছিলাম, আমাদেরকে তখন অন্যভাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল- আমরা নাকি অভিজাত শ্রেণির অতিসুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠী। কোন অযাচিত প্রস্তাবে বিরক্ত হয়ে, কিংবা কোন রাজনীতিবিদের আচমকা খোঁচাতেই আমাদের যদি এত বেশি প্রতিক্রিয়া হয়; তাহলে আসলেই যারা এই দুর্ভোগের মধ্যে প্রতিনিয়ত বসবাস করছে তাদের কাছ থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত। তবে যৌন নির্যাতনের শিকার জাসভিন্দার সাংহেরাকে হয়তো ওই একইভাবে বিচার করা যাবে না। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তার পরিবার তাকে যখন জোর করে বিয়ে দিচ্ছিলো, সে পালিয়ে এসেছিলো। তার কোনো থাকার জায়গা ছিলো না। কিন্তু তারপরও সে তার বোন রবিনা’র চেয়ে ভাগ্যবান ছিল। রবিনাকে তার স্বামী মারধোর করতো। সে সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিরো। কিন্তু তার নিজের পরিবার তাকে গ্রহণ করতে রাজী হয়নি। ২৪ বছর বয়স্কা রবিনা তখন নিজেকে আগুনে পুড়িয়ে মারেন। বোনের মৃত্যুর পর ২৫ বছর ধরে সাংহেরা প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছেন। জোর করে কাউকে বিদেশে বিয়ে দেয়া হলে, তারা যদি কোন সহিংসতার শিকার হয়, তাহলে তাদেরকে সহায়তা দিয়ে থাকে তার সংগঠন ‘কারমা নিরভানা।’ এই জাসভিন্দার সাংহেরার একটি ঘটনা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোড়ন পড়ে গেছে। তিনি যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন লর্ডসভার লিবারেল ডেমোক্রেট প্রতিনিধি লর্ড লেস্টারের বিরুদ্ধে। সাংহেরা জানান, লর্ড লিস্টার যখন তাকে তার কাজে সহযোগিতা করছিলেন, তখনই একদিন তিনি তাকে বলেন, “তুমি যদি আমার সঙ্গে বিছানায় যাও, তাহলে এক বছরের মধ্যে আমি তোমাকে ব্যারোনেস বানিয়ে দেবো।” এ প্রস্তাব প্রত্যাখান করায় লর্ড লিস্টার প্রতিশোধ গ্রহণের হুমকি দিয়েছিলেন। এমন একটা অভিযোগের প্রেক্ষিতে লর্ডস কমিশন যখন তদন্তে নামে, লেস্টার সব অভিযোগই দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছিলেন। তদন্তের জন্য একাধিক কমিটি গঠিত হয়। তারপরও অতি উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের দ্বারা গঠিত একাধিক কমিটিতে লেস্টার দোষী সাব্যস্ত হন। কিন্তু লর্ড লেস্টার যে খুবই ক্ষমতাধর একজন ব্যক্তি তা শিগগিরই পরিস্কার হতে থাকে। লর্ডসভায় লেস্টারের যে সকল বন্ধু রয়েছেন, তাদের কাছে কমিটিগুলোর ওই রিপোর্ট পর্যাপ্ত বলে বিবেচিত হয় না। এসময় লেস্টারের বন্ধুস্থানীয় লর্ড প্যানিক একটা মিডিয়া ক্যাম্পেইন শুরু করেন। সেখান তিনি নানাভাবে অভিযোগকারী নারীর বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়াতে থাকেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কলাম লিখেন। এখান থেকেই দেখা গেছে, পদ্ধতিগত কারণে অনেক সময় ‘হ্যাশট্যাগ মি টু’ আন্দোলনে যথাযথ সাজাটি দেয়া যায় না। বরং কখনো কখনো অভিযোগকারীই নানা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে যায়। গত সপ্তাহে আমরা দেখলাম, প্রচলিত পদ্ধতি কীভাবে একজন নারীকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করলো। কারণ সকল তথ্য প্রমাণ সত্ত্বেও লেস্টারের বিরুদ্ধে লর্ডরা কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে অস্বীকৃতি জানালো। তারা বললো- যে পদ্ধতিতে তদন্ত পরিচালিত হয়েছে, তার মধ্যেই নাকি গলদ রয়ে গেছে। গত বৃহস্পতিবার লর্ডরা একের পর এক বলতে লাগলেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা লেস্টারকে চেনেন, তার মত লোক একটা মাছির জন্যও ক্ষতিকর নন! অনেক লর্ড আবার এমন কথাও বললেন, এই মামলাটির বিচার করা হয়েছে অনেকটা ‘সম্ভাবনার মাত্রার ওপর নির্ভর’ করে। এখানে সন্দেহাতীতভাবে কিছু প্রমাণ করা যায়নি। অথচ সিভিল আইনের ক্ষেত্রে সম্ভাবনার মাত্রার ওপর ভিত্তি করে অনেক বিচারই করা হয়ে থাকে। কিন্তু সেটা করা যায়নি এই লর্ড লেস্টারের ক্ষেত্রে। জাসভিন্দার সাংহেরা তার সারাটি জীবন কাটিয়ে দিলেন যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। কিন্তু নিজে সুবিচার পেলেন না। লর্ড লেস্টারকে কোনো সাজা না দেয়ার মাধ্যমে উচ্চকক্ষ তার বিচার পাওয়ার পথ বন্ধ করে দিলো। লেখক : গার্ডিয়ানের সাংবাদিক। সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব

অন্যান্য সংবাদ