প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জাতীয় নির্বাচন এবং নানাবিধ শঙ্কা ও প্রশ্ন

বিভুরঞ্জন সরকার : দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হওয়ায় আমরা ক্ষুব্ধ ছিলাম। একতরফা নির্বাচন, বিনাভোটে নির্বাচন আসলে কোনো নির্বাচনই না। নির্বাচন হতে হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং জমজমাট। আশা করা যাচ্ছে, এবার অর্থাৎ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জমজমাট হবে। তিনশ আসনের জন্য দুই দল থেকেই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন প্রায় দশ হাজার জন। ছোট সব দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী সংখ্যাও হাজার দুয়েকের কম হবে না। প্রায় বারো হাজার মানুষ এমপি হতে চান। এক আসনে চল্লিশজন। ভাবা যায়! এমপি হওয়া একটি লাভজনক পেশা। তাই অনেকেরই চোখ এমপি পদের দিকে।

প্রার্থী তো অনেক, এবার আর কারো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ নেই। কেমন হবে নির্বাচন? নির্বাচন শতভাগ সুষ্ঠু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম সেটা বলেছেন। প্রায় একই ধরনের কথা প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদাও দিন কয়েক আগে বলেছেন। ফলে অনেকের মনেই শঙ্কা ও প্রশ্ন, কতো ভাগ সুষ্ঠু হবে আগামী নির্বাচন? সবাই ভোট দিতে পারবেন তো? ভোটকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় মানুষের জীবন বিপন্ন হবে না তো?

নির্বাচনকে সামনে রেখে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। নির্বাচন এলে সংখ্যালঘুদের জীবন ও সম্পদ অনিরাপদ হওয়াটা গত কয়েক বছর ধরে একপ্রকার নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে-পরে সারাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর যে অত্যাচার-নির্যাতন হয়েছিলো তা মাত্রা ও ভয়াবহতার দিক থেকে রেকর্ড সৃষ্টিকারী। খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, অগ্নিসংযোগের মতো দৃশ্যমান নির্যাতনের পাশাপাশি নীরব সন্ত্রাস ও মানসিক নিপীড়নের ঘটনাও ঘটেছিলো। অথচ অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মানসিক অবস্থা কতোটা বিপর্যস্ত হয়েছিলো সেটা বোঝা যায় ২০০১ সালের ২৩ অক্টোবর দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত একটি খবর থেকে। ভোলার প্রভা রাণীর বরাত দিয়ে সংবাদ লিখছে : ‘পত্রিকায় কিছু লেখার দরকার নেই। কাউকে কিছু বলতে চাই না, আমাদের জীবনে কী ঘটে গেছে কোনো বিচার চাই না, কোনো ক্ষতিপূরণ চাই না। শুধু প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে বলবেন, আমাদের কোনো উপায় নেই, কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। আমরা এ দেশেই থাকতে চাই। শুধু তিনি যেন আমাদের বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করেন, আমরা একটু শান্তি চাই। তাকে বলবেন, মা-মেয়ে যেন বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারি। আমাদের স্বামী, ছেলে-মেয়েদের নিয়ে দুবেলা খেয়েপরে বেঁচে থাকতে চাই। আমরা রাজনীতি করি না, ভোট দিতে যাইনি। ভবিষ্যতেও কোনোদিন ভোট দেবো না। আপনাদের মাধ্যমে তাকে (খালেদা জিয়াকে) কথা দিলাম। তিনি যেন আমাদের দিকে একটু করুণা করেন। আমরা এ দেশেরই মানুষ। আর কতোকাল নিজ দেশে পরবাসী থাকবো? এতো অত্যাচার-নির্যাতন আর সহ্য হয় না। এমন যন্ত্রণা বুকে নিয়ে বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করে না। না পারি কাউকে বলতে, না পারি কাউকে দেখাতে। শুধু ঈশ্বর জানেন, আমরা কেমন আছি’।

সাধারণভাবে এটা ধরে নেওয়া হয় যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক। যদিও এটা সম্পূর্ণ তথ্য নির্ভর নয়। এক সময় ‘শাখা-সিঁদুর’ মানেই নৌকার ভোট ধরা হলেও এখন সে অবস্থা নেই। নানা বাস্তব বিবেচনায় এখন সংখ্যালঘু ভোটও বিভক্ত। কিন্তু নির্বাচন এলে সংখ্যালঘুদের ওপর দমন-পীড়ন একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

৩০ ডিসেম্বের নির্বাচনেও সংখ্যালঘুরা ভোট কেন্দ্রে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে কি না, সে প্রশ্নটি সামনে আসছে। নির্বাচন কমিশনকে এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। ২০০১ সালের ঘটনাগুলো যারা ঘটিয়েছিলেন তাদের সঙ্গে এবার ফ্রন্ট গঠন করেছেন ড. কামাল ও সুব্রত চৌধুরীরা। তারা ২০০১ সালের ঘটনা তদন্ত করেছিলেন। আগামী নির্বাচনে কামাল হোসেনের ঐক্যফ্রন্ট সংখ্যালঘুদের জীবনের জন্য অনিরাপদ কিছু ঘটানো রোধ করতে পারবে কি?

লেখক : গ্রুপ যুগ্ম-সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ