প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঘোরতর বিপর্যয়ের আগেই আওয়ামী লীগের সতর্ক হওয়া জরুরি

অসীম সাহা : অনেকদিন ধরেই আমি একটি কথা ভাবছি, একসময়ের আওয়ামী লীগের অনেক ডাকসেঁটে নেতা কেন আওয়ামী লীগের বাইরে? তারা সকলেই কি লোভী? সকলেই কি সুযোগসন্ধানী? নাকি এতে আওয়ামী লীগেরও কিছু দায় আছে? বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই হত্যাকাণ্ডের বেনিফিসিয়ারি ছিলেন, তারা আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে প্রথমে খন্দকার মোশতাক এবং পরে নানা দলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে মধু পান করতে ছুটে গেছে। তারা হত্যাকারীর দোসর। আমি তাদের নিয়ে ভাবিনি! ভেবেছি, যারা বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহচর ছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর সিনিয়র যেসব নেতা হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, তাঁরা কেন আওয়ামী লীগ ছেড়ে চলে গেলেন?

যদিও যারা চলে গিয়েছিলেন, তারা সাময়িক সুবিধা লাভ করলেও তাদের কারো পরিণাম শুভ হয়নি। বিশ্বাসঘাতকদের অনেকেরই মৃত্যু হয়েছে অনেকটা সংগোপনেই। কিন্তু যারা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশের মাটিতে ফিরে আসার পর থেকেই তাঁর সঙ্গে ছিলেন, তার আশপাশে ছিলেন, তারাও কেন একে একে অনেকেই আওয়ামী লীগ ছেড়ে চলে গিয়ে হয় নিজেরা দল গড়েছেন, না হয় অন্যদলে বিলীন হয়ে গেছেন? ড. কামাল হোসেন, নূরে আলম সিদ্দিকী, কাদের সিদ্দিকী, মোস্তাফা মহসিন মন্টু এরা তো বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন।

পাকিস্তানি আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইয়ুব-মোনায়েমশাহীর গু-াবাহিনী এনএসএফ-এর বিরুদ্ধে তৎকালীন ছাত্রনেতা খসরু-মন্টু-সেলিম ছিলেন তাদের জন্য মূর্তিমান আতংক। তাদের একজন খসরু, যিনি শেষপর্যন্ত সিনেমার নায়ক হয়ে এখন আত্মনির্বাসনে, সেলিম কোথায়, আমার জানা নেই। কিন্ত মন্টু গণফোরামের ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে আছেন এবং এবার জাতীয় ঐক্যজোটের নেতা হয়ে ‘ধানের শীষে’ উঠে বসে আছেন। ২০০১ সালের নির্বাচনেও নূরে আলম সিদ্দিকীর মতো দুর্ধর্ষ বাগ্মীনেতা আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু এখন কেন নেই, তার কারণ বুঝতে আমি অক্ষম। পুরনোদের মধ্যে একমাত্র তোফায়েল আহমেদ ছাড়া উল্লেখ করার মতো তেমন আর কেউ নেই এখন আওয়ামী লীগে। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর এবং আজীবন আওয়ামী লীগার লতিফ সিদ্দিকীকে সামান্য কারণে মন্ত্রিত্ব থেকে, এমনকি আওয়ামী লীগের সাধারণ সদস্যপদ থেকেও বিতাড়িত করা হয়েছে।

অথচ যারা একসময় আওয়ামী লীগের ঘোরতর বিরোধী ছিলো এবং শাপলা চত্বরে ভয়ংকর তা-ব চালিয়ে শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত পর্যন্ত করতে চেয়েছিলো, তারা আজ আওয়ামী লীগের ঘরে। ৯ বছরের স্বৈরাচারী শাসক, যাকে তীব্র আন্দোলন করে ক্ষমতা থেকে নামাতে হয়েছিলো, সেই এরশাদের জাতীয় পার্টি আজ আাওয়ামী লীগের ঘরে। জাসদ ঘরে, কমউনিস্টরা ঘরে, শুধু ঘরে নেই আওয়ামী লীগের আপন লোকেরা। এরচেয়ে বেদনাদায়ক আর কী হতে পারে?। যারা হালুয়া-রুটির লোভে চলে গেছে, তাদের নিয়ে আমার কোনো কথা নেই।

কিন্তু যারা বিপদেও আওয়ামী লীগকে ছেড়ে যায়নি, তারা কেন আওয়ামী লীগের বাইরে, এ-প্রশ্নের জবাব কি আওয়ামী লীগের কাছে আছে? থাকলে সেটা জনগণের দল আওয়ামী লীগের কাছ থেকে জনগণেরই জানার অধিকার আছে। কেন সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আজ নিস্পৃহ ও নিস্তেজ হয়ে অসুস্থ অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন, কেন তাজউদ্দীন আহমেদের ছেলে সোহেল তাজ অপমানে ও অভিমানে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করে আজ দলের বাইরে? কেন সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএসএম কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়া দল ছেড়ে গণফোরামে গিয়ে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করতে চলেছেন?

এ-জন্যে শুধু কি তারাই দায়ী? নাকি তাদের প্রতি অবহেলা করে শুধু নিজেদের আত্মীয়-স্বজন এবং দলের জন্যে প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিকর লোকজন দ্বারা আওয়ামী লীগ এখন পরিবেষ্টিত? আজ যদি আওয়ামী লীগে ড. কামাল হোসেন, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, নূরে আলম সিদ্দিকী, কাদের সিদ্দিকী, মোস্তাফা মহসিন মন্টু প্রমুখ দলে থাকতেন, তাতে কি আওয়ামী লীগ দল হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো, না লাভবান হতো, এ-প্রশ্ন কিন্তু সাধারণ আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মিদেরও।

এই প্রশ্নের পোস্টমর্টেম করে যথাযথ ব্যবস্থা নিলেই কেবল দল হিশেবে আওয়ামী লীগ নতুন জীবন পেতে পারে। তা না হলে শুধু শেখ হাসিনার ক্যারিশমায় দল সবসময় উজ্জ্বল সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত হতে পারবে, এমনটা ভাবা আত্মঘাতী হয়ে যেতে পারে। সেই ঘোরতর বিপর্যয়ের আগেই আওয়ামী লীগের সতর্ক হওয়া খুবই জরুরি বলে আমি মনে করি।

লেখক : কবি ও সংযুক্ত সম্পাদক, দৈনিক আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত