প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ধানের শীষে রেজা কিবরিয়া

বিভুরঞ্জন সরকার : সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবিয়ার ছেলে রেজা কিবরিয়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে হবিগঞ্জ-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রেজা কিবরিয়া সরাসরি বিএনপিতে যোগ দেননি। তিনি যোগ দিয়েছেন গণফোরামে। গণফোরাম থেকেই প্রার্থী হতে চান তিনি। মনোনয়ন পেলে তার মার্কা হবে ধানের শীষ, বিএনপির মার্কা। রেজা কিবরিয়ার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হচ্ছে। অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করছেন, আবার কেউ কেউ বলছেন, রেজা কিবরিয়া সঠিক কাজ করেছেন। আওয়ামী লীগের কাছে যথাযথ মূল্যায়িত না হয়ে এক ধরনের হতাশা ও বেদনাবোধ থেকে তিনি ধানের শীষে ভরসা স্থাপন করেছেন।

রেজা কিবরিয়ার বাবা শামস কিবরিয়া চাকরি জীবন শেষে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন। তার চাকরিজীবন অত্যন্ত বর্ণাঢ্য। তার শিক্ষাজীবনও ছিলো অতি উজ্জ্বল। ভালো ছাত্র ছিলেন। ছাত্র অবস্থায় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়ে কারাবরণও করেছিলেন। চাকরি জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর স্নেহও পেয়েছেন। জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে চাকরি থেকে অবসর নিয়ে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন।

১৯৯৬ সালের যে নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ একুশ বছর পর সরকার গঠনে সক্ষম হয়, সেই নির্বাচন পরিচালনা কমিটির উপপ্রধান ছিলেন শামস কিবরিয়া। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত সরকারের অর্থমন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান কিবরিয়া সাহেব। তিনি নির্বাচনে অংশ নেননি। তাই মন্ত্রী হয়েছিলেন টেকনোক্র্যাট কোটায়। দেশের একজন সফল অর্থমন্ত্রী হিসেবে প্রশংসিত হয়েছেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হলেও কিবরিয়া সাহেব হবিগঞ্জ সদর আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালের পর আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী এই আসনে জয়লাভ করতে পারেনি। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে দেশকে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের চারণভূমিতে পরিণত করেছিলো। কিবরিয়া সাহেব ছিলেন সরকারের চন্ডনীতির সোচ্চার সমালোচক। তিনি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর নিয়মিত কলাম লেখা শুরু করেন। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় লেখা তার কলামগুলো দেশের শীর্ষ দৈনিকে ছাপা হয়েছে। ২০০২ সালে তিনি ‘মৃদুভাষণ’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। আমার সুযোগ হয়েছিলো মৃদুভাষণের নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কিবরিয়া সাহেবের সঙ্গে কাজ করার। আগে থেকেই অবশ্য তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ও পরিচয় ছিলো।

২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি শাহ এএমএস কিবরিয়াকে হবিগঞ্জের একটি সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তখন ক্ষমতায় ছিলো বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। অন্য আরো অনেক হত্যাকা-ের মতো কিবরিয়া হত্যা-রহস্য উদ্ঘাটনেও তৎকালীন সরকার গড়িমিসি করেছে, উদাসীনতা দেখিয়েছে। কিবরিয়া হত্যাকা-ের পর তার ছেলে রেজা কিবরিয়ার নাম আলোচনায় আসে। রেজা কিবরিয়াও উচ্চ শিক্ষিত। অর্থনীতির অধ্যাপক। বিভিন্ন দেশে সরকারের বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় তিনি কাজ করেছেন। তিনি হয়তো আশা করেছিলেন, আওয়ামী লীগ তাকে ডেকে দলের ভালো পদ-পদবি দেবে। আওয়ামী লীগ তা করেনি। ড. রেজা কিবরিয়া ধীরে ধীরে ড. কামাল হোসেনের দিকে ঝুঁকে পড়তে থাকেন। এক-এগারোর পর তিনি সেনাকর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রেখেছিলেন। শেখ হাসিনার ব্যাপারে তার ‘রিজার্ভেশন’ আছে।

সে জন্যই রেজা কিবরিয়া যে এখন আওয়ামী লীগের দিকে না ঝুঁকে গণফোরামের দিকে ঝুঁকলেন, তাতে কেউ কেউ বিস্মিত হলেও ব্যক্তিগতভাবে আমি তা হইনি। ড. রেজা কিবরিয়া যথেষ্ট পরিণত মনস্ক মানুষ। যেকোনো রাজনৈতিক মত ও পথ বেছে নেয়ার পূর্ণ অধিকার তার আছে। তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে কোনো কথা বলার সুযোগ নেই। তবে তিনি গণফোরামে যাওয়ার পেছনে যে যুক্তি তুলে ধরেছেন সেটা তার বিদ্যাবুদ্ধির সঙ্গে একটু বেমানান বলেই মনে হয়।

তিনি বলেছেন, ‘যে আদর্শের জন্য আমার বাবা লড়াই করেছেন, আওয়ামী লীগ সেই আদর্শ থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। কিন্তু আমি আমার আদর্শ থেকে এক চুলও পিছু হঠিনি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এবং আমার বাবার আদর্শ থেকেও পিছু হঠিনি। আর এসব স্বপ্ন নিয়েই আমি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি’। তিনি এটাও বলেছেন, ‘সেই স্বপ্ন পূরণ করার মতো ড. কামাল হোসেন ছাড়া আর কেউ নেই’।

পিতার হত্যার বিচার না পাওয়ায় ড. রেজা কিবরিয়ার মনে ক্ষোভ থাকতে পারে, থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ক্ষোভ প্রশমনের জন্য তিনি যে পথ নিলেন তা কতোটা যুক্তিযুক্ত, প্রশ্ন সেটাই। তার বাবার স্বপ্ন পূরণের জন্য ড. কামাল হোসেনকে তার সবচেয়ে যোগ্য লোক মনে হয়েছে। ড. কামালকে অনেকে বড় মাপের মানুষ মনে করেন। রেজা কিবরিয়াও করছেন। প্রশ্ন হলো, এই বড় মাপের মানুষটির রাজনৈতিক সাফল্য কি? রাজনীতিতে তার অর্জন কি, যে কারণে মানুষ তাকে মনে রাখবে? আওয়ামী লীগ যদি আদর্শচ্যুত হয়ে থাকে তাহলে বিএনপি-জামায়াতকে কি আমাদের আদর্শবাদী বলে মানতে হবে? গণফোরামের কি এতোটা শক্তি-সামর্থ আছে যে বিএনপি তাদের কথায় চলবে? খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশে সুশাসন এবং গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে বলে যারা মনে করেন তাদের সঙ্গে তর্ক করা অর্থহীন। যুক্তিবাদীর সঙ্গে তর্ক করা যায়, অন্ধ বিশ্বাসীর বিশ্বাস টলানো যায় না।

খুনি শোক মিছিলে যোগ দিলেই কি তার অপরাধ মওকুফ হয়ে যায়? কিবরিয়া হত্যাকান্ডের সঙ্গে কারা জড়িত, কারা নির্দেশদাতা, তাদের অবস্থান এখন কোথায়- সেসব রেজা কিবরিয়ার অজানা থাকার কথা নয়। কিন্তু এখন তিনি যুক্তিরহিত , আবেগা›ধ। তিনি তার ভুল বুঝতে পারবেন, কিন্তু তখন হয়তো ফেরার পথ থাকবে না। অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে তাতে তার কোনো অসুবিধা নেই, কারণ দেশের চেয়ে বিদেশ তার কম প্রিয় নয়।

লেখক : গ্রুপ যুগ্ম-সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ