প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কঠিন পরীক্ষার মুখে শেখ হাসিনা : ইনসেফ নাউ

রবিন আকরাম : বাংলাদেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেখ হাসিনার জন্য কঠিন পরীক্ষা হবে বলে জানিয়েছে ভারতীয় একটি সংবাদমাধ্যম। রোববার ইনসেফ নাউ নামে একটি নিউজ পোর্টালে “বাংলাদেশে ভোট, কঠিন পরীক্ষার মুখে হাসিনা” এই শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করা হয়।

প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং নব গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট শিবিরে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। যার ফলে কোনো কোনো আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীর সংখ্যা পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে পৌঁছানোয় খোদ দলীয় প্রধান ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে দেশে এতো নেতার জন্ম হলো কি করে তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

যখন একজন ক্ষমতাসীন সাংসদের বিরুদ্ধে ২০-২৫ জন প্রার্থী দাঁড়িয়ে যান, তখন কারোরই বুঝতে অসুবিধা হয় না যে তিনি নেতা-কর্মীদের কাছে কতোটা অপছন্দের। অনেক মনোনয়ন প্রত্যাশীর মধ্য থেকে একজনকে বেছে নেওয়াই ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রথম চ্যালেঞ্জ। বর্তমান সংসদের সব সদস্যের ভাগ্যে যে এবার মনোনয়নের শিকে ছিঁড়বে না, সে কথা আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি বিগত ১২ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকায় তাদের দলীয় কোন্দল ক্ষমতাসীনদের থেকে অপেক্ষাকৃত কম। যদিও জোট শরিকদের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি নিয়ে দুই প্রধান দলকেই বড় ধরনের ঝামেলা পোহাতে হবে। শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থা।

মনোনয়ন প্রত্যাশীদের নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি অফিসের সামনে মিছিল হয়েছে, রাস্তা বন্ধ করে নেতা-কর্মীরা শোডাউন করেছেন। আবার এই শোডাউনকে ঘিরে প্রাণহানি, যানবাহনে আগুন, সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। প্রথমে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ অফিসে তিন-চার দিন ধরে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের শোডাউন চললেও নির্বাচন কমিশন তখন টুঁ–শব্দটিও করেনি। এরপরেই যখন বিএনপির অফিসের সামনের ব্যস্ততম সড়ক বন্ধ করে নেতা–কর্মীরা দুই দিন ধরে শোডাউন করলেন, তারা তখনো তারা নিশ্চুপ ছিলো। কিন্তু তৃতীয় দিনে নির্বাচন কমিশন পুলিশ কর্তৃপক্ষকে এই মর্মে চিঠি দেয় যে এভাবে রাস্তায় মিছিল করে মনোনয়ন জমা নেওয়া নির্বাচনী আচরণ বিধির ৮ নম্বর ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, তারা যেনো ব্যবস্থা নেয়।

এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ নড়েচড়ে বসে এবং বিএনপি নেতা-কর্মীদের রাস্তা থেকে উঠিয়ে দিতে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিএনপি অফিসের সামনে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া, গাড়ি ভাঙচুর করার দায়ে বিএনপির ৪৮৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে, ৬৬জন নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করে এবং ৩৬ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেয়। তারা প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী বেবী নাজনীনকে আটক করলেও পরে ছেড়ে দেয়। তিনি বিএনপির একজন সম্ভাব্য প্রার্থী।

নয়াপল্টনে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার কারণে হুকুমের আসামি হিসেবে বিএনপির কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়েছে। কিন্তু আদাবরে আওয়ামী লীগের দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষে দুজন মানুষ মারা যাওয়ার পরও আওয়ামী লীগের কোনো নেতার বিরুদ্ধে মামলা হয়নি বলে অভি‌যোগ বিরোধীদের।

এটা স্পষ্ট যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এবারের নির্বাচনটি নির্বাচন কমিশন এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তো বটেই। তার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনকালীন সরকারের জন্য। ৩০শে ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে দলীয় সরকারের অধীনে এবং জাতীয় সংসদ বহাল রেখে সব দলের অংশগ্রহণে একটি সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা ভোটারদের কাছে প্রথম, নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রথম, এমনকি নির্বাচনকালীন দলীয় সরকারের কাছেও প্রথম। সংশ্লিষ্ট সবাই কথাটি মনে রাখলে সমস্যা অনেক কমে যাবে, আর না রাখলে কিংবা কোনো পক্ষ থেকে ব্যত্যয় ঘটানোর চেষ্টা হলে সমস্যা আরও বাড়বে এবং তা নিয়ন্ত্রণেরও বাইরে চলে যেতে পারে।

আওয়ামী লীগের জন্য এই নির্বাচন ভীষণ কঠিন পরীক্ষা এই কারণে, যে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করতে হলে বর্তমান নির্বাচনকালীন দলীয় সরকারকেই ‘নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকার’–এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য শুধু মন্ত্রী ও সাংসদদের নির্বাচনী আইন ও আচরণ বিধি মেনে চললে হবে না, সেই আইন অনুযায়ী জনপ্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও চালিত করতে হবে। অন্যথায় সব ব্যর্থতার দায় নির্বাচনকালীন সরকারের ওপরই বর্তাবে।
নির্বাচনটি দলীয় সরকারের অধীনে হওয়ায় দেশের মানুষ, বিদেশের বন্ধু ও সুহৃদেরা এর ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। গত বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বাংলাদেশ বিষয়ক বিতর্কে অংশ নিয়ে সদস্যদেশের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, ‘আসন্ন জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য অনেক দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচনই শেষ সুযোগ, যেখানে নির্ধারিত হবে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারা ও আইনের শাসন অব্যাহত থাকবে, নাকি পরিস্থিতি অরাজকতা আর বিশৃঙ্খলার দিকে ধাবিত হবে’।

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কাছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ মানুষ নির্ভয়ে ভোট দিতে যেতে পারবে কিনা। প্রতিটি ভোটকেন্দ্র ও বুথে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নর্বাচনী এজেন্টরা উপস্থিত থাকতে পারবেন কিনা।

নির্বাচন নিয়ে এখন সর্বত্র আলোচনা, গুঞ্জন। সবার জিজ্ঞাসা, নির্বাচনটি ঠিকঠাক মতো হবে তো? অতীতে বাংলাদেশে যতোগুলো একতরফা নির্বাচন হয়েছে, তার জন্য নির্বাচন বর্জনকারীরা যতোটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী নির্বাচন আয়োজনকারীরা। ২০০৭ সালে বিএনপি ‘সংবিধানসম্মত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে’ দলীয়ভাবে ব্যবহার করতে গিয়ে নির্বাচনটিই শুধু ভণ্ডুল করেনি, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকেও ধ্বংস করেছিলো।

এবার আওয়ামী লীগ একই সঙ্গে নির্বাচনে অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী এবং নির্বাচন পরিচালনাকারীর ভূমিকায় আছে। নির্বাচন পরিচালনাকারী হিসেবে তাকে শুধু নিরপেক্ষভাবে কাজ করলেই হবে না, সেটি বাংলাদেশের জনগণে এবং বিশ্ববাসীর কাছেও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হবে। নির্বাচনটি অবাধ ও সুষ্ঠু হলে, জনগণ আওয়ামী লীগকে টুপি খুলে অভিনন্দন জানাবে। কিন্তু নির্বাচনটি সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ না হলে সবকিছু ওলটপালট হয়ে যেতে বাধ্য। যার ফলে অসাংবিধানিক শক্তির ক্ষমতায় আসা নিশ্চিত এবং গ্রহণযোগ্য করে তুলবে।

এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া সহ যে সমস্ত দেশ বাংলাদেশ কে শুল্ক ও বাণিজ্য সুবিধা প্রদান করে সে সমস্ত দেশ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে বাংলাদেশে শুল্ক ও বাণিজ্য সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

জাতিসংঘ বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকারকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যদি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য না হয় এবং এর ফলে যদি অসাংবিধানিক শক্তি ক্ষমতায় আসে তাহলে জাতিসংঘের শান্তি রক্ষী বাহিনীতে কর্মরত বাংলাদেশীদের ব্যাপারে নতুন করে তাদের ভাবতে হবে।

সব দিক বিবেচনা করলে বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের কাছে এই নির্বাচন ‌যে কতো বড় চ্যালেঞ্জ তা শুধু দেশেই নয় আন্তর্জাতিক স্তরেও আলোচিত।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত