Skip to main content

নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ কমিশনের একক এখতিয়ার

ইকতেদার আহমেদ : সংসদ সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত। সংসদ সদস্যদের নির্বাচন দুইভাবে অনুষ্ঠিত হয়। এর একটি হলো সংসদের শূন্য আসনের নির্বাচন এবং অপরটি সংসদের সাধারণ নির্বাচন। সংসদ বহাল থাকাকালীন সংসদের যেকোনো আসন শূন্য হলে শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে উক্ত শূন্য আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হয়। সংসদের মেয়াদ হলো সাধারণ নির্বাচন পরবর্তী সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ হতে পাঁচ বছর; তবে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে মেয়াদ পূর্তির আগেও সংসদ ভেঙে দিতে পারেন। সংসদের সাধারণ নির্বাচন বিষয়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পরবর্তী যে বিধান করা হয়েছে তা হলো মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে গেলে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে এবং মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে ভেঙে যাওয়ার পবরর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন বিষয়ক উপরোক্ত বিধানটি প্রবর্তন পরবর্তী দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সংসদ বহাল থাকাবস্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দশম সংসদ নির্বাচনটি বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সংসদ বহাল থাকাবস্থায় অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনটি তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি বর্জন করায় সেটি একতরফা ছিলো। সে নির্বাচনে একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের জন্য উন্মুক্ত ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৪টি আসনের প্রার্থী বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক দশম সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সাথে সাথেই বিএনপি ও এর জোটভুক্ত দলসমূহ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। সে নির্বাচনটি সহিংসতা ও গোলযোগের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ায় স্বল্প সংখ্যক দেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষক ব্যতীত বিদেশি কোনো নির্বাচন পর্যবেক্ষক সেটি পর্যবেক্ষণ করেনি। দশম সংসদ নির্বাচনের ন্যায় সমরূপ সাংবিধানিক ব্যবস্থায় একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন প্রথমত : ১১ দিন সময় নির্ধারণ করে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার তারিখ, ৩ দিন সময় নির্ধারণ করে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের তারিখ, ৭ দিন সময় নির্ধারণ করে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের তারিখ এবং ৪৪ দিন সময় নির্ধারণ করে ৪৫তম দিনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণপূর্বক তফসিল ঘোষণা করে। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক তফসিল ঘোষণা পূর্ববর্তী দেশের বড় দুটি দলের অন্যতম বিএনপির অন্তর্ভুক্তিতে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ হতে সংলাপের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ক সঙ্কট নিরসন না হওয়া অবধি তফসিল ঘোষণা স্থগিত রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছিলো। নির্বাচন কমিশন সে অনুরোধ উপেক্ষাপূর্বক অনেকটা তড়িঘড়ি করেই তফসিল ঘোষণা করে ফেলে। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক তফসিল ঘোষণার পর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণাপূর্বক সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ এক মাস পিছানোর জন্য নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করে। ক্ষমতাসীন দলের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহী যুক্তফ্রন্ট ভোটগ্রহণের তারিখ এক সপ্তাহ পিছানোর জন্য নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করে। এ প্রসঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক বলেন, কমিশন কর্তৃক নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ পিছানো হলে তাদের দলের পক্ষ হতে কোনো আপত্তি নেই। সংসদ ভেঙে দেয়া নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার না হলেও নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ নির্বাচন কমিশনের একক এখতিয়ার। অতীতে ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্বপালন করেছিল কিনা এ বিষয়ে এ দেশের জনমানুষের মধ্যে যে আস্থার সঙ্কট রয়েছে দলীয় সরকারের অধীন গঠিত নির্বাচন কমিশনগুলো তা দূরীভূত করতে পারেনি। এমন আস্থার সঙ্কট হতে বর্তমান নির্বাচন কমিশনও মুক্ত নয়। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল দলের জন্য সমসুযোগ সম্বলিত মাঠ নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। প্রাক-নির্বাচনী সময়ে নির্বাচনী মাঠ সমসুযোগ সম্বলিত ছিল না। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন পূর্ব সময়ে এখনো ঐক্যফ্রন্টভুক্ত দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি অব্যাহত রয়েছে। এটি চলতে থাকলে কখনো সমসুযোগ সম্বলিত মাঠের দেখা মিলবে না। নির্বাচন পূর্বসময়ে আচরণবিধিতে যে সকল কার্যকলাপের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে এরূপ কার্যকলাপ হতে ক্ষমতাসীন দল ও এর জোটভুক্ত দলসমূহ বিরত নয়। কিন্তু এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের এখন পর্যন্ত কোনো অবস্থান বা ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। ক্ষমতাসীন দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত দলসমূহের নির্বাচনে অংশগ্রহণ বিষয়ে প্রস্তুতি সমরূপ নয়। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন। অবশেষে নির্বাচন কমিশন ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠানের তারিখ পুনঃনির্ধারণপূর্বক ৭ দিন পিছিয়ে ২৩ ডিসেম্বরের পরিবর্তে ৩০ ডিসেম্বর নির্ধারণ করেছে। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক এক সপ্তাহ সময় বাড়িয়ে ভোট গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। এ দেশের সচেতন জনমানুষ মনে করে বর্তমান বাস্তবতায় ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠানের তারিখ ন্যূনপক্ষে পক্ষকাল পিছানো সমীচীন। নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ পিছানো হলে তা যদি অংশগ্রহণকারী সকল দলের জন্য সমরূপ প্রস্তুতির অবকাশ সৃষ্টি করে সে ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিরপেক্ষ অবস্থান হতে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমানুষের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠানের যৌক্তিক তারিখ নির্ধারণ করবেন এমনটি প্রত্যাশিত। লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

অন্যান্য সংবাদ